• রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৬:০০ অপরাহ্ন
Headline
সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ না করলে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব অসম্ভব: রুহুল কবির রিজভী নৌযাত্রা শতভাগ নিরাপদ করতে সর্বোচ্চ সতর্ক সরকার: নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আসন্ন বাজেটে জ্বালানি, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিপুল ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রমে বড় বাধা: তথ্যমন্ত্রী শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে: অর্থমন্ত্রী মা দিবসে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে সেরা ৮টি স্মার্ট গ্যাজেট ‘পুলিশকে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না’ — পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোড়া হত্যা মামলায় আসাদুজ্জামান নূরের জামিন: হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তির পথে ‘বাকের ভাই’ সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দিকে এগোচ্ছে সরকার

বিচারের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে ‘অসুস্থতার ঢাল’: ট্রাইব্যুনালে আসামিদের চিকিৎসা নথিতে অসংগতি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এখন তুঙ্গে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন গত দেড় দশকের দাপুটে মন্ত্রী, এমপি এবং প্রভাবশালী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। তবে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই একটি বিশেষ ‘ট্রেন্ড’ বা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—আর তা হলো আসামিদের আকস্মিক ও জটিল শারীরিক অসুস্থতা। কারাগারে কিংবা প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় যাদের চলাফেরা স্বাভাবিক দেখা যায়, ট্রাইব্যুনালে হাজিরার দিনই তাদের শরীরে দানা বাঁধে ক্যানসার, লিভার সিরোসিস কিংবা হৃদরোগের মতো মরণব্যাধি। প্রসিকিউশনের দাবি, এটি আসলে বিচার এড়ানো কিংবা জামিন পাওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ‘অজুহাত’। আসামিদের দাখিল করা চিকিৎসা নথিতে ভূরি ভূরি অসংগতি ও সন্দেহজনক তথ্য পাওয়ার পর এখন পুরো ট্রাইব্যুনাল পাড়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এই অসুস্থতা কি বাস্তব, নাকি বিচারের হাত থেকে বাঁচার নতুন কোনো ঢাল?

আসামিদের তালিকায় হেভিওয়েট নামসমূহ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি শহীদুল হক, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী। এই ‘হাই-প্রোফাইল’ আসামিদের প্রায় সবাই নিজ নিজ আইনজীবীদের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে অসুস্থতার কথা জানিয়ে জামিন কিংবা বিশেষ হাসপাতালে চিকিৎসার আবেদন করেছেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, গুরুতর রোগের কথা বলে তারা বিশেষ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করলেও তাদের দাখিলকৃত নথির সাথে বাস্তব শারীরিক অবস্থার কোনো মিল নেই।

কামরুল ইসলামের ‘ক্যানসার’ ও সিঙ্গাপুরের রিপোর্টের রহস্য

সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালে দাবি করেছিলেন যে, কামরুল ইসলাম ‘গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারে’ আক্রান্ত এবং তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। গত ৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে এভারকেয়ারে চিকিৎসার অনুমতিও দিয়েছিলেন। তবে বিপত্তি বাঁধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই নথিপত্র যাচাইয়ের আবেদনের পর।

তদন্তে দেখা যায়, কামরুল ইসলামের পক্ষ থেকে চলতি বছরের ১২ ও ১৫ ফেব্রুয়ারির দুটি মেডিকেল রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি কামরাঙ্গীরচরের একটি স্থানীয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এবং অন্যটি সিঙ্গাপুরের একটি নামী হাসপাতালের। প্রসিকিউশনের প্রশ্ন হলো, কামরুল ইসলাম ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে কারাবন্দি। জেলহাজতে থাকা অবস্থায় তিনি কীভাবে সশরীরে সিঙ্গাপুরে গিয়ে পরীক্ষা করালেন বা সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের রিপোর্ট সংগ্রহ করলেন? কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দির নমুনা বিদেশের হাসপাতালে পাঠানোর জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, যা এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে প্রসিকিউশনের দাবি।

এছাড়া, কামরুল ইসলামকে এভারকেয়ারে নেওয়ার আদেশের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন আপত্তি জানিয়ে বলেছে, এভারকেয়ার হাসপাতালে কোনো ‘প্রিজন সেল’ নেই। সেখানে একজন হাই-প্রোফাইল আসামিকে রাখা হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রসিকিউশনের এই যুক্তি এবং নথির অসংগতি আমলে নিয়ে আদালত কামরুল ইসলামের সেই আগের আদেশ স্থগিত করেছেন এবং নথির সত্যতা ব্যাখ্যা করতে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন।

হুমায়ুন কবির পাটোয়ারীর লিভার সিরোসিস বিতর্ক

একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবির পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে। তিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি ‘লিভার সিরোসিসে’ আক্রান্ত। এই রোগের কারণ দেখিয়ে গত ১১ জানুয়ারি তিনি শর্তসাপেক্ষে জামিনও পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বেরিয়ে আসে যে তিনি তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলার তথ্য গোপন করেছেন। ফলে তার জামিন স্থগিত হয়।

পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল-২ এর নির্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হেমাটোলজি বিভাগের প্রধানের মাধ্যমে তার শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রতিবেদনে হুমায়ুন কবিরের দাবিকৃত রোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি। প্রসিকিউটর ফারুক আহম্মদের মতে, আসামিপক্ষ আগে থেকেই জানত যে তাদের দেওয়া তথ্য সঠিক নয়, তবুও বিচার বিলম্বিত করতে তারা এই মিথ্যা রিপোর্টের আশ্রয় নিয়েছে। আগামী ১১ মে এই বিষয়ে চূড়ান্ত শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

ফজলে করিম ও আবদুল জলিল মণ্ডলের ‘কৌশল’

চট্টগ্রামের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীকেও ট্রাইব্যুনালে হাজিরার দিন ‘সার্ভাইক্যাল কলার’ বা ঘাড়ের বেল্ট পরে আসতে দেখা যায়। তার আইনজীবীরা দাবি করেন, কারাগারে নেওয়ার পথে তিনি আহত হয়েছেন এবং তার উন্নত এমআরআই ও চিকিৎসা প্রয়োজন। অথচ সিসিটিভি ফুটেজে তাকে প্রিজন ভ্যানে স্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করতে দেখা গেছে। এমনকি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি আইনজীবীদের সাথে হাসিমুখে কথা বলছিলেন বলেও প্রসিকিউশন লক্ষ্য করেছে।

অন্যদিকে, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল হঠাৎ করে হৃদরোগের কথা বলে জামিন চেয়েছেন। প্রসিকিউশনের মতে, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন, কিন্তু ট্রাইব্যুনালে মামলা শুরু হতেই তিনি হার্টের রোগী হয়ে গেলেন। আদালত তার স্বাস্থ্য প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখেন যে তার অবস্থা মোটেও সংকটাপন্ন নয়, তাই তার জামিন আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়।

কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রসিকিউশনের সন্দেহ

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কারাগার ও প্রিজন হাসপাতালের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে আদালতকে না জানিয়েই আসামিদের জেল হাসপাতাল বা পিজি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রসিকিউশনের ধারণা, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে আসামিরা কারাগারের ভেতরে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারের একজন কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন যে, আসামিরা যতটুকু অসুস্থ তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে তাদের আইনজীবীরা আদালতে উপস্থাপন করছেন। মূলত বয়সজনিত কিছু ছোটখাটো সমস্যাকে তারা ক্যানসার বা লিভার সিরোসিসের মতো জটিল রোগ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন।

বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস

প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, আসামিদের অসুস্থতার এই নতুন ‘ট্রেন্ড’ বা প্রবণতা মূলত বিচার বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল। যখনই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠনের সময় আসে, তখনই আসামিরা অসুস্থ হয়ে পড়েন যাতে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির না হতে হয়। আসামির অনুপস্থিতির কারণে ইতিমধ্যে একটি মামলার আদেশের তারিখ তিনবার পরিবর্তন করতে হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা সত্যিকারের অসুস্থ আসামিদের চিকিৎসার বিরোধী নই। সরকার তাদের উন্নত চিকিৎসা দিতে বাধ্য। কিন্তু জালিয়াতি বা মিথ্যা নথির মাধ্যমে বিচার বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা প্রতিটি নথি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করছি। যারা মিথ্যা তথ্য দেবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আসামিপক্ষের পাল্টা যুক্তি

অবশ্য আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কামরুল ইসলামের আইনজীবী আফতাব মাহমুদ চৌধুরী দাবি করেছেন যে, কোনো ভুয়া কাগজ জমা দেওয়া হয়নি। তার মক্কেলের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেখান থেকেই রিপোর্ট এসেছে। তিনি আরও বলেন যে, কারাগারে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় তারা উন্নত হাসপাতালের জন্য আবেদন করেছেন। ট্রাইব্যুনাল যে সময় দিয়েছেন, সেই সময়ের মধ্যে তারা সব নথির সত্যতা প্রমাণ করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর মামলার বিচার যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেই নজর রাখছে আদালত ও প্রসিকিউশন। অসুস্থতা যদি প্রকৃত হয়, তবে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সবার আছে। কিন্তু যদি এটি স্রেফ বিচারের হাত থেকে বাঁচার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের জন্য একটি বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই মামলাগুলো সমগ্র জাতির জন্য সংবেদনশীল। তাই আসামিদের শারীরিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভুয়া চিকিৎসা নথির মাধ্যমে বিচার বিলম্বিত করার পথ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। ১১ মে হুমায়ুন কবিরের জামিন শুনানি এবং পরবর্তীতে কামরুল ইসলামের নথির সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমেই হয়তো পরিষ্কার হবে—কে সত্যিই অসুস্থ আর কে বিচারের হাত থেকে বাঁচতে ‘রোগের বাহানা’ দিচ্ছেন।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category