• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৪:১৮ অপরাহ্ন
Headline
রাতের ভ্রমণে ১০টি সতর্কতা মালয়েশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মির্জা আব্বাসকে দেখতে গেলেন গোলাম পরওয়ার দিল্লি ফেরালেই আইনি সুরক্ষা, তবে শাস্তি আদালতের হাতে: হাসিনার পরিণতি নিয়ে সরকারের স্পষ্ট বার্তা কোরবানির ঈদ নিয়ে ভিন্ন ভাবনায় পরীমনি পেলের রাজকীয় রেকর্ডে নেইমারের ছোঁয়া: ১০ নম্বর জার্সিতে সেলেসাওদের শেষ মহাকাব্যের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব ফুটপাত পথচারীর, নাকি হকারের? জায়গা বরাদ্দ নীতিমালার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের কড়া রুল আগ্রাসনের কড়া জবাব: সীমান্তে প্রতিরোধের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ কওমি রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ: জামায়াত-হেফাজত স্নায়ুযুদ্ধে ভাঙনের মুখে ইসলামী ঐক্য ‘ভূমি সেবা জনগণের প্রতি করুণা নয়’: হয়রানিমুক্ত আধুনিক ব্যবস্থাপনার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন রূপরেখা

ফুটপাত পথচারীর, নাকি হকারের? জায়গা বরাদ্দ নীতিমালার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের কড়া রুল

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

মেগাসিটি ঢাকার যানজট এবং বিশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই ফুটপাত দখলকে দায়ী করে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাধারণ মানুষ। একটি আধুনিক শহরের অন্যতম শর্ত হলো পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য প্রশস্ত ও বাধামুক্ত ফুটপাত। কিন্তু রাজধানী ঢাকার চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে ফুটপাত মানেই যেন হকারদের অঘোষিত মার্কেট, আর পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাঁটা। এই চিরচেনা বিশৃঙ্খলাকে এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই সম্প্রতি প্রণয়ন করা হয়েছিল ‘ঢাকার হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’। কিন্তু এই নীতিমালার আওতায় রাস্তা এবং ফুটপাতে হকারদের জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে এবার কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে উচ্চ আদালত। রাজধানী ঢাকার রাস্তায় এবং ফুটপাতে হকারদের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া কেন অবৈধ এবং বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন। সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই রুলের জবাব দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাদেরকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) বর্তমান প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মূলত ‘ঢাকার হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’-এর বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শোয়েবুজ্জামান। তার এই রিটের প্রেক্ষিতেই উচ্চ আদালত নাগরিক অধিকার রক্ষায় এই গুরুত্বপূর্ণ রুল জারি করেন।

রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শোয়েবুজ্জামান গণমাধ্যমের কাছে তার আইনি অবস্থান এবং রিটের পেছনের যুক্তি তুলে ধরে বলেন, “ফুটপাত কোনোভাবেই বাণিজ্যিক বরাদ্দের জায়গা হতে পারে না। এটি দেশের সাধারণ নাগরিক এবং পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য সরকারি অর্থে তৈরি করা হয়েছে। কোনো নীতিমালা তৈরি করে ফুটপাতে হকারদের জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত শুধু বেআইনিই নয়, এটি সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকদের অবাধ চলাচলের মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। এই নীতিমালা শহরের যানজট ও বিশৃঙ্খলাকে আরও স্থায়ী রূপ দেবে।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত শহরের লাখ লাখ পথচারীর মনের কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যারা প্রতিদিন ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে না পেরে মূল সড়কে নেমে বাস বা ট্রাকের নিচে চাপা পড়ার আতঙ্কে ভোগেন।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন কিছুদিন আগেই হকারদের শৃঙ্খলায় আনার কথা বলে এই ‘হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, হকারদের বারবার উচ্ছেদ করেও কোনো লাভ হয় না; তারা আবার ফিরে আসে। তাই তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দিয়ে একটি নিয়মের মধ্যে আনলে শহরের ফুটপাতগুলো হয়তো কিছুটা হলেও হাঁটার উপযোগী থাকবে। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদরা শুরু থেকেই এই নীতিমালার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার রাস্তার আয়তন এমনিতেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম। একটি আদর্শ শহরে যেখানে ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা প্রয়োজন, সেখানে ঢাকায় রাস্তা রয়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এর মধ্যে যে সামান্য ফুটপাত রয়েছে, তা যদি সরকারিভাবে হকারদের বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে তা হবে নগর ব্যবস্থাপনার জন্য এক চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

ফুটপাত দখলের এই বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল এক অবৈধ অর্থনীতির অদৃশ্য জাল। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার গবেষণা ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, ঢাকার ফুটপাতগুলো ঘিরে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার নীরব চাঁদাবাজি হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, মাস্তান, লাইনম্যান এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন ‘টোল’ বা চাঁদা আদায় করে। হকাররা বাধ্য হয়েই ফুটপাতে বসার জন্য এই সিন্ডিকেটকে টাকা দেন। রিটকারী এবং সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, সিটি কর্পোরেশন যদি হকারদের জায়গা বরাদ্দ দেয়, তবে এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটই পরোক্ষভাবে লাভবান হবে এবং ফুটপাত চিরতরে পথচারীদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হলে ফুটপাতের ওপর হকারদের একটি আইনি বৈধতা তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে চাইলেও আর উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে না।

অন্যদিকে, এই সমস্যার একটি মানবিক এবং আর্থসামাজিক দিকও রয়েছে, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। হকাররা এই সমাজেরই অংশ। নদীভাঙন, বেকারত্ব এবং চরম দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে আসা লাখ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হলো এই ফুটপাতের ব্যবসা। হকার নেতাদের দাবি, তাদের পুনর্বাসন না করে বারবার উচ্ছেদ করাটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। তারা চুরি বা ছিনতাই না করে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সৎ পথে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে যে, হকারদের জন্য ছুটির দিনে হলিডে মার্কেট চালু করা, নির্দিষ্ট হকার্স মার্কেট তৈরি করা অথবা বিদেশে যেমন নির্দিষ্ট জোনে হকারদের বসার ব্যবস্থা করা হয়, ঢাকায় তেমনটি করা হোক। হকারদের পেটে লাথি মেরে কোনো উচ্ছেদ অভিযানই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না বলে তারা মনে করেন।

ঢাকার ইতিহাসে ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য এর আগেও বহুবার ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। বুলডোজার দিয়ে হকারদের চৌকি ভেঙে ফেলা হয়েছে, মালামাল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু চিরচেনা ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলায় দিন শেষে হকাররাই আবার ফুটপাতে ফিরে এসেছেন। সকালে উচ্ছেদ হলে বিকেলে আবার পসরা সাজিয়ে বসেছেন তারা। এর মূল কারণ হলো, এই হকারদের বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা। তাই কেবল পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

বিশ্বের অনেক আধুনিক মেগাসিটিতে হকার সমস্যা সমাধানে চমৎকার কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। একসময় সিঙ্গাপুরের রাস্তাও হকারদের কারণে বিশৃঙ্খল ছিল। কিন্তু সে দেশের সরকার হকারদের উচ্ছেদ না করে তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর এবং পরিকল্পিত ‘হকার সেন্টার’ বা ফুড কোর্ট তৈরি করে দিয়েছে। আজ সিঙ্গাপুরের সেই হকার সংস্কৃতি ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ বা অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ‘স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট’ বা হকার সুরক্ষা আইন রয়েছে, যার মাধ্যমে শহরগুলোতে হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে তারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন, কিন্তু ফুটপাত বা প্রধান সড়ক দখল করে নয়। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহরও স্ট্রিট ফুড ও হকার ব্যবস্থাপনায় সারা বিশ্বে একটি রোল মডেল।

বাংলাদেশকেও ঠিক এমন কোনো বিকল্প পথের সন্ধান করতে হবে। ফুটপাত পথচারীদের জন্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে, এখানে কোনো আপস করা চলবে না। কারণ ফুটপাতে হাঁটতে না পেরে মূল সড়কে নেমে প্রতিদিন যে অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন, তার দায়ভার কেউ নিতে চায় না। বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ঢাকা শহরের ফুটপাতগুলো আক্ষরিক অর্থেই এক বিভীষিকা। হাইকোর্টের এই রুল জারি করার মধ্য দিয়ে আশা করা যায় যে, সরকার ও সিটি কর্পোরেশনগুলো তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং তড়িঘড়ি করে ফুটপাত বরাদ্দের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।

এখন হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার ফুটপাতগুলোর ভবিষ্যৎ। আদালত যদি এই হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালাকে অবৈধ ঘোষণা করেন, তবে সরকারকে বাধ্য হয়েই নতুন করে ভাবতে হবে। হকারদের জীবিকা যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি পথচারীদের হাঁটার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। পরিত্যক্ত সরকারি জমি, ফ্লাইওভারের নিচের খালি জায়গা কিংবা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বহুতল হকার্স মার্কেট নির্মাণের মাধ্যমে এই সমস্যার একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান বের করা এখন সময়ের দাবি। হাইকোর্টের এই কড়া পদক্ষেপের পর সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কী জবাব দেয় এবং হকারদের পুনর্বাসনে কী ধরনের নতুন রূপরেখা প্রণয়ন করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category