পঁয়ত্রিশ বছর চাকরি করে তিনি অবসরে গেলেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের সমাপ্তিতে মন খারাপ হলেও তিনি তৃপ্ত। পেশাজীবনে চরম সাফল্য পেয়েছেন-সর্বোচ্চ পদে গেছেন। তৃপ্তির আরেক কারণ হলো, তিনি কখনো কাজে ফাঁকি দেননি। ছুটি নেননি।
বাসায় ফিরে আসার পর পরিবারের সদস্যরা ফুল দিয়ে তাঁকে বরণ করলেন। কেক কাটা হলো। খাবার টেবিলে অনেক আড্ডা হলো।
সে রাতে তিনি দেরি করে ঘুমাতে গেলেন। বেডরুমে যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী তাঁকে একটি চিরকূট দিলেন।
তাতে লেখা-
‘যখন আমাদের মেয়ে প্রথম ‘মা’ ডাকল সেদিন তুমি ছিলে অফিসে।
যেদিন ও ‘বাবা’ ডাকল সেদিন বসের সাথে কী যেন উদ্বোধন করতে গিয়েছিলে।
যেদিন সে প্রথম হাঁটতে শিখল সেদিন তুমি ছিলে বিদেশে।
যেদিন প্রথম স্কুলে গেল সেদিন তুমি ছিলে মিটিংয়ে।
তার যখন পাঁচ বছর হলো তখন কেক কাটার সময় তুমি ছিলে অফিসিয়াল ডিনারে। সে জিজ্ঞেস করেছিল- ‘মা, বাবা কি আমার চাইতে অফিসকে বেশি ভালোবাসে?’
যেদিন সে স্কুলে আবৃত্তিতে চ্যাম্পিয়ন হলো সেদিন তুমি অন্য শহরে অফিসিয়াল ট্যুরে গিয়েছ। তার গলায় ঝুলানো মেডেলটি তোমার দেখা
হলো না।
এসএসসিতে সে খুব ভালো রেজাল্ট করল। সেদিন খুব ভোরে তুমি ওয়াশিংটন যাত্রা করেছিলে। তার রেজাল্টের খবর তুমি জানলে প্রায় দুদিন পর!
ওর এইচএসসির রেজাল্টের দিন তুমি ছিলে রাজশাহী। বারবার ফোন করেও তোমাকে পাওয়া যায়নি। নেটওয়ার্ক কেন যেন কাজ করছিল না। প্রায় মাঝরাতে যখন খবরটি তোমাকে দিলাম ও তখন ঘুমে- তোমার ওকে অভিনন্দন জানানো হলো না।
ও যেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুলো সেদিন তোমার বদলি হলো। নতুন দায়িত্বে জয়েন করার কাজে তুমি খুব ব্যস্ত ছিলে।
তোমার মা কতবার বলেছেন- ‘বাড়ি আয়- কতদিন তোকে দেখি না।‘
তুমি বলতে- ‘সামনের সপ্তাহের ছুটিতে আসব মা।‘
কিন্তু ছুটির দিনে তুমি বাসায় বসে কাজ করার জন্য একগাদা ফাইল নিয়ে আসতে। তাই মায়ের কাছে আর যাওয়া হয়নি- তিনি হঠাৎ করে মারা গেলেন!
তোমার চাকরি আর আমাদের বিবাহিত জীবন সমান। পঁয়ত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে একটি ম্যারেজ ডেতেও আমি তোমাকে পাইনি। প্রথম প্রথম খুব সেজেগুঁজে অপেক্ষা করতাম। কাঁদতাম। পরে বাদ দিলাম। কী লাভ সেজে? কী লাভ কেঁদে?
ভদ্রলোক চিঠিটি পড়ে থমকে গেলেন। তার চেহারায় তীব্র বেদনা। স্ত্রী তাঁর হাত ধরে বললেন-
‘আমি তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য চিরকূটটি দেইনি। একটি ব্যাপার মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য দিয়েছি। তাহলো- তোমার এখন অফিস নেই, মিটিং নেই, মফস্বলে ট্যুর নেই, বিদেশ ভ্রমণ নেই, চারপাশ ঘিরে থাকা লোকজন নেই। কিন্তু আমি আছি। তোমার মেয়ে আছে। আমরা এতদিন দরজা খুলে অপেক্ষা করেছি- তোমাকে স্বাগত জানানোর জন্য। তোমাকে ঘিরে আমাদের ভালোবাসার কোলাহল কখনো থামবে না।’
তারপর তাঁর কণ্ঠ নিচু হয়ে এলো-
তিনি ফিসফিস করে বললেন- ‘এখনো সময় আছে, এখনো শুরু করা যায়…।’
ভদ্রলোক স্ত্রীর দিকে তাকালেন- কারো চোখে যে আক্ষেপ ও মমতা একই সাথে এত জ্যান্ত হয়ে ফুটে উঠতে পারে তা তিনি জানতেন না।
তাঁর কানের কাছে কে যেন গুনগুন করছে- ‘এখনো সময় আছে, এখনো শুরু করা যায়…।’
যদি কারো দেরি হয়ে যায় তারাও কান পাতুন- গুঞ্জনটি শুনবেন…
‘এখনো সময় আছে…
এখনো শুরু করা যায়…।’
পাদটিকা: একটি বিদেশি লেখায় আইডিয়াটি পেয়েছি। তারপর নিজের মতো করে লিখেছি। লেখাটিতে কিছুটা নিজ জীবনের প্রতিফলন দেখতে পাই। কখন যে মেয়েটা বড় হয়ে গেলো!