বিশ্বজুড়ে যখন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপনের জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন, তখন ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিরাজ করছে এক ভয়াবহ ও শোকাবহ নীরবতা। ইসরাইলের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন, আকাশ ও স্থলপথের কঠোর অবরোধ এবং সাধারণ মানুষের বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে গাজার প্রাণিসম্পদ খাত আজ আক্ষরিক অর্থেই সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজার লাখ লাখ অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি পরিবার কোরবানির মহান ধর্মীয় উৎসব উদযাপন থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই ঐতিহ্যটি ফিলিস্তিনিদের জীবন থেকে যেন চিরতরে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কোরবানির ঈদ কেবল পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিলিয়ে দেওয়া এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার একটি পবিত্র মাধ্যম। কিন্তু দীর্ঘ আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় গাজাবাসীর সেই উৎসবের আনন্দ আজ শুধুই এক সুদূর অতীত স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। চারদিকে এখন কেবলই ধ্বংসযজ্ঞ, স্বজন হারানোর বেদনা এবং তীব্র অনাহারের হাহাকার।
গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রকাশিত অত্যন্ত হতাশাজনক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজার প্রাণিসম্পদ ও গবাদিপশু খাতের নব্বই শতাংশেরও বেশি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ভয়াবহ তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের একেবারে প্রথম প্রহরেই গাজার আশি শতাংশ ভেড়া এবং সত্তর শতাংশ ছাগল ইসরাইলি বোমাবর্ষণে প্রাণ হারায়। ইসরাইলি বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নিশানায় গাজার কৃষিখাত ও প্রাণিসম্পদকে ধ্বংস করেছে। উপত্যকার প্রায় প্রতিটি বড় খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্য মজুত করার বিশাল গুদাম এবং পশু চিকিৎসাকেন্দ্র বা ভেটেরিনারি ক্লিনিকগুলোকে নির্মমভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেঁচে থাকা গবাদিপশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে ন্যূনতম পশুখাদ্য ও পানির প্রয়োজন, ইসরাইলি কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে সেটিও জোগাড় করা এখন সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পানি উত্তোলনের পাম্প এবং কূপগুলো বোমা মেরে ধ্বংস করে দেওয়ায় এই খাতটিকে পুনরায় দাঁড় করানোর ন্যূনতম কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই।
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া বর্তমান পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা যে কোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ করে দেবে। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে গাজা উপত্যকায় প্রায় ষাট হাজার ভেড়া ও ছাগলের একটি বিশাল মজুত ছিল, যা এখন কমতে কমতে মাত্র তিন হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, গাজা থেকে গরু বা বাছুর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে বললেই চলে। বর্তমানে যে সামান্য কিছু ছাগল বা ভেড়া বেঁচে আছে, সেগুলো মূলত যাযাবর রাখালদের কাছে সংরক্ষিত আছে এবং তারা সেগুলো কোনোভাবেই বিক্রির জন্য বাজারে তুলছেন না। যুদ্ধের আগে প্রতি বছর কোরবানির সময় গাজায় চল্লিশ থেকে ষাট হাজার ভেড়া ও বাছুরের ব্যাপক চাহিদা থাকত। কিন্তু এখন বাজারে পশু না থাকায় এবং চরম সংকটের কারণে দাম সাধারণ মানুষের কল্পনারও অনেক বাইরে চলে গেছে। যুদ্ধের আগে গাজায় একটি ভেড়ার দাম ছিল পাঁচশো থেকে ছয়শো মার্কিন ডলার। অথচ বর্তমান সময়ে সেই একই ভেড়া কিনতে একজন ক্রেতাকে প্রায় সাত হাজার মার্কিন ডলার বা বিশ হাজার শেকেল গুনতে হচ্ছে। এই আকাশছোঁয়া মূল্যের কারণে কোরবানির পশু কেনা গাজাবাসীর কাছে এখন এক অলীক স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
মাজেন আল-জেরজাউই নামের এক ফিলিস্তিনির জীবনের গল্প শুনলে গাজার বর্তমান অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা সহজেই অনুমান করা যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে গাজা সিটিতে তার একটি বিশাল গবাদিপশুর খামার ছিল এবং তিনি ছিলেন সেখানকার অন্যতম শীর্ষ খামারি। বছরের এই কোরবানির মৌসুমে তিনি শত শত ভেড়া ও ছাগল বিক্রির জন্য প্রস্তুত করতেন। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াল থাবায় তার সবকিছু নিমেষেই ধ্বংস হয়ে গেছে। জেরজাউই এখন কোনোমতে পরিবারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে একটি ছোট রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন। ইসরাইলি কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফাঁক গলে মাঝে মাঝে যে সামান্য হিমায়িত বা ফ্রোজেন মাংস উপত্যকায় প্রবেশ করে, তার ওপর নির্ভর করেই তাকে এই রেস্তোরাঁটি চালাতে হয়। চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি জানান, অন্য বছরগুলোতে এই সময়ে তিনি একাই প্রায় দুইশ গরু ও ভেড়া বিক্রি করতেন, অথচ আজ তার খামারে একটি জীবিত পশুও অবশিষ্ট নেই। ইসরাইল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গাজায় কোনো জীবিত পশু প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। জেরজাউই মনে করেন, ইসরাইল গাজার অধিবাসীদের এমনভাবে বিবেচনা করছে যেন তারা সেখানে কেবল সাময়িক সময়ের জন্য আটকে থাকা কোনো মানবগোষ্ঠী। শুধুমাত্র তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস টিকিয়ে রাখার জন্য যতটুকু ক্যালরি প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই খাদ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতায় জেরজাউই প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের প্রতি এক আবেগঘন আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাদের অনুরোধ করেছেন, তারা যেন কোরবানির জন্য গাজায় টাকা না পাঠিয়ে সেই অর্থ দিয়ে হিমায়িত মাংস কেনা বা আত্মীয়স্বজনদের অন্যান্য মৌলিক ও জরুরি মানবিক প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করেন।
কোরবানির এই দীর্ঘস্থায়ী অনুপস্থিতি গাজার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক জীবনে এক অপূরণীয় ও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় উৎসবগুলো ফিলিস্তিনিদের কাছে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের মানসিক প্রতিরোধের প্রতীক ছিল, যা আজ তারা হারিয়ে ফেলেছে। গাজা সিটির একজন স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালার কণ্ঠে সেই হারানোর গভীর বেদনা ফুটে উঠেছে। তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান, দীর্ঘ তিন বছর ধরে তারা ঈদের কোনো আনন্দই উদযাপন করতে পারছেন না। কোরবানির যে প্রকৃত আনন্দ এবং প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের মাঝে মাংস বিলিয়ে দেওয়ার যে তৃপ্তি, ফিলিস্তিনি সমাজ থেকে সেটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আবুরিয়ালা আরও এক ভয়ংকর সত্য তুলে ধরে জানান, কোরবানির মাংস তো দূরের কথা, গাজার বেশিরভাগ পরিবারের জন্য এখন তিন বেলার সাধারণ খাবার জোগাড় করাও এক অসাধ্য সাধন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজার অসংখ্য মানুষ আছেন যারা গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এক টুকরো ফ্রোজেন মাংসের স্বাদও নিতে পারেননি। অনাহার ও অর্ধাহারে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলোর কাছে কোরবানির ঈদ এখন কেবলই এক দীর্ঘশ্বাস আর বেদনার নাম। খামারিরা জানিয়েছেন, লাগাতার বোমাবর্ষণে যেমন অসংখ্য গবাদিপশু প্রাণ হারিয়েছে, তেমনি ইসরাইলি বাহিনীর বারবার এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে বেঁচে থাকা পশুগুলোকেও তারা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি। নিজেদের জীবন বাঁচাতে বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় অনেক খামারি চরম বাধ্য হয়ে পানির দামে বা স্রেফ এক বস্তা আটা বা ময়দা কেনার জন্য তাদের মহামূল্যবান গবাদিপশু বিক্রি করে দিয়েছেন।
এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন বা আইপিসি মূল্যায়নেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার প্রায় ষোল লাখ মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক মহলের চাপে মাঝে মাঝে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও, মানবিক সহায়তা এবং বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের ওপর ইসরাইলের কঠোর, অমানবিক ও অনিয়মিত নিষেধাজ্ঞার কারণে এই সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, গাজায় গবাদিপশু খাতের এই নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ কেবল মুসলমানদের একটি ধর্মীয় উৎসবকেই বন্ধ করে দেয়নি, বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিশাল এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে। পশুচিকিৎসক, খামারকর্মী, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ তাদের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব। স্থানীয় ফিলিস্তিনি ও মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, ইসরাইল অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং সুপরিকল্পিত উপায়ে গাজার সমাজব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল করে রাখতে চাইছে। ফিলিস্তিনিরা যেন কখনোই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে না পারে এবং স্বনির্ভর হওয়ার সমস্ত পথ যেন তাদের সামনে চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়, সেই লক্ষ্যেই এই ধ্বংসাত্মক অবরোধ টিকিয়ে রাখা হয়েছে। সারা বিশ্বের মুসলমানরা যখন ত্যাগের মহিমায় কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন গাজার লাখ লাখ নিরীহ মানুষ নিজেদের জীবন ও অস্তিত্ব রক্ষার এক অসম ও করুণ লড়াইয়ে রক্ত ঝরিয়ে চলেছেন।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই