• রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন
Headline
সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ না করলে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব অসম্ভব: রুহুল কবির রিজভী নৌযাত্রা শতভাগ নিরাপদ করতে সর্বোচ্চ সতর্ক সরকার: নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আসন্ন বাজেটে জ্বালানি, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিপুল ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রমে বড় বাধা: তথ্যমন্ত্রী শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে: অর্থমন্ত্রী মা দিবসে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে সেরা ৮টি স্মার্ট গ্যাজেট ‘পুলিশকে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না’ — পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোড়া হত্যা মামলায় আসাদুজ্জামান নূরের জামিন: হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তির পথে ‘বাকের ভাই’ সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দিকে এগোচ্ছে সরকার

নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দিকে এগোচ্ছে সরকার

বিশেষ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন প্রতিবেদন / ২ Time View
Update : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো শক্তিশালী অবকাঠামো। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এবং বর্তমান সেতুগুলোর ওপর ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দিতে সরকার এবার দ্বিতীয় পদ্মা এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দিকে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্প দুটির প্রাথমিক কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) শুরু করা হয়েছে।

এই দুটি বৃহৎ প্রকল্প শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই উন্নত করবে না, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।


দ্বিতীয় পদ্মা সেতু: পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে নতুন স্বপ্নের দুয়ার

পদ্মা নদীর ওপর মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে নির্মিত প্রথম পদ্মা সেতু ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগের চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তবে ভৌগোলিক অবস্থান এবং দূরত্বের কারণে বৃহত্তর ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা এবং যশোর অঞ্চলের অনেক মানুষের জন্য প্রথম পদ্মা সেতু ব্যবহার করে ঢাকায় যাতায়াত করা এখনো সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াতের প্রধান ভরসা এখনো দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট।

সেতুর প্রয়োজনীয়তা:

বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাটে তীব্র স্রোত, কুয়াশা এবং যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে পারাপারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় বাস নদীতে পড়ে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটেছে। সেতু কর্তৃপক্ষের মতে, এই রুটে একটি সেতু থাকলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে এবং মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে।

বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুট ব্যবহার করে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জ বা প্রথম পদ্মা সেতু ঘুরে ঢাকায় আসতে হলে এই দূরত্ব বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২৭০ এবং ২২৫ কিলোমিটারে। সব পথেই যানজটসহ বাস ও ট্রাক চলাচলে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এই সময় ও অর্থ সাশ্রয় করতেই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান পদক্ষেপ:

২০১২ সালের ১১ জুন রাজধানীর নয়াপল্টনে ১৮ দলীয় জোটের গণসমাবেশে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছিলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করবেন—একটি মাওয়া-জাজিরা এবং অপরটি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে। বর্তমানে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার তাদের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পেও এই পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া (গোয়ালন্দ) অ্যালাইনমেন্টে সেতু নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে প্রায় ৪.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে সড়কপথের পাশাপাশি রেলপথেরও ব্যবস্থা থাকবে।


দ্বিতীয় যমুনা সেতু: ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের বিকল্প

১৯৯৮ সালে চালু হওয়া বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। কিন্তু গত দুই যুগে দেশের অর্থনীতি ও যানবাহনের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।

কেন দরকার দ্বিতীয় যমুনা সেতু?

বর্তমানে বিদ্যমান যমুনা সেতু ব্যবহার করে প্রতিদিন গড়ে ২২ থেকে ২৩ হাজার যানবাহন চলাচল করছে এবং এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেতুটি তুলনামূলক সংকীর্ণ (চার লেনের) হওয়ায় ঈদের সময় বা সাধারণ ছুটির দিনে দুই পাড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া ঢাকা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক ইতোমধ্যে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে এবং এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়কের ১৯০ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান রয়েছে। নতুন করে ঝিনাইদহ থেকে রূপপুর হয়ে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ছয় লেন সড়ক নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শেষ হলে যমুনা সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মতে, বিদ্যমান যমুনা সেতুর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল আর মাত্র ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে বা পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছে যাবে। এই চাপ সামাল দিতে এবং উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ নির্বিঘ্ন রাখতেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের কথা ভাবছে সরকার।

সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্ট বা রুট:

দ্বিতীয় যমুনা সেতু কোথায় নির্মিত হবে, সে বিষয়ে বর্তমানে তিনটি সম্ভাব্য রুটের কথা ভাবা হচ্ছে:

১. বগুড়া-জামালপুর জেলার মধ্যদিয়ে যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ।

২. গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত রুট।

৩. বিদ্যমান যমুনা সেতুর আশপাশের কোনো উপযুক্ত করিডোর।

সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, সেতু কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনায় ২০৩৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।


পরামর্শক নিয়োগ ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু

যেকোনো মেগা প্রকল্প শুরুর আগে তার প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিকগুলো যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস জানিয়েছেন, দ্বিতীয় পদ্মা এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) একই সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।

এই সমীক্ষার জন্য ফ্রান্স, কোরিয়া এবং বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গঠিত যৌথ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইআরএমসি (ERMC) কোম্পানি’-কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সমীক্ষার মাধ্যমেই চূড়ান্ত হবে:

  • সেতু দুটির সুনির্দিষ্ট রুট ও অ্যালাইনমেন্ট।

  • সেতুর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ।

  • সেতুর ওপর রেলপথের সুনির্দিষ্ট অবস্থান।

  • নির্মাণ ব্যয় ও সময়কাল।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত স্টাডি রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। এই রিপোর্ট পাওয়ার পরই ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপি (DPP) প্রণয়ন করা হবে এবং মূল প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।


উন্নয়ন বাজেটে মেগা বরাদ্দ: সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা

বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রথম বাজেটেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য উচ্চাভিলাষী বরাদ্দ দিচ্ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (৬৩.৩৩ শতাংশ) এবং বৈদেশিক ঋণ বা সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (৩৬.৬৭ শতাংশ)।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, এই বিশাল এডিপির আওতায় দ্বিতীয় পদ্মা এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজ ও সমীক্ষার জন্য ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী ৯ মে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় এই নতুন এডিপি উপস্থাপন করা হবে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।


 আগামী দিনের অর্থনৈতিক করিডোর

দ্বিতীয় পদ্মা এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতু শুধু ইটের পর ইট আর স্টিলের কাঠামো নয়; এগুলো হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক করিডোর। এই দুটি সেতু নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে যে গতির সঞ্চার হবে, তা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। এখন দেখার বিষয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট পাওয়ার পর সরকার কত দ্রুত এই মেগা প্রকল্পগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।


তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category