• শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০৫:৪৫ অপরাহ্ন
Headline
অনলাইনে সাত ধরনের প্রতারণা ফারাক্কা বাঁধ এখন দেশের জন্য ‘মরণফাঁদ’: মির্জা ফখরুল চীনের সঙ্গে বিশ্বকাপ সম্প্রচার চুক্তি সম্পন্ন: অনিশ্চয়তায় ভারতের বাজার হাম ও এর উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় ১২ শিশুর মৃত্যু: হাসপাতালে ভর্তি ১৩০৩ জন গাজীপুরে এক সপ্তাহে ১১ খুন: চরম আতঙ্কে সাধারণ মানুষ অবৈধ সিসা লাউঞ্জ বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য: ডিএমপি কমিশনারকে তলবের আবেদন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিষয়ে ২০২৪ সালেই উদ্বেগ জানিয়েছিলাম: তাসনিম জারার চট্টগ্রামে এনসিপির নবগঠিত কমিটি থেকে ২২ নেতার একযোগে পদত্যাগ ১১ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ: রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহার করে পুনর্বিবেচনার দাবি জামায়াতের যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচন: পাঁচ শতাধিক ইসলামপন্থি ও ফিলিস্তিন সমর্থক কাউন্সিলরের বিজয়

হারিয়ে যাওয়া শৈশব ও স্ক্রিনের বন্দিদশা—আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

Reporter Name / ১ Time View
Update : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

একটা সময় ছিল যখন ‘শৈশব’ শব্দটির সমার্থক ছিল ধুলোমাখা শরীর, বিকেলের সোনা রোদ, মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে হইচই আর ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দ। মায়ের বকুনি খেয়ে সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফেরার সেই দিনগুলো আজ যেন রূপকথার গল্প। বর্তমানের যান্ত্রিক নগরজীবনে আমাদের শিশুদের শৈশব আটকে গেছে চার দেয়ালের মাঝে, আর তাদের খেলার মাঠ পরিণত হয়েছে হাতের মুঠোয় থাকা ছয় ইঞ্চির একটি আলোকিত স্ক্রিনে। স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা টিভির নীল আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্মের চোখের জ্যোতি, সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের মানসিক বিকাশ ও স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস।

কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, একটুখানি শান্তিতে কাজ করার জন্য বা সন্তানকে শান্ত রাখার জন্য আমরা তাদের হাতে যে ‘ডিজিটাল খেলনা’ তুলে দিচ্ছি, তা আসলে কতটা ভয়ংকর ক্ষতি করছে? সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি-এর এক গবেষণায় উঠে আসা তথ্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এক নির্মম ও ভয়াবহ বাস্তবতা।


ভয়াবহ বাস্তবতা: সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কান্না

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ঢাকার ৬টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। সেই গবেষণার যে ফলাফল সামনে এসেছে, তা যেকোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সময় ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন শিশুই চোখের মারাত্মক সমস্যায় ভুগছে। শুধু কি তাই? প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার মতো যন্ত্রণাদায়ক সমস্যার শিকার হচ্ছে। একবার ভাবুন তো, যে বয়সে একটি শিশুর আনন্দে হেসে-খেলে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে সে চোখের জ্বালা আর মাথাব্যথায় কাতরাচ্ছে!

গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকার শিশুরা দিনে গড়ে সাড়ে চার ঘণ্টারও বেশি সময় কাটাচ্ছে স্মার্টফোন, টিভি, ট্যাব কিংবা গেমিং ডিভাইসের স্ক্রিনে। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে তাদের চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে, ফুলে যাচ্ছে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তারপরও তারা ডিভাইস হাতছাড়া করতে চাইছে না। মোবাইল বা ট্যাব কেড়ে নিলেই শুরু হচ্ছে তাদের প্রচণ্ড জেদ, কান্না আর অস্বাভাবিক আচরণ। এটি নিছক কোনো অভ্যাস নয়, এটি একটি নীরব মহামারি—যা আমাদের শিশুদের তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে।


দায় কার? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিভাবকেরা

শিশুদের এই করুণ পরিণতির জন্য আমরা কি শুধু নগরায়ণ, খেলার মাঠের অভাব বা আধুনিক প্রযুক্তিকেই দায়ী করব? আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণা আমাদের, অর্থাৎ অভিভাবকদের দিকেও একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে।

গবেষকরা দেখেছেন, বাচ্চারা যেখানে গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিভাইসে সময় দিচ্ছে, সেখানে তাদের অভিভাবকরাও নিজেদের বিনোদন বা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য গড়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিনে কাটাচ্ছেন। কর্মব্যস্ত দিন শেষে বাবা-মা যখন বাসায় ফিরে নিজেদের ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন শিশুটিও স্বভাবতই তার নিঃসঙ্গতা কাটাতে একটি স্ক্রিনের আশ্রয় নেয়। আমরা যদি নিজেরাই আমাদের সন্তানের সামনে সঠিক ‘রোল মডেল’ হতে না পারি, তবে তাদের কীভাবে দোষ দিই?


কীভাবে বাঁচাব আমাদের সন্তানদের? সমাধানের রূপরেখা

শৈশব একবার হারিয়ে গেলে তা আর কখনোই ফিরে আসে না। ডিজিটাল এই বন্দিদশা থেকে আমাদের শিশুদের বের করে আনতে হলে শুধু নিষেধ করলেই হবে না, তাদের বিকল্প বিনোদন ও সময় কাটানোর উপায় তৈরি করে দিতে হবে। নিচে শিশুদের স্ক্রিন থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল ও আনন্দদায়ক উপায়ে ব্যস্ত রাখার কিছু কার্যকর পথ বাতলে দেওয়া হলো:

১. কোয়ালিটি টাইম বা গুণগত সময় নিশ্চিত করা

গবেষকদের সবচেয়ে বড় পরামর্শ হলো, কর্মজীবী বাবা-মা যেন সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে অন্তত একটি ঘণ্টা সম্পূর্ণভাবে সন্তানকে দেন। এই এক ঘণ্টা সময় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টিভি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এই সময়ে সন্তানের সারা দিনের গল্প শুনুন, তাকে জড়িয়ে ধরুন, তার সঙ্গে হাসুন। আপনার সান্নিধ্যই সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি খেলনা।

২. বইয়ের জাদুকরী জগতে পরিচয় করানো

শিশুর হাতে ট্যাবের বদলে তুলে দিন রঙিন গল্পের বই। বয়সভিত্তিক ছবিওয়ালা বই, রূপকথার গল্প বা অ্যাডভেঞ্চারের বই তাদের কল্পনাশক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাতে ঘুমানোর আগে সন্তানকে পড়ে শোনানোর অভ্যাস করুন। এতে বইয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়বে এবং স্ক্রিনের প্রতি আকর্ষণ কমবে।

৩. সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা

শিশুদের মন স্বভাবতই সৃজনশীল হয়। তাদের ব্যস্ত রাখতে কিনে দিন রংপেন্সিল, জলরং, ক্লে (মাটি), লেগো বা বিল্ডিং ব্লকস। ওরিগ্যামি বা কাগজ দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানো শেখাতে পারেন। এসব কাজ তাদের মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ণ করে, হাতের পেশির উন্নতি ঘটায় এবং দীর্ঘ সময় তাদের মনোযোগ ধরে রাখে।

৪. পারিবারিক কাজে সম্পৃক্ত করা

শিশুরা বড়দের অনুকরণ করতে ভালোবাসে এবং কোনো কাজের দায়িত্ব পেলে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তাই ঘরের ছোটখাটো কাজে তাদের সঙ্গী করুন। যেমন—গাছে পানি দেওয়া, নিজের খেলনা গুছিয়ে রাখা, বিছানা পরিপাটি করতে সাহায্য করা বা রান্নার সময় সবজি ধুয়ে দেওয়া। এর ফলে তারা স্বাবলম্বী হতে শিখবে এবং ডিভাইস থেকে দূরে থাকবে।

৫. ইনডোর গেমস এবং পারিবারিক আড্ডা

বাইরে খেলার মাঠ না থাকলে ঘরের ভেতরেই বিনোদনের ব্যবস্থা করুন। লুডু, দাবা, ক্যারম, পাজল বা মনোপলির মতো বোর্ড গেমগুলো দারুণ বিকল্প। ছুটির দিনে পুরো পরিবার মিলে একসঙ্গে এই খেলাগুলো খেলুন। এতে পারিবারিক বন্ধনও দৃঢ় হবে।

৬. প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া

সপ্তাহের শেষে ছুটির দিনে তাদের চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে যান। পার্ক, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর বা নদীর পাড়ে ঘুরতে নিয়ে যান। ইট-পাথরের শহরে যদি তা-ও সম্ভব না হয়, তবে অন্তত ছাদে বা বারান্দায় তাদের নিয়ে ছোট্ট একটি বাগান করুন। মাটির স্পর্শ, গাছের বেড়ে ওঠা দেখা—এগুলো শিশুদের মানসিক প্রশান্তি দেয়।

৭. ‘স্ক্রিন-ফ্রি জোন’ ও নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া

হঠাৎ করে ডিভাইস সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই স্ক্রিন টাইম নির্দিষ্ট করে দিন। যেমন—দিনে শুধু এক ঘণ্টা টিভি বা কার্টুন দেখতে পারবে। এছাড়া বাড়িতে কিছু ‘স্ক্রিন-ফ্রি জোন’ বা ‘ডিজিটাল ডিটক্স এলাকা’ তৈরি করুন, যেমন—খাবারের টেবিল বা শোবার ঘরে কোনো ফোন বা ট্যাব ব্যবহার করা যাবে না।


আমাদের সন্তানেরা কোনো রোবট নয়; তারা রক্তে-মাংসে গড়া এক অদ্ভুত সুন্দর প্রাণ, যাদের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন মুক্ত বাতাস, মানুষের সান্নিধ্য এবং প্রচুর ভালোবাসা। একটুখানি নির্ঝঞ্ঝাট সময়ের লোভে আজ আমরা তাদের হাতে যে নীরব বিষ তুলে দিচ্ছি, তা হয়তো তাদের আগামী দিনের স্বপ্ন দেখার চোখ দুটোকেই অন্ধ করে দিচ্ছে।

আসুন, আজ থেকেই সচেতন হই। স্ক্রিনের ওই কৃত্রিম আলো থেকে আমাদের সন্তানদের বের করে এনে তাদের হাত ধরে হাঁটি বাস্তব পৃথিবীর পথে। কারণ, আজ যদি আমরা তাদের সময় না দিই, তবে কাল হয়তো তারা আর আমাদের নিজেদের পৃথিবীতে ফিরে আসার পথটুকু খুঁজে পাবে না। শৈশব বাঁচলে, বাঁচবে আমাদের আগামী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category