• শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ০২:১১ পূর্বাহ্ন
Headline
হজ পালনে সৌদি আরবে পৌঁছালেন ৭৭ হাজার বাংলাদেশি বাসভবন থেকে পায়ে হেঁটে নিজ রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু: দুই মাসে প্রাণহানি ছুঁল প্রায় ৫০০ রামিসার কবর জিয়ারতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সংসদ সদস্য সুস্থ কোরবানির পশু চেনা এবং মাংস সংরক্ষণের খুঁটিনাটি চিরকূট এবং গুঞ্জন সিলেটে মাদকসেবীর ছুরিকাঘাতে র‍্যাব সদস্য নিহত, জিম্মি নাটক শেষে ঘাতক আটক চকরিয়ায় মাদকাসক্ত ছেলের নির্মম দায়ের কোপে বাবা খুন, হাত বিচ্ছিন্ন কৃত্রিম জনমত ও বটবাহিনীর ফাঁদে মানুষের স্বাধীন চিন্তা ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা: প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী যুবক নিয়ে তোলপাড়

ভারতে ব্যঙ্গাত্মক রাজনীতি: ‘ককরোচ’ পার্টির পর এল ‘পরজীবী ফ্রন্ট’

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন বরাবরই বৈচিত্র্যময়। তবে দেশটিতে এবার এমন এক ‘রাজনৈতিক’ যুগের সূচনা হয়েছে, যা শুধু অভিনবই নয়, বরং গভীর চিন্তারও খোরাক জোগাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও মিম সংস্কৃতির হাত ধরে ভারতে জন্ম নিয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ধারার দুটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন—‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ এবং সদ্য আত্মপ্রকাশ করা ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট (এনপিএফ)’। মূলত ‘জেন জ়ি’ বা তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনগুলো লোকসভা নির্বাচনের মতো গাম্ভীর্যের পাশাপাশি বেকারত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণ শ্লেষের মাধ্যমে তুলে ধরছে।

আরশোলা মন্তব্যের সূত্রপাত ও সিজেপি’র জন্ম

এই অভূতপূর্ব আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের মধ্য দিয়ে। এক মামলার শুনানিকালে তিনি বেকার তরুণ-তরুণীদের একাংশকে ‘আরশোলার’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার মতে, এসব তরুণ কোনো উপযুক্ত পেশায় স্থান না পেয়ে সাংবাদিক বা তথ্যের অধিকার কর্মী সেজে সবাইকে আক্রমণ করেন।

যদিও পরে প্রধান বিচারপতি তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান যে, তিনি মূলত ভুয়া ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদের কথা বুঝিয়েছেন এবং যুবসমাজকে অবমাননা করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। অনলাইনে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। আর এই ক্ষোভ থেকেই সংগঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বেকার তরুণরা, যার ফলস্বরূপ জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।

এই ব্যঙ্গাত্মক দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। পুণে থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক এবং বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগের ছাত্র অভিজিৎ একজন ‘রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ’। ২০২০ সালে আম আদমি পার্টির ডিজিটাল প্রচারেও তিনি কাজ করেছিলেন। প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পর তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় রসিকতা করে লিখেছিলেন, “যদি সব আরশোলা একজোট হয়?” সেই একটি লাইনই হাজার হাজার তরুণকে উদ্দীপ্ত করে এবং সিজেপি একটি পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেট আন্দোলনে রূপ নেয়।

সিজেপি’র অভিনবত্ব: ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’

সিজেপি নিজেদের ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের সদর দপ্তর সেখানে, ‘যেখানেই ওয়াইফাই কাজ করে’। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো তাদের ওয়েবসাইটটি গৎবাঁধা নয়, বরং পুরোটিই স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক। দলটির সদস্য হওয়ার জন্য কিছু অদ্ভুত ‘যোগ্যতা’র মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন—সদস্যকে অবশ্যই বেকার, অলস এবং সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে। পাশাপাশি পেশাগত ক্ষেত্রে ক্ষোভ প্রকাশ করার মানসিকতা থাকতে হবে।

শুরুর মাত্র দুই দিনের মধ্যেই সিজেপিতে ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ নাম নিবন্ধন করেন। এরপর হু হু করে বাড়তে থাকে তাদের সদস্য এবং ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ারের সংখ্যা। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই দলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইতোমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং বলিউডের অনুরাগ কশ্যপ ও কঙ্কনা সেনশর্মার মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিরা এর ‘সদস্যপদ’ গ্রহণ করেছেন। এমনকি দলটি জেন জ়ি প্রজন্মের জন্য একটি ভার্চুয়াল সম্মেলন আয়োজনেরও পরিকল্পনা করছে।

ইনস্টাগ্রামে সিজেপি দলের ফলোয়ারের সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা খোদ ক্ষমতাসীন দল বিজেপিসহ ভারতের মূলধারার অনেক দলের চেয়েও বেশি। তবে এই বিপুল জনপ্রিয়তার পরই মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্সে (সাবেক টুইটার) তাদের অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দেওয়া হয়।

পাল্টা জবাব: ‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট (এনপিএফ)’

ভারতে রাজনৈতিক শূন্যতা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয় না। সিজেপি’র অভাবনীয় জনপ্রিয়তার পরপরই ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে তাদের ‘বিরোধী দল’—‘ন্যাশনাল প্যারাসাইটিক ফ্রন্ট’ বা এনপিএফ।

সিজেপি যেখানে ‘অলস এবং বেকার’দের প্রতিনিধিত্ব করছে, এনপিএফ সেখানে আরও বেশি প্রতিবাদী এবং আক্রমণাত্মক। তারা সমাজব্যবস্থার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। এনপিএফ নিজেদের জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলনের আদলে সাজিয়েছে, যেখানে অতিরঞ্জিত বিপ্লবী ভাষা এবং তীক্ষ্ণ বিদ্রূপকে হাতিয়ার করা হয়েছে।

তারা ‘পরজীবী’দের এমন এক নাগরিক হিসেবে তুলে ধরেছে, যারা এই ভাঙা ব্যবস্থার মধ্যে কোনোমতে টিকে আছে। এনপিএফ তাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলেছে, “সিজেপির বিরোধী দল হিসেবে জন্ম নেওয়া এনপিএফ হলো এমন নাগরিকদের আন্দোলন, যারা শাসনব্যবস্থাকে নিছক নাটক হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। আমরা অপরাধমুক্ত সংসদ চাই এবং শিক্ষিত জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে আমরা সত্যিই চিন্তাভাবনা করছি।”

এনপিএফের ওয়েবসাইটের মতে, তাদের দলের নামটি ইচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া হয়েছে। তারা স্পষ্ট করেছে, “আমরা একটি ভাঙা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ঠিকই, তবে এর থেকে ব্যক্তিগত ফায়দা তোলার জন্য নয়; বরং ভেতর থেকে এই ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতেই আমরা তৈরি।”

ব্যঙ্গাত্মক ইশতেহারে বাস্তবতার দাবি

ভারতীয় রাজনীতির প্রাণভোমরা হলো নির্বাচনী ইশতেহার। সিজেপি এবং এনপিএফ—উভয় দলই ব্যঙ্গের মোড়কে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী দাবিদাওয়া নিয়ে তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে।

সিজেপি তাদের ইশতেহারে নিজেদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস’ বলে বর্ণনা করেছে। তবে তাদের দাবিগুলো মোটেই অলস নয়। তারা দাবি করেছে:

  • অবসর গ্রহণের পর প্রধান বিচারপতিদের রাজ্যসভার আসনে নিয়োগের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা।

  • সংসদের সদস্যসংখ্যা না বাড়িয়েই নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ।

  • দলত্যাগী বিধায়ক ও সাংসদদের জন্য অন্তত ২০ বছরের নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞা।

  • সিবিএসই (CBSE) বোর্ডের খাতা পুনঃনিরীক্ষার ফি বাতিল করা এবং এটিকে ‘প্রকাশ্য দুর্নীতি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া।

  • এছাড়া নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের প্রতি তারা জোরালো সমর্থন জানিয়েছে।

অন্যদিকে, এনপিএফ তাদের ইশতেহারে আরও নাটকীয় পথ অবলম্বন করেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, সমাজের ‘আসল পরজীবী’ কারা? এনপিএফ ‘পরজীবী’দের এমন এক সত্তা হিসেবে তুলে ধরেছে, যারা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে পথ চলে, যা সাধারণ নাগরিকদের কেবল শোষণ করে এবং ক্ষমতাবানদের অন্যায়ভাবে পুরস্কৃত করে।

আদর্শগত পার্থক্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এই দুটি দলের মধ্যে মূল পার্থক্যটি মূলত আদর্শগত। সিজেপি নিজেদের সেই স্থিতিস্থাপক নিম্নবর্গ হিসেবে তুলে ধরে, যারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিরাম চাপের মুখেও ‘আরশোলা’র মতো বেঁচে থাকতে জানে, মরতে অস্বীকার করে। অন্যদিকে, এনপিএফ সরাসরি সমাজব্যবস্থা ও ক্ষমতাশালীদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে তাদের পরজীবী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

বর্তমানে সিজেপি এবং এনপিএফ—কোনোটিই ভারতের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক স্বীকৃত কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তবে তাদের এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। জন্মের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দল দুটি ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল মাইলফলক অর্জন করেছে—তারা একই সঙ্গে মানুষকে হাসাচ্ছে এবং দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা, বেকারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এই ‘স্যাটায়ার মুভমেন্ট’ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category