পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এবার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর সরকারের পতনের পেছনে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ একটি বড় কারণ হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই জয়ের প্রকৃত ও নীরব রূপকার হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। ২০২১ সালের বিধানসভা কিংবা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সংঘ অনেকটা আড়ালে থাকলেও, এবারের নির্বাচনে তারা নিজেদের খোলস ছেড়ে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাদের এই অভূতপূর্ব সক্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি বিশেষ কৌশল—বাংলাদেশের হিন্দুদের উদাহরণ টেনে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের মনে ‘অস্তিত্বের ভয়’ জাগিয়ে তোলা।
বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থা এবং ‘অস্তিত্বের সংকট’-এর ন্যারেটিভ
নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই আরএসএস একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। সংঘের এক প্রচারক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে তাদের শত শত স্বয়ংসেবক ও কর্মী সাধারণ ভোটারদের কাছে একটাই মূল বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন—এটি কেবল একটি রাজনৈতিক নির্বাচন নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সমাজের ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ লড়াই।
আরএসএসের প্রবীণ প্রচারক বিজয় আঢ্য এই কৌশলের কথা স্বীকার করে বলেন, “এবারের নির্বাচন ছিল হিন্দু সমাজের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।” তিনি জানান, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ভয়াবহ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কথা মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
বিজয় আঢ্য আরও বলেন, “সংঘের কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে সচেতন করেছেন। আমরা সাধারণ মানুষকে বলেছি যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের আজ যে করুণ অবস্থা হয়েছে, একই পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গেও তৈরি হবে। পশ্চিমবঙ্গই বাঙালি হিন্দুদের একমাত্র মাতৃভূমি। তাই এখান থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে বিদায় করা উচিত। কারণ তাদের একমাত্র নীতি হলো মুসলিম সম্প্রদায়ের তোষণ। আমরা ভোটারদের বুঝিয়েছি, যদি এবার বিজেপির সরকার গড়া না যায়, তবে হিন্দুদের বাধ্য হয়ে আরও একবার পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যেতে হবে।” এই আবেগঘন ও ভীতিজাগানিয়া প্রচারণাই হিন্দু ভোটারদের এককাট্টা করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তৃণমূল স্তরে ‘শাখা’র জাদুকরী বিস্তার
বিজেপির এই বিশাল জয়ের পেছনে কোনো ম্যাজিক নয়, বরং কাজ করেছে আরএসএসের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক ভিত্তি, যাকে তারা ‘শাখা’ বলে থাকে। এই শাখাসমূহ হলো সংঘের মূল প্রাণশক্তি। বিগত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের শাখার সংখ্যা অবিশ্বাস্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দশ বছর আগে যেখানে রাজ্যে মাত্র এক হাজারের মতো শাখা ছিল, সেখানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার হাজার শাখা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
সংঘের ‘প্রান্ত ব্যবস্থা প্রমুখ’ (কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) সীতারাম দাগা জানান, স্বয়ংসেবকরা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে ভোট চান না। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
মি. দাগার ভাষ্যমতে, “আমরা যখন মানুষের সঙ্গে কথা বলি, তখন শুধু এটাই বলি যে—যারা দেশের স্বার্থে কাজ করছে, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার কথা ভাবছে, যারা হিন্দুত্বের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এবং সমাজের সেবা করছে, আপনারা তাদেরকেই নির্বাচিত করুন। আমরা কখনোই সরাসরি বলি না যে আপনারা বিজেপিকে ভোট দিন। কিন্তু যেহেতু সংঘের স্বয়ংসেবকরা বিজেপিতেও সক্রিয় আছেন, তাই সাধারণ মানুষ এই সমীকরণটি খুব ভালোভাবেই বোঝেন।” সমালোচকরা অবশ্য মনে করেন, সংঘের এই ‘অরাজনৈতিক’ দাবি আসলে একটি কৌশল মাত্র। আদতে এই শাখাগুলোর মাধ্যমেই সমাজের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদী হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের বিষবাষ্প বা প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের বদল ও বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির রূপান্তর
আরএসএস কখনোই উচ্চস্বরে স্লোগান দিয়ে বা বড় বড় রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে বক্তৃতা করে রাতারাতি প্রভাব বিস্তারে বিশ্বাসী নয়। তাদের প্রধান রণকৌশল হলো মানুষের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন, দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। ফোন কল, পারিবারিক দেখা-সাক্ষাৎ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে তারা মানুষের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনে।
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ এই পরিবর্তনের চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আরএসএসের মূল কাজ হলো মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে এবং অত্যন্ত মৃদুভাবে একটি সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করা। তাদের পরিচালিত স্কুল ও পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে একটি বিশেষ ধরনের মতাদর্শ শেখানো হয়, যা দিনশেষে বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকেই লাভবান করে।”
অধ্যাপক মাহমুদ আরও উল্লেখ করেন যে, ভারতজুড়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ সমাজের একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি ছিল—তারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পড়বেন, তারা হবেন প্রগতিশীল, শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু আরএসএস অত্যন্ত সুচারুভাবে এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। এখন অনেক শিক্ষিত ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও প্রকাশ্যে বিজেপি ও তাদের হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে সমর্থন করছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ (যাদের বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নেই) বলে যে তকমা দিয়েছিল এবং সফল হয়েছিল, এবার সেই অস্ত্র একেবারেই ভোঁতা হয়ে গেছে। কারণ আরএসএস বাঙালি সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকে বিজেপির জন্য একটি শক্ত সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দিয়েছে।
ধর্মীয় মেরূকরণের চূড়ান্ত রূপ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ভূমিকা
এবারের নির্বাচনে ধর্মীয় মেরূকরণ যে কতটা তীব্র ছিল, তা ভোটের ফলাফলের পর বিজেপি নেতা ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যেই স্পষ্ট। তিনি সরাসরি বলেছেন যে, তার দলের এই জয় আসলে ‘হিন্দুত্বের জয়’।
অধ্যাপক জাদ মাহমুদও মনে করেন, এই নির্বাচনে সুস্পষ্ট হিন্দু বনাম মুসলমান ভোটযুদ্ধ হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর ভবানীপুর কেন্দ্র নিয়ে করা মন্তব্য (যেখানে তিনি বলেছিলেন, হিন্দু এলাকার ভোট একদিকে যাবে এবং মুসলিম এলাকার ভোট অন্যদিকে যাবে) এই মেরূকরণেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
এর পাশাপাশি, নারী ও যুবসমাজের কাছে পৌঁছানোর জন্য আরএসএসের বিভিন্ন সহযোগী ছাত্র ও নারী সংগঠনগুলো ব্যাপকভাবে কাজ করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে ‘সীমান্ত চেতনা মঞ্চ’ নামক আরএসএসের একটি সহযোগী সংগঠন অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। তারা সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে সামনে এনে প্রচারণায় ঝড় তুলেছিল।
আগামীর পশ্চিমবঙ্গ ও সংঘের লক্ষ্য
বিজেপি সরকার গঠন করার পর পশ্চিমবঙ্গে এখন আরএসএসের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। সংঘের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছেন যে, রাজ্যে এতদিন তাদের কাজের পথে যে ‘ভয়ের পরিবেশ’ ছিল, তা এখন আর নেই। ফলে আগামী দিনগুলোতে আরও বহু মানুষ প্রকাশ্যে আরএসএসের কর্মসূচিতে যুক্ত হবেন বলে তারা আশাবাদী।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আরএসএস-এর কাজ কোনো একটি নির্দিষ্ট সরকার গঠন বা পতনের ওপর নির্ভর করে না। বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে, সংঘ তাদের মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক বিস্তার নীরবে চালিয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, যখন কোনো সুশৃঙ্খল সংগঠন দীর্ঘসময় ধরে তৃণমূল স্তরে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতির ভেতরে কাজ করে, তখন তার ফলশ্রুতিতে নির্বাচনী রাজনীতিতে সুনামি আসতে বাধ্য। বিজেপি সরকারের ছত্রছায়ায় আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের প্রভাব কতটা শিকড় গাড়ে, ভারতের রাজনৈতিক মহল এখন সেদিকেই গভীর নজর রাখছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি হিন্দি