• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন
Headline

কাগজেই আটকে আছে হার্টের রিংয়ের দাম কমানোর ঘোষণা

Reporter Name / ৬ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের রিং বা করোনারি স্টেন্টের দাম কমানোর সরকারি ঘোষণা গত তিন মাসেও বাস্তবায়ন করা যায়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১১টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ২৮ ধরনের রিংয়ের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর নির্দেশনা জারি করলেও রোগীরা এখনো আগের উচ্চমূল্যেই তা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ব্যয়বহুল এই চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের জন্য যে স্বস্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে এবং হৃদরোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসায় প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সভার পর সরকার নতুন করে এই দাম নির্ধারণ করেছিল। তবে আমদানিকারকদের সংগঠন মেডিকেল ডিভাইস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের অভিযোগ, এই মূল্য নির্ধারণ যৌক্তিকভাবে করা হয়নি। নতুন দাম পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে তাদের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়ার পর গত ১৩ মে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর আবারও বৈঠকে বসে। সেখানে মাত্র দুটি রিংয়ের দাম সামান্য পুনর্বিবেচনা করা হলেও বাকিগুলোর দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। সাধারণত জনস্বার্থে এ ধরনের প্রজ্ঞাপন সর্বসাধারণকে অবহিত করতে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করার নিয়ম থাকলেও এবার তা করা হয়নি, যা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ নিজস্বভাবে কোনো স্টেন্ট বা রিং উৎপাদন করে না। দেশের ৩১টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশ থেকে এগুলো আমদানি করে থাকে। প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জার্মানির কোয়ালিমেড ইনোভেটিভের তৈরি ম্যাগমা রিংয়ের দাম সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ কমিয়ে ৩৭ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার জেনস ডিইএস এবং ইতালির সিআরই-৮ রিংয়ের দাম ৫৬ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া জেনএক্সসিঙ্ক সিরোলিমাস রিং ৫০ হাজার থেকে কমিয়ে ৪৮ হাজার টাকা এবং লিমাস ট্র্যাক ব্র্যান্ডের রিংয়ের দাম ক্ষেত্রবিশেষে ৫৫ ও ৬০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে যথাক্রমে ৫০ ও ৫৫ হাজার টাকা করা হয়েছিল। ফরাসি অ্যামাজোনিয়া সির ও জার্মানির কোরোফ্লেক্স ব্যান্ডের রিংগুলোর দামও ৫৩ থেকে ৫৫ হাজার থেকে কমিয়ে ৫০ থেকে ৫২ হাজার টাকা করা হলেও বাজারে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

নতুন নির্দেশনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর রিং আমদানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছিল, যা এখনো উপেক্ষিত হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি রিংয়ের মোড়কের ওপর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদনকারী দেশ, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ডিএআর নম্বর স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া বিদেশ থেকে আমদানির পর বাজারে বা হাসপাতালে সরবরাহ করার আগে বাধ্যতামূলকভাবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে প্রতিটি চালানের ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার নিয়ম করা হয়। বর্তমানে দেশে প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে রক্তনালিতে সাধারণ রিংয়ের পরিবর্তে ওষুধের প্রলেপযুক্ত ‘মেডিকেটেড স্টেন্ট’ বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুর, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও কুমিল্লার নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত হাসপাতালে এই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়ে থাকে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৮৫ জন রোগীর শরীরে এই স্টেন্ট বসানো হয়।

নিয়ম কার্যকর না হওয়ায় চিকিৎসকমহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং আমদানিকারকরা তাদের পলিসিগত সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, চার মাস আগে দাম কমানোর সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা সত্ত্বেও কেন এটি এখনো কার্যকর হলো না, তা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। দেশের শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সাধারণ হৃদরোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অন্যদিকে মেডিকেল ডিভাইস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ওয়াসিম আহমদ জানান, তাদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা বা অংশীজন বৈঠক না করেই হঠাৎ এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বছর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া এভাবে দাম কমানো হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডিভাইস এনে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আখতার হোসেন জানান, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুত নতুন দাম কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলছে। হাসপাতালগুলোর নোটিশ বোর্ডেও দামের তালিকা টানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য রাখা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী সাশ্রয়ী মূল্যে নিশ্চিত করা।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category