দীর্ঘ দেড় দশকের একচ্ছত্র শাসন, জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান এবং অবশেষে গণরোষের মুখে দেশত্যাগ—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পটপরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিণতি নিয়ে দেশজুড়ে জল্পনা-কল্পনার কোনো শেষ নেই। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ইতোমধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। কিন্তু তিনি বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে অবস্থান করায় সেই দণ্ড কার্যকর করা নিয়ে আইনি ও কূটনৈতিক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। তবে এবার সেই ধোঁয়াশা কাটিয়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। সরকার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, ভারত যদি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়, তবে তাকে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে, কিন্তু দিন শেষে চূড়ান্ত বিচারের রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার কোনোভাবেই পিছপা হবে না।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) বেলা ১২টার দিকে বাংলাদেশ সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই কঠোর ও সুস্পষ্ট আইনি অবস্থানের কথা তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এ সময় তার পাশে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ। সংবাদ সম্মেলনটিতে মূলত দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় কৌতূহলের জায়গা ছিল ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তার ফাঁসির রায় কার্যকর করার বিষয়ে সরকারের কূটনৈতিক ও আইনি প্রস্তুতি নিয়ে। এ বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অত্যন্ত পেশাদার এবং আইনানুগ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে সোপর্দ করলে তাকে আইনের সুরক্ষা দেওয়া হবে। চূড়ান্ত রায়ে আদালত যে সিদ্ধান্ত দিবে সরকার তা বাস্তবায়ন করবে।” তথ্য উপদেষ্টার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দুটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমত, সরকার শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে ভারতের সাথে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় কূটনৈতিক ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চরম গণরোষ থাকা সত্ত্বেও সরকার কোনোভাবেই মব জাস্টিস বা বিচারবহির্ভূত কোনো পদক্ষেপের দিকে হাঁটবে না। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আপিল বা আইনি লড়াইয়ের যেটুকু সুযোগ পাওয়ার কথা, রাষ্ট্র তাকে সেই সুরক্ষা প্রদান করবে। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে, রাষ্ট্রযন্ত্র তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।
শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সমীকরণটি অত্যন্ত জটিল। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন যেকোনো আসামিকে একে অপরের হাতে তুলে দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তীতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ফিরিয়ে আনার আইনি ভিত্তি এখন অনেক বেশি মজবুত। তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, সরকার এখন সেই কূটনৈতিক ও আইনি পথেই হাঁটছে এবং বল এখন পুরোপুরি নয়াদিল্লির কোর্টে। ভারত যদি আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে তাকে হস্তান্তর করে, তবে বাংলাদেশের মাটিতেই তার দণ্ড কার্যকর করার পথ সুগম হবে।
তথ্য উপদেষ্টার এই আইনি ব্যাখ্যার পর সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক ও নৈতিক দিক থেকে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চরম স্বৈরতান্ত্রিক শাসন এবং জুলাই বিপ্লবের পেছনের কারণগুলো স্মরণ করিয়ে দেন। কেন দেশের আপামর জনতা একটি শক্তিশালী সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “জুলুম ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন হয়েছে।” বছরের পর বছর ধরে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধী মত দমন এবং মানুষের ভোটাধিকার হরণের মতো যে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিগত সরকার কায়েম করেছিল, জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ছিল মূলত সেই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এক চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
তবে বিগত সরকারের সেই চরম অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক কর্মকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বর্তমান সরকারের একটি বড় আদর্শিক পার্থক্যের কথা ঘোষণা করেন। তিনি প্রতিশোধের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সবার প্রতি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কারো প্রতি রাজনৈতিক কারণে বিচারবহির্ভূত কিছু করবে না, যেমনটা আওয়ামী লীগ সরকার করে গেছে।” তথ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি দেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় বার্তা। বিগত সরকার যেভাবে আইন ও আদালতকে নিজেদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে এবং ক্রসফায়ার বা গুমের মতো বিচারবহির্ভূত প্রথার জন্ম দিয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই পথে হাঁটবে না। শেখ হাসিনাসহ বিগত সরকারের যত শীর্ষ কর্মকর্তাই গ্রেপ্তার হোন বা দেশে ফিরে আসুন না কেন, তাদের বিচার হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সচিবালয়ের আজকের এই সংবাদ সম্মেলনটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই বিপ্লবের পর সাধারণ মানুষ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি অত্যন্ত জোরালো। মানুষের সেই আবেগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার যেমন বিচারের রায় কার্যকর করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এটিও বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে যে, বাংলাদেশে এখন আইনের শাসন বিরাজমান এবং এখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো স্থান নেই। ভারত হাসিনাকে ফিরিয়ে দিলে দেশের মাটিতে তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হবে—সরকারের এমন ঘোষণা দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এখন পুরো দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর দিল্লির দিকে, তারা বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে বাংলাদেশের আদালতের দণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামিকে কবে নাগাদ ঢাকার হাতে তুলে দেয়।