• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৯:১০ অপরাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে এবার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নজিরবিহীন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। সাধারণত ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা থেকে গরুর মাংস বা কোরবানি নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক মতপার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি যেন সম্পূর্ণ উল্টো এবং বেশ বিস্ময়কর। রাজ্যে ক্ষমতাসীন নতুন সরকার কোরবানিতে গরু বিক্রি ও জবাইয়ের ওপর কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় মুসলিম ধর্মীয় নেতারা মুসলমানদের গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন, অন্যদিকে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজ্যের গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন, বিশেষ করে গবাদিপশু পালনকারী দরিদ্র খামারিরা, মুসলমানদের গরু কোরবানি দেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে রাজপথে নেমে অভিনব বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। ধর্মীয় রীতিনীতির চেয়েও গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নটি যে কতটা প্রকট, এবারের এই ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র বিভাগ থেকে একটি অত্যন্ত কড়া ও সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়। এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, প্রশাসনের পূর্বানুমতি ছাড়া রাজ্যে কোনোভাবেই গরু, ষাঁড়, বাছুর বা মহিষ জবাই করা যাবে না। নতুন এই আইনি বেড়াজালে পশু জবাইয়ের প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো পশু জবাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পৌরসভা চেয়ারম্যান অথবা পঞ্চায়েত প্রধানের অনুমতির পাশাপাশি একজন সরকারি পশুচিকিৎসকের কাছ থেকে যৌথ শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কোন ধরনের পশু জবাই করা যাবে তারও একটি কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রশাসন। বলা হয়েছে, কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সী অথবা শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম ও অকেজো হয়ে পড়া পশুগুলোকেই জবাইয়ের জন্য বিবেচনা করা হবে। যারা এই সরকারি নির্দেশিকা বা আইন অমান্য করে বেআইনিভাবে পশু জবাইয়ের চেষ্টা করবেন, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইন ভঙ্গকারীদের জেল ও মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই কঠোর আইনি অবস্থানের কারণে আসন্ন ঈদুল আজহায় রাজ্যে আইনিভাবে গরু কোরবানির পথ কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

সরকারের এমন কঠোর সিদ্ধান্ত এবং আইনি জটিলতার প্রেক্ষাপটে রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা এক অত্যন্ত পরিণত, দূরদর্শী ও সম্প্রীতিমূলক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তারা উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাধারণ মুসলমানদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন। কলকাতার ঐতিহাসিক ও সবচেয়ে বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নাখোদা মসজিদের সম্মানিত ইমাম মাওলানা শফিক কাসমি এই বিষয়ে মুসলমানদের অত্যন্ত সতর্ক ও সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে সাধারণ মুসলিম ভাইদের প্রতি কোরবানির সময় গরু জবাই করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি বর্তমান পরিস্থিতি ও সামাজিক সম্প্রীতির কথা মাথায় রেখে গরুর মাংস খাওয়াও আপাতত বন্ধ করে দেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য রাজ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একইভাবে হুগলি জেলার ঐতিহাসিক ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা জিয়াউদ্দিন সিদ্দিকিও প্রায় অভিন্ন সুরে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ গরুকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করে এবং তারা এর পূজা করে থাকে। তাই প্রতিবেশীদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে মুসলমানদের উচিত কোরবানির জন্য গরুর বিকল্প হিসেবে ছাগল বা ভেড়া বেছে নেওয়া। ইসলাম ধর্মে ছাগল, ভেড়া বা উট কোরবানির সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে, তাই গরু কোরবানি না দিলে ধর্মীয় কোনো বাধ্যবাধকতা ক্ষুণ্ন হয় না বলে আলেম সমাজ মনে করছেন।

অন্যদিকে, ধর্মীয় নেতাদের এই শান্তিপূর্ণ আহ্বানের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে এক তীব্র অস্থিরতা ও হাহাকার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বামুনিয়া গ্রামের এক করুণ চিত্র উঠে এসেছে। এই গ্রামটির সিংহভাগ বাসিন্দাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং তাদের প্রধান পেশা ও আয়ের উৎস হলো গবাদিপশু পালন। এখানকার হিন্দু খামারিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। বছরের পর বছর ধরে তাদের একটি সাধারণ ব্যবসায়িক চক্র বা ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে। তারা মূলত ঈদুল আজহার বিশাল বাজারকে কেন্দ্র করেই তাদের খামার পরিচালনা করে থাকেন। কোরবানির ঈদের আগে চড়া দামে গরু বিক্রি করে তারা সারা বছরের জমানো ঋণ পরিশোধ করেন, গোখাদ্যের বকেয়া মেটান এবং নিজেদের সংসারের অভাব দূর করেন। কিন্তু এবার বর্তমান রাজ্য সরকারের জারি করা নতুন আইনের কারণে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন এই প্রান্তিক খামারিরা। আইনের কড়াকড়ি ও শাস্তির ভয়ে বাজারে এবার কেউই আর কোরবানির উদ্দেশ্যে গরু কিনছেন না। গরুর বাজারগুলোতে ক্রেতাদের কোনো আনাগোনা নেই, ফলে খামারিদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ঋণের কিস্তি শোধ করার দুশ্চিন্তায় গ্রামীণ এই হিন্দু খামারিদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সরাসরি প্রতিফলন দেখা গেছে রাজপথের বিক্ষোভে। ভারতের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম আজ তকের এক সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় এলাকায় কলকাতা হাইকোর্ট এবং রাজ্য সরকারের গরু কোরবানি বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রীতিমতো রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন শত শত হিন্দু নারী ও পুরুষ। তারা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এবং স্লোগান দিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছেন। বিক্ষোভকারী হিন্দু খামারিরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, কোরবানির নিয়মের ওপর যে প্রথাগত নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, তা তারা কোনোভাবেই মানেন না এবং ভবিষ্যতেও মানবেন না। তারা বলেন, রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষের রুটিরুজির কথা চিন্তা না করেই এই হঠকারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, খামারিদের গরু বিক্রি করতে দিতে হবে এবং এর জন্য মুসলমানদের গরু কোরবানির অনুমতি অবিলম্বে প্রদান করতে হবে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এই সাধারণ হিন্দু গ্রামবাসীদের বক্তব্য অত্যন্ত সহজ, সরল ও বাস্তবমুখী। তারা বলছেন, রাজনীতি বা ধর্মীয় বিভাজন দিয়ে তাদের পেট ভরবে না। ঋণদাতারা যখন কিস্তির টাকার জন্য দরজায় এসে কড়া নাড়বে, তখন এই আইন তাদের বাঁচাতে আসবে না। গবাদিপশুর খাবারের যে আকাশছোঁয়া দাম, তাতে বিক্রি করতে না পারলে এই পশুগুলো লালন-পালন করা তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদেই তারা চাইছেন অন্তত এবারের মতো মুসলমানদের বিনা বাধায় গরু কোরবানি দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। তাহলেই কেবল তারা তাদের সারা বছরের লালন-পালন করা গরুগুলো বিক্রি করে এনজিওর ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন এবং পরিবার নিয়ে দু’মুঠো খেয়ে বাঁচতে পারবেন। ধর্মীয় বিভেদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে পেটের দায় এবং অর্থনৈতিক টিকে থাকার এই সংগ্রাম পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন সামাজিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে, যেখানে হিন্দু খামারিরা মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে লড়ছেন স্রেফ নিজেদের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে। এই ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অর্থনীতি অনেক সময়ই আরোপিত ধর্মীয় আবেগ বা রাজনৈতিক দর্শনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category