• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৯:৩০ অপরাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

নতুন হকার নীতিমালায় পুরোনোরা বাদ পড়ছেন ফুটপাত থেকে

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার ফুটপাতগুলোকে দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের পর, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার আওতায় পুনরায় হকার বসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ও পুরোনো হকারদের একটি বড় অংশই বাদ পড়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে গুলিস্তান, ফার্মগেট, নিউমার্কেট ও মিরপুর ১০ নম্বরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উচ্ছেদ হওয়া পুরোনো হকারদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সম্পূর্ণ নতুন কিছু মুখ। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা, পুলিশ, হকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠনের কিছু নেতা এবং সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট নিজেদের মধ্যে ফুটপাত ভাগাভাগি করে নিয়েছে। তারা নিজেদের পছন্দের ও অনুগত লোকদের তালিকাভুক্ত করে ফুটপাতের জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছেন। এমনকি বরাদ্দ পাওয়া কেউ কেউ আবার সেই জায়গা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্যকে ভাড়া দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। পুনর্বাসন ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার নামে এই ধরণের ‘ভাগাভাগি’র ফলে ফুটপাত ও সড়কগুলোতে সেই পুরোনো বিশৃঙ্খলা ও জনভোগান্তি আবারও ফিরে আসছে। পথচারী চলাচলের পথ এবং যানবাহন চলাচলের সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

রাজধানীর গুলিস্তানের মসজিদ মার্কেটের সামনের ফুটপাতের দৃশ্যটি এখন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সেখানে নতুন করে কাপড়ের পসরা সাজিয়েছেন আতিকুর রহমান সুজন নামে এক ব্যক্তি। ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার পর আবার হকার বসার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তিনিও দোকান সাজিয়েছেন। আলাপকালে জানা গেল, হকারি পেশায় তিনি একেবারেই নতুন; মাত্র সাত দিন আগে এই ব্যবসা শুরু করেছেন। এর আগে দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি একটি মুদিদোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। ফুটপাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হঠাৎ কীভাবে দোকান পেলেন, জানতে চাইলে সুজন অকপটে স্বীকার করেন যে, বর্তমান সরকারি দলের শ্রমিক সংগঠনের স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতা তাঁকে এই জায়গাটি পাইয়ে দিয়েছেন। তাঁর ঠিক পাশেই পসরা সাজানো হাফিজুর রহমানও হকারি পেশায় একেবারে নতুন। তিনি এই জায়গা বরাদ্দ পেয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এক কর্মচারীর আত্মীয়ের বদৌলতে। সুজন ও হাফিজুরের মতো গত এপ্রিলের প্রথমার্ধে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের পর আবারও গুলিস্তানের ফুটপাতে জায়গা পাওয়া হকারদের একটি বড় অংশই নতুন মুখ। কেবল গুলিস্তান নয়, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মিরপুর ১০ নম্বরসহ রাজধানীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ফুটপাতে একই চিত্র ফুটে উঠেছে।

রাজধানীতে দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসা হকারদের বিরুদ্ধে গত এপ্রিলের শুরু থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালায়। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং পুলিশের উদ্যোগে একটি তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর মাঝেই সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগ নতুন হকার নীতিমালাও অনুমোদন করেছে। সেই নীতিমালার আলোকে নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের একটি স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন, বসার নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ এবং তাঁদের জন্য কিউআর কোডসংবলিত স্মার্ট কার্ড বা লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) প্রায় ৮৩০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) প্রায় ২ হাজার ৭০ জন হকারের প্রাথমিক তালিকা সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে পুরো এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকৃত হকারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। হকারদের অভিযোগ, তালিকায় নাম তুলতে হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও পুলিশি প্রভাব খাটানো হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য অবৈধ অর্থের লেনদেনও হচ্ছে। গুলিস্তানের এক পুরোনো হকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘যাগো শক্তিশালী নেতা আছে, তারা আবেদন করছে এবং জায়গা পাইছে। আমাগো মতো সাধারণ হকারগো কোনো নেতা নাই, তাই আমরা জায়গাও পাই নাই।’ বঙ্গবাজারের সামনে ফুটপাতে দীর্ঘদিন কাপড় বিক্রি করা আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘তালিকায় নতুন নতুন হকারের নাম উঠছে, যারা কোনো দিন এই ফুটপাতে ব্যবসা করে নাই। পুলিশ আর সিটি করপোরেশনের কিছু দুর্নীতিবাজ লোক নিজেদের আত্মীয়স্বজনের নাম তালিকায় ঢুকাইছে। এখন তাদের কাছ থেকে আমাদের জায়গা ভাড়া নিতে বলা হচ্ছে।’

ফুটপাতে হকার পুনর্বাসনের এই স্বচ্ছতা নিয়ে তৈরি হওয়া অভিযোগের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় পুলিশের বিভিন্ন বিভাগ এলাকাভিত্তিক হকারদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রণয়ন করেছে। সেই তালিকা পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করছে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন। স্থানীয় হকার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সাথেই বসে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে ফার্মগেট পদচারী-সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে তেজগাঁও কলেজ পর্যন্ত ফুটপাত ঘুরে অন্য চিত্র দেখা গেছে। গত ১ এপ্রিল এই এলাকায় ব্যাপক হকার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল, কিন্তু এখন আবার সেখানে শতাধিক দোকান বসেছে। হকাররা অভিযোগ করেন, পুলিশের তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের প্রণয়ন করা এই এলাকার তালিকায় অনেক পুরোনো ও প্রকৃত হকারদের নাম নেই। ফার্মভিউ সুপার মার্কেটের সামনে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে হকারি করা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও কার্ড পাইনি। অন্যরা কার্ড পেয়েছে শুনেছি। কার্ড না পাইলেও পেটের দায়ে বসতে হবে।’ ফুটপাতে জুতা বিক্রি করা মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমার তথ্যই কেউ নেয়নি। পরে অন্যের কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়ে বসতে বলা হয়েছে। রাজনীতি করা একজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁর বরাদ্দ আমাকে দেবেন।’ যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফার্মগেট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা সিটি করপোরেশনে পাঠানো হবে, কারা বসবেন সেই সিদ্ধান্ত নেবে সিটি করপোরেশন। নিউমার্কেট এলাকার এক হকার বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক হকারের নাম ইচ্ছে করেই তালিকায় রাখা হয়নি। তাঁদের বদলে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সামগ্রিক এই পরিস্থিতি এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই জোর দিয়ে বলে আসছি যে, পুনর্বাসনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অবৈধ অর্থের লেনদেনের অভিযোগ শুনছি। প্রকৃত হকারদের বাদ দিয়ে যদি সম্পূর্ণ নতুন লোকদের তালিকায় ঢোকানো হয়, তবে হকার পুনর্বাসনের এই মহৎ উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবে।’ হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কেবল সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত হকাররাই ফুটপাতে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন। তাঁদের দৈনিক চাঁদা প্রদানের পরিবর্তে মাসে ১০০ টাকা বা বছরে এক হাজার টাকা ফি দিতে হবে। হকার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রত্যেক নিবন্ধিত হকারকে কিউআর কোডসংবলিত স্মার্ট কার্ড বা লাইসেন্স দেওয়া হবে, যেখানে তাঁর ব্যবসার ধরন, নির্দিষ্ট স্থান এবং সময় সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। নীতিমালা অনুযায়ী, একটি পরিবার থেকে একজনের বেশি ব্যক্তি নিবন্ধন করতে পারবেন না। ব্যবসার সময় পরিচয়পত্র বা কার্ডটি সবসময় সঙ্গে রাখতে হবে এবং নির্ধারিত স্থানে কেবল নিবন্ধিত ব্যক্তিই বসতে পারবেন। নারী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ব্যক্তিদের জন্য এই নীতিমালায় ৩০ শতাংশ কোটা রাখার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও, ফুটপাতে অন্তত পাঁচ ফুট জায়গা পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য খালি রাখতে হবে। মেট্রো স্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে অন্তত ৩০ ফুট দূরে হকার বসতে পারবেন। বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসার সুযোগ থাকবে। কোনো নিয়ম ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা থাকবে কর্তৃপক্ষের হাতে। এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, নির্ধারিত স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে হকার বসার সুযোগ দিলে শৃঙ্খলা ফিরবে।

হকারদের জন্য নির্মিত পুনর্বাসন মার্কেটগুলোর অতীতের অবস্থাও খুব একটা সুখকর নয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে বর্তমানে ১২৯টি মার্কেট রয়েছে, যার মধ্যে ডিএসিসির ৯১টি এবং ডিএনসিসির ৩৮টি। এসব মার্কেটের একটি বড় অংশ অতীতে হকার পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যেই নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মার্কেটগুলোতে প্রকৃত হকাররা দোকান বরাদ্দ পেয়েছিলেন খুব কম। গুলিস্তানের ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর) ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে দোকানমালিকদের মধ্যে প্রকৃত হকার খুবই কম, বেশির ভাগই ভাড়া বা অন্যভাবে দোকান নিয়ে ব্যবসা করছেন। মার্কেটের দোকানমালিক আব্দুল মালেক আহাম্মদ বলেন, ‘২৫-৩০ বছর আগে ফুটপাতে ছিট কাপড় বিক্রি করতাম। পরে মার্কেটে দোকান পাই। কিন্তু এখানে প্রকৃত হকার খুব কম, বেশির ভাগই বড় ব্যবসায়ী।’ সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক হকার ফুটপাত ছেড়ে মার্কেটে যেতে চাননি বা মার্কেটের দোকান বরাদ্দ পাওয়ার পর তা বিক্রি করে দিয়ে আবার ফুটপাতে ফিরে এসেছেন। বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, অতীতে নির্মিত পুনর্বাসন মার্কেটগুলোতে মাত্র ৫-১০ শতাংশ প্রকৃত হকার জায়গা পেয়েছিলেন। স্বচ্ছতা ও সততা না থাকলে প্রকৃত হকাররা কখনোই উপকৃত হবেন না এবং ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আসবে না।

তথ্যসূত্র:  আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category