স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের দ্রুত প্রসারের ফলে গত এক দশকে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে একটি ভয়ংকর প্রবণতা—কৃত্রিমভাবে জনমতকে প্রভাবিত করা। এক সময়ের নিছক মত প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অপপ্রচার, বাণিজ্যিক অসম প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত চরিত্র হননের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারে। আর এই ধ্বংসাত্মক কাজের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে ‘বটবাহিনী’ বা ট্রল আর্মি (Troll Army)। সাধারণ মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে গ্রাস করা এই বট সংস্কৃতি বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
‘বট’ (Bot) শব্দটি মূলত এসেছে ‘রোবট’ থেকে। এটি এমন এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা প্রোগ্রাম, যা মানুষের মতো আচরণ করতে পারে। বটের মূল কাজ হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট করা। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর ব্যবহার অত্যন্ত নেতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বটবাহিনীর মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে গুজব ও ভুয়া খবর (ফেক নিউজ) ছড়ানো হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে অসংখ্য ভুয়া বা বট আইডি তৈরি করা হয়। যখন কোনো নির্দিষ্ট কন্টেন্ট বা এজেন্ডা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা হয়, তখন এই বট আইডিগুলো থেকে মুহূর্তের মধ্যেই হাজার হাজার কমেন্ট, লাইক ও শেয়ার করা হয়, যা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে একসঙ্গে করা অসম্ভব।
বটবাহিনীর এই দৌরাত্ম্য সম্পর্কে দেশের তরুণ প্রজন্ম কতটা সচেতন, তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তরুণদের মতে, বট আইডিগুলো চেনার কিছু সাধারণ উপায় রয়েছে। এসব আইডির সাধারণত কোনো ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য থাকে না এবং এদের নামগুলো হয় খুব অদ্ভুত ও রূপকধর্মী (যেমন- ‘আলোর পথের যাত্রী’, ‘অচেনা পথের পথিক’ ইত্যাদি)। তরুণরা মনে করেন, এই বটবাহিনীর কারণে দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছে। অনেকেই ইউটিউব বা ফেসবুকের চটকদার থাম্বনেইল দেখেই খবরের সত্যতা যাচাই না করে তা বিশ্বাস করে ফেলছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিমভাবে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, যা সাধারণ মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ‘মব কালচার’ (Mob Culture) বা দলবদ্ধ উন্মাদনার দিকে ধাবিত করে।
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বটবাহিনীর প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তরুণ প্রজন্মের ভাষ্যমতে, সরকার এবং বিরোধী দল—উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই বটবাহিনীকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করছে। যখন সরকারি দল এগুলো ব্যবহার করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকে বিরোধী দলের কার্যক্রমকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করা। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো বটবাহিনীর মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে বদনাম ও অসন্তোষ ছড়ানোর কাজে সক্রিয় থাকে। নির্বাচনের সময় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এই বটবাহিনীর কৃত্রিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সাধারণ মানুষের মনে এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয় যে, হয়তো নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ ভোটার বা ‘সুইং ভোটাররা’ প্রভাবিত হয়ে সেই দলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এমনকি নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশের আগেই বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকে ভুয়া ফলাফল প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। একই খবর যখন মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে বারবার দেখতে থাকেন, তখন অবচেতনভাবেই তাদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত হয়।
বটবাহিনীর এই অপতৎপরতার কারণে সাংবাদিকতার মতো মহৎ ও সংবেদনশীল পেশাও আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। বর্তমান সময়ে সংবাদকর্মীদের তথ্য সংগ্রহের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। কিন্তু প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভুয়া ছবি, ফুটেজ ও ভিডিওর কারণে সত্য যাচাই করা সাংবাদিকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো একটি ঘটনার ভিডিও দেখে সাংবাদিকরা যখন সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, ওসি বা ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করেন, তখন অনেক সময় প্রশাসনও বিব্রত হয়, কারণ আদতে সেখানে হয়তো কিছুই ঘটেনি। ভুল তথ্য ছড়ানোর কারণে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয় (Disaster) ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলো জনমত নিয়ন্ত্রণের জন্য সাধারণত দুটি স্তরে কাজ করে। প্রথমে তারা ‘ডিপফেক’ (Deepfake) ভিডিও বা ভুয়া কন্টেন্ট তৈরি করে তা আপলোড করে। এরপর সেই কন্টেন্টটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তাদের ট্রল আর্মি বা বটবাহিনী মাঠে নামে। শুধু অল্পশিক্ষিত মানুষই নয়, অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও এই সুনিপুণভাবে তৈরি করা ফেক ভিডিও বা কন্টেন্ট শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন।
বটবাহিনীর এই নেতিবাচক প্রভাবের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সমাজের নারীরা। বডি শেমিং থেকে শুরু করে কোনো নারীর যদি নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ থাকে, তবে তাকে টার্গেট করে এই বটবাহিনী কদর্যভাবে হামলে পড়ে। সম্প্রতি এক তরুণীর মৃত্যুর পরও তাকে নিয়ে বটবাহিনীর মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ অপপ্রচার চালানো হয়েছে। নারীদের ওপর এই ভার্চুয়াল হামলা অনেক সময় শারীরিক হামলার চেয়েও বেশি মানসিক যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সব স্তরের মানুষ একইভাবে প্রযুক্তিগতভাবে সচেতন নয় বলেই বটের দ্বারা তারা সহজে প্রভাবিত হচ্ছেন। শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। যেকোনো খবর দেখামাত্রই তা বিশ্বাস না করে, এর সত্যতা যাচাই-বাছাই (Fact-checking) করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সিলেবাসে ‘বট চেনার উপায়’ ও ‘ফেক নিউজ শনাক্তকরণ’ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
বটবাহিনীর কার্যক্রম বন্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রযুক্তি জায়ান্ট যেমন মেটা (ফেসবুক), গুগল, ইউটিউবের সঙ্গে সরকারকে চুক্তিতে যেতে হবে, যাতে তারা বট আইডিগুলো নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে। তবে সরকারের সাইবার সিকিউরিটি আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এটিও নিশ্চিত করতে হবে যেন এর সুযোগ নিয়ে স্বাধীন ও সুষ্ঠু জনমতকে কোনোভাবেই দমন করা না হয়।
পরিশেষে, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বজুড়েই আজ ডিজিটাল যুদ্ধ বা সাইবার ওয়ারফেয়ারের একটি অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই বট সংস্কৃতি। রাজনৈতিক দল, কর্পোরেট গোষ্ঠী এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বার্থে কৃত্রিম জনমত তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, শেয়ার বা মন্তব্যের সংখ্যা কখনোই কোনো ঘটনার সত্যতার চূড়ান্ত মানদণ্ড হতে পারে না। এই বটবাহিনী ও কৃত্রিম জনমত সম্পর্কে যদি এখনই আমরা সচেতন না হই, তবে অচিরেই এই ভার্চুয়াল ভিড়ে হারিয়ে যাবে মানুষের অমূল্য স্বাধীন চিন্তাশক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকার।