• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন
Headline
ইসরায়েলে আরও একটি প্যাট্রিয়ট পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল? ৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ৭ দিনের রিমান্ডে আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা শহরে পদ্মা থেকে ১০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের নতুন প্রকল্প জয়-পুতুলসহ ৮ জনের মামলায় সিআরআইয়ের আয়কর নথি জব্দের আদেশ গুরুদাসপুর থানার ওসি প্রত্যাহার

পেলের রাজকীয় রেকর্ডে নেইমারের ছোঁয়া: ১০ নম্বর জার্সিতে সেলেসাওদের শেষ মহাকাব্যের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব

Reporter Name / ১০৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ফুটবল বিশ্বে ব্রাজিল এবং তাদের বিখ্যাত হলুদ জার্সি কেবল একটি খেলার পোশাক নয়, বরং এটি এক জীবন্ত ইতিহাস, আবেগ এবং শিল্পের সমার্থক। আর সেই হলুদ জার্সির পিঠে যদি লেখা থাকে ‘১০’ নম্বর, তবে তার ভার ও মর্যাদা যেন আকাশ ছুঁয়ে যায়। গত কয়েক মাস ধরে পুরো ফুটবল বিশ্বে একটি গুঞ্জনই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছিল—আসন্ন বিশ্বকাপে কি দেখা যাবে ব্রাজিলের পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রকে? ইনজুরি, বয়স এবং ফর্মহীনতার যে কালো মেঘ তার ক্যারিয়ারের আকাশে জমেছিল, তা কি তিনি সরিয়ে দিতে পারবেন? অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনা, ধোঁয়াশা আর অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। সেলেসাওদের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন এবং একেবারে শেষ মুহূর্তে সেই মহার্ঘ্য তালিকায় তিনি অন্তর্ভুক্ত করেছেন ব্রাজিলের প্রাণভোমরা নেইমারকে। এর মধ্য দিয়ে শুধু যে সান্তোস থেকে উঠে আসা এই মেগাস্টার আবারও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর সুযোগ পেলেন তা-ই নয়, বরং তিনি পা রাখতে যাচ্ছেন ফুটবল সম্রাট পেলের গড়া এক অমর ও রাজকীয় রেকর্ডের একেবারে সমকক্ষে।

ফুটবল ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়ে মাঠে নামার রেকর্ডটি এতকাল এককভাবে কেবল ফুটবলের রাজা পেলের দখলেই ছিল। ব্রাজিলিয়ান এই কিংবদন্তি বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা চারটি বিশ্বকাপে (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ এবং ১৯৭০) ব্রাজিলের বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আনচেলত্তির এই ডাকে সাড়া দিয়ে আসন্ন বিশ্বকাপে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে নেইমারও ঠিক চারটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি পরার অনন্য ও বিরল রেকর্ডে পেলের পাশে নিজের নাম লেখাতে যাচ্ছেন। পেলের পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে জিকো, রিভালদো, রোনালদিনহোর মতো অনেক রথী-মহারথী এই দশ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কেউই চারটি বিশ্বকাপে এই জার্সি পরার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি। এখানেই নেইমারের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার ওপর ব্রাজিলিয়ানদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থার প্রমাণ মেলে।

ব্রাজিলের এই ১০ নম্বর জার্সির ইতিহাসটা কিন্তু বেশ রোমাঞ্চকর। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের আগে এই জার্সির আলাদা কোনো আকর্ষণ বা মহিমা ছিল না। সেবার ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে খেলোয়াড়দের জার্সি নম্বর পাঠাতে ভুলে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে ফিফার একজন কর্মকর্তা সম্পূর্ণ দৈবচয়নের ভিত্তিতে (র‍্যান্ডমলি) খেলোয়াড়দের জার্সি নম্বর বণ্টন করে দেন। আর সেই লটারিতেই ১৭ বছর বয়সী এক কৃশকায় কিশোরের ঘাড়ে এসে পড়ে ১০ নম্বর জার্সি। সেই কিশোরের নাম ছিল এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, যাকে বিশ্ব চেনে ‘পেলে’ নামে। নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই সেই কিশোর একের পর এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড ভাঙতে শুরু করেন। বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হওয়া, সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক করা, ফাইনালে জোড়া গোল করা এবং সবশেষে দলকে বিশ্বকাপ জেতানো—পেলের জাদুতে সেই সাধারণ ১০ নম্বর জার্সিটি রাতারাতি পরিণত হলো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সংখ্যায়। এরপর ১৯৬২ এবং ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে পেলের ক্যারিয়ার কিছুটা থমকে গেলেও, ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে নিজের চতুর্থ ও শেষ আসরে তিনি ১০ নম্বর জার্সিতে যে জাদুকরী ফুটবল উপহার দিয়েছিলেন, তা এই জার্সিকে এনে দিয়েছে অমরত্বের মর্যাদা। প্রথম তিনটি বিশ্বকাপ জিতে পেলে প্রমাণ করেছিলেন, ১০ নম্বর জার্সি মানেই শ্রেষ্ঠত্ব।

পেলের সেই ঐতিহ্য আর ভার কাঁধে নিয়েই ২০১৪ সালে নিজের ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ১০ নম্বর জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছিলেন নেইমার। সেবার পুরো ব্রাজিল দল আবর্তিত হচ্ছিল তাকে ঘিরেই। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান ক্যামিলো জুনিগার সেই ভয়াবহ ফাউলে নেইমারের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়, আর তার সাথে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় হেক্সা জয়ের ব্রাজিলিয়ান স্বপ্ন। এরপর ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপেও তিনি একই সংখ্যার জার্সি পরে খেলেছেন, কিন্তু দল বিদায় নেয় বেলজিয়ামের কাছে হেরে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও সেই ১০ নম্বর জার্সিতেই মাঠে নেমেছিলেন নেইমার। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তার করা জাদুকরী গোলটি হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলগুলোর একটি হয়েই থাকবে, কিন্তু টাইব্রেকারে হেরে সেবারও তাকে চোখের জলে বিদায় নিতে হয়েছিল। এখন পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপে ১৩টি ম্যাচ খেলে নেইমার ৮টি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৩টি গোল। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স যথেষ্ট উজ্জ্বল, কিন্তু পেলের মতো সেই পরম আরাধ্য সোনালি ট্রফিটা এখনও তার ছোঁয়া হয়নি। আসন্ন বিশ্বকাপে পেলের ঐতিহ্য ধরে রেখে সেই অধরা ট্রফি জয়ের জন্যই হয়তো শেষবারের মতো নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেবেন এই ফরোয়ার্ড।

২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে নেইমারকে আর ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে দেখা যায়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল (অ্যান্টেরিওর ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট) ইনজুরিতে পড়ে তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য মাঠের বাইরে চলে যান। তার এই অনুপস্থিতির সময়ে ব্রাজিলের এই আইকনিক ১০ নম্বর জার্সিটি কে পরবেন, তা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই শূন্যস্থান পূরণের দায়িত্ব ওঠে রিয়াল মাদ্রিদের দুই তরুণ তুর্কি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং রদ্রিগোর কাঁধে। গত মার্চ মাসে ইউরোপের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সিতে খেলেছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় এই ১০ নম্বর জার্সিটি পরার কথা ছিল রদ্রিগোর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইনজুরির কারণে তিনি স্কোয়াড থেকে ছিটকে পড়েন। তবে সে সময় রদ্রিগো তার পূর্বসূরি নেইমারের প্রতি যে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল।

নেইমারের অনুপস্থিতিতে এই জার্সির মালিকানা নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা রদ্রিগো অত্যন্ত আবেগময় ও বিনম্র ভাষায় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, “আমি সবসময় এটা পরিষ্কার করতে চাই যে, এখন আমি ১০ নম্বর জার্সি পরলেও এটি মূলত তার। আমি শুধু এই মুহূর্তের জন্য পরছি। আমরা তার ফেরার জন্য অপেক্ষা করছি।” রদ্রিগোর এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বর্তমান প্রজন্মের ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের কাছে নেইমার কতটা শ্রদ্ধার এবং দশ নম্বর জার্সির প্রকৃত মালিক হিসেবে তারা কেবল নেইমারকেই মানেন। ধরে নেওয়াই যায়, দীর্ঘ ইনজুরি কাটিয়ে জাতীয় দলের স্কোয়াডে ফেরায় আসন্ন বিশ্বকাপে সেই চিরচেনা ১০ নম্বর জার্সিটি আবারও নেইমারের শরীরেই শোভা পাবে।

তবে নেইমারের এই ফেরাটা মোটেও মসৃণ ছিল না। গত কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড জাতীয় দলের জার্সি খুব একটা গায়ে জড়ানোর সুযোগ পাননি। ২০২২ বিশ্বকাপের পর দীর্ঘমেয়াদি ইনজুরি, পিএসজি ছেড়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে পাড়ি জমানো এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে এই মেগাস্টার জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন মাত্র চারটি ম্যাচ। ফুটবল পণ্ডিতদের অনেকেই ধারণা করেছিলেন, নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়তো এখানেই শেষ। কিন্তু ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তি তার ওপর থেকে আস্থা হারাননি। আনচেলত্তি খুব ভালো করেই জানেন, একটি বিশ্বকাপ জেতার জন্য দলে কেবল তরুণ প্রতিভা থাকলেই চলে না, ড্রেসিংরুমে একজন অভিজ্ঞ নেতার প্রয়োজন হয়, যার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে পারে। আনচেলত্তি ডাক দেওয়ায় সেলেসাওদের হয়ে বিশ্বকাপ আক্ষেপ ঘুচানোর এই শেষ সুযোগটি নেইমার দু’হাত ভরে গ্রহণ করবেন, সেটাই সবার প্রত্যাশা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিসংখ্যানে নেইমার ইতোমধ্যেই পেলেকে ছাড়িয়ে গেছেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বলিভিয়ার বিপক্ষে গোল করে তিনি ব্রাজিলের হয়ে পেলের গড়া ৭৭ গোলের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের কাছে, বিশেষ করে ব্রাজিলিয়ানদের কাছে, বিশ্বকাপ না জিতলে কোনো কিংবদন্তিই যেন পূর্ণতা পায় না। ‘দ্য কিং’ পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতে নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, নেইমার হয়তো শিরোপা সংখ্যার দিক থেকে তাকে ছুঁতে পারবেন না। কিন্তু ১০ নম্বর জার্সিতে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডে পেলের পাশে বসাটাও কোনো অংশে কম গৌরবের নয়।

উত্তর আমেরিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন এই বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে নেইমারের ক্যারিয়ারের ‘লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ নাচ। ইনজুরির কারণে বারবার থমকে যাওয়া ক্যারিয়ার, গণমাধ্যমের তীব্র সমালোচনা, আর ভক্তদের পাহাড়সম প্রত্যাশার চাপ—সবকিছুকে পেছনে ফেলে নেইমার চাইবেন তার ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে অন্তত একবার সেই সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরতে। যখন তিনি ১০ নম্বর জার্সি গায়ে টানেল দিয়ে মাঠে প্রবেশ করবেন, তখন তার কাঁধে শুধু একটি দেশের প্রত্যাশা থাকবে না, থাকবে ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু হওয়া পেলের সেই রাজকীয় ঐতিহ্যের অদৃশ্য ভার। আনচেলত্তির ছকে, তরুণ ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগোদের গতিশীল ফুটবলের সাথে নেইমারের জাদুকরী প্লে-মেকিং যদি ঠিকঠাক মিলে যায়, তবে হয়তো ফুটবলের ঈশ্বর এবার আর খালি হাতে ফেরাবেন না ব্রাজিলের এই ট্র্যাজিক হিরোকে। ফুটবল বিশ্ব এখন কেবল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়, যখন ১০ নম্বর জার্সিতে পেলের পাশে দাঁড়িয়ে নেইমার তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যটি রচনা করবেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category