• রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০২:০২ পূর্বাহ্ন

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেবে ইরান

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক চাপ এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে সুর নরম করার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তবে এই নমনীয়তা কোনোভাবেই একতরফা নয়। তেহরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা পারমাণবিক ইস্যুতে পশ্চিমাদের সঙ্গে পুনরায় সমঝোতায় যেতে বা ছাড় দিতে প্রস্তুত, কিন্তু এর বিনিময়ে পশ্চিমা বিশ্বকেও দৃশ্যমান ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী দেশটি মূলত তাদের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবমুক্ত করার শর্ত জুড়ে দিয়েছে।

২০১৫ সালের চুক্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ইরানের সদিচ্ছা

ইরানের এই শর্ত এবং বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান সহযোগী অধ্যাপক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ফোয়াদ ইজাদি। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান যে ছাড় দিতে পারে, তার প্রমাণ তারা অতীতেই রেখেছে। ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তির সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিতে (জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ) ইরান বেশ কিছু বড় ধরনের এবং যুগান্তকারী ছাড় দিয়েছিল।

সেই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩.৬৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে সম্মত হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মাত্রার ইউরেনিয়াম দিয়ে কেবল বেসামরিক কাজে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণাই সম্ভব, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সাধারণত ৯০ শতাংশ বা তার বেশি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন হয়। এছাড়া, জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা ‘আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা’ (আইএইএ)-এর পরিদর্শকদের জন্য নিজেদের অত্যন্ত গোপনীয় পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও উন্মুক্ত করে দিয়েছিল তেহরান, যা ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি প্রচ্ছন্ন বার্তা

অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি তাঁর সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রশাসনের প্রতিও একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “পারমাণবিক ইস্যুটি নিয়ে আলোচনার দরজা এখনো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে। এই নির্দিষ্ট জায়গাটিতে ইরান যেকোনো যৌক্তিক ছাড় দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গ টেনে এই বিশ্লেষক বলেন, “ট্রাম্পের যদি মূল বা একমাত্র উদ্বেগ হয়ে থাকে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা, তবে সেই সমস্যার সমাধানের কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক তো আগে থেকেই তৈরি করা আছে।”

তাঁর কথার মূল ইঙ্গিত হলো, ২০১৫ সালের চুক্তিটিই সেই কাঠামো, যা প্রমাণ করে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে গিয়ে সংকট তৈরি করেছিল। এখন নতুন করে কোনো জটিল সমীকরণ তৈরি না করে পুরোনো চুক্তির শর্তগুলোকে সম্মান করলেই পারমাণবিক সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব।

তেহরানের অবিচল শর্ত: নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ অবমুক্তি

পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়ার সদিচ্ছা দেখালেও তেহরান এবার নিজেদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ। পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি চায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখুক, তবে তেহরানের পক্ষ থেকে দুটি স্পষ্ট ও অনড় শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে:

  • নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: অবিলম্বে ইরানের ওপর থেকে সমস্ত অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে। বছরের পর বছর ধরে চলা এসব একপেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

  • জব্দ করা সম্পদ অবমুক্তকরণ: বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা বা জব্দ করা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের বিপুল পরিমাণ তেল বিক্রির বৈধ অর্থ আটকে আছে, যা তারা নিজেদের দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারছে না।

অধ্যাপক ইজাদি এই বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে বলেন, “এটাই হলো তেহরানের সুস্পষ্ট প্রত্যাশা। পশ্চিমাদের বুঝতে হবে যে, ইরানের কাছে এগুলো কোনো গৌণ বা সাধারণ দাবি নয়; বরং ভবিষ্যতের যেকোনো চুক্তির একেবারে কেন্দ্রীয় ও প্রধান অংশ হলো এই শর্তগুলো পূরণ করা।”

ইরানের এই নতুন অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে বল এখন পশ্চিমা বিশ্বের কোর্টে ঠেলে দিয়েছে। তেহরান প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেয়ে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং জনগণের কল্যাণকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের এই যৌক্তিক শর্ত মেনে নিয়ে পারমাণবিক সমঝোতায় ফিরবে, নাকি নিষেধাজ্ঞার কঠোর পথেই হাঁটবে—তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য তথা পুরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category