বৈশ্বিক কূটনীতির শীর্ষমঞ্চ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এই গৌরবময় অর্জনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মনে গভীর কৌতুহল তৈরি হয়েছে এই পদের আসল কাজ, ক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে। জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য দেশের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক গোপন ব্যালট ভোটে জয়ী হয়ে তিনি এই দায়িত্ব লাভ করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে সাধারণ পরিষদের সভাপতির এই পদটিকে স্রেফ আলঙ্কারিক মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে বিশ্ব রাজনীতি ও জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণে এই পদের রয়েছে এক বিশাল নৈতিক ও আইনি কার্যকারিতা। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধবিগ্রহ চলছে, তখন এই বিশ্ব সংস্থাকে নেতৃত্ব দেওয়া অত্যন্ত মর্যাদার ও জটিল একটি কাজ। আগামী ৮ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এক বছর মেয়াদী এই অধিবেশনে বাংলাদেশের এই যোগ্য প্রতিনিধি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাবেন।
জাতিসংঘের এই উচ্চপদের নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নির্বাচনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯টি ভোট, অন্যদিকে তাঁর একমাত্র শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১টি ভোট। মাত্র আট ভোটের ব্যবধানে এই ঐতিহাসিক বিজয় নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘ ৪০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো এই মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসার গৌরব অর্জন করল। এর আগে দূর অতীতে, ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। চার দশক পর পুনরায় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের এই কূটনীতিবিদের জয়লাভ বৈশ্বিক রাজনীতিতে দেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। ইউনাইটেড النেশনস নিউজ (ইউএন নিউজ) তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, খলিলুর রহমান এমন এক সময়ে এই বিশ্ব সংস্থাকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন যখন জাতিসংঘ বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং নানামুখী অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রধান কাজ হলো প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনগুলোর কার্যপ্রণালী ও বিতর্ক সফলভাবে পরিচালনা করা। এখানে বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিরা অংশ নেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস এবং জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের সাবেক মুখ্য লেখক ড. সেলিম জাহানের মতে, সাধারণ পরিষদে যেখানে বিশ্বের ১৯৩টি দেশ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কে লিপ্ত হয়, সেখানে সেই আলোচনাকে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং একটি চূড়ান্ত উপসংহার বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত করার ক্ষেত্রে সভাপতির ভূমিকা থাকে অপরিসীম। একজন সভাপতিকে সম্পূর্ণ নির্মোহ, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে এই কাজ পরিচালনা করতে হয়। তাঁর কোনো আচরণে যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা পরাশক্তির প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ না পায়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হয়। এই নিরপেক্ষতার কারণেই সভাপতির নৈতিক অবস্থান ও প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়, যা বিবাদমান বিভিন্ন পক্ষকে এক টেবিলে আনতে সাহায্য করে।
সাবেক প্রবীণ কূটনীতিবিদ এম হুমায়ুন কবিরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতি বছর প্রায় ১৬৫টির মতো এজেন্ডা বা আলোচ্যসূচি থাকে, যেগুলোর ওপর দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত বা সর্বসম্মতি (কনসেনশাস) গ্রহণ করতে হয়। এই সাধারণ পরিষদের অধীনে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে, যা মানতে জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র আইনগতভাবে বাধ্য:
শান্তিরক্ষা মিশনের বাজেট পরিচালনা: জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা বা পিসকিপিং মিশনের ম্যান্ডেট বা রাজনৈতিক অনুমোদন নিরাপত্তা পরিষদে হলেও, এর বিশাল বাজেটিং ও অর্থায়নের মূল কাজটি সম্পন্ন হয় সাধারণ পরিষদে সভাপতির দূরদর্শী তত্ত্বাবধানে।
জাতিসংঘের মূল বাজেট অনুমোদন: প্রতি দুই বছর পর পর পুরো জাতিসংঘের অধীনে থাকা ছয়টি প্রধান সংস্থার সামগ্রিক নিয়মিত বাজেট পরিচালনার অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণও করে থাকে এই সাধারণ পরিষদ।
এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদ বা সিকিউরিটি কাউন্সিল যখন কোনো বিশেষ আন্তর্জাতিক সংকট বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো সেই জরুরি প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদে নিয়ে আসে। যদিও এটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা, তবে এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়।
জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, খলিলুর রহমান অত্যন্ত সংকটময় ও সংবেদনশীল একটি সময়ে এই দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। কারণ তাঁর এই এক বছরের মেয়াদের মধ্যেই জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বা নতুন সেক্রেটারি-জেনারেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, মি. গুতেরেসের বর্তমান মেয়াদ এ বছরের ৩১শে ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে, যার ফলে নতুন প্রশাসনিক প্রধান নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণ পরিষদের সভাপতির অধীনেই সম্পন্ন হবে।
জাতিসংঘের বিদায়ী সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক এই পরিস্থিতিকে বহুপাক্ষিক কূটনীতির জন্য একটি ব্যতিক্রমী এবং চরম কঠিন সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, সভাপতির ভূমিকা এখন আর কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক বা পদ্ধতিগত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাধারণ পরিষদকে এখন ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’ বা ভবিষ্যতের চুক্তি বাস্তবায়ন, ‘ইউএন৮০’ উদ্যোগের মাধ্যমে সংস্থার আধুনিক সংস্কার প্রচেষ্টা এবং বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে ওঠার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সাথে বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে ধীরগতি এবং মানবিক সহায়তার তহবিল কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জগুলোর কথা উল্লেখ করে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজকের আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তে ১৯৪৫ সালের সেই পুরনো কাঠামোতেই আটকে রয়েছে, যা ভাঙা এখন সময়ের দাবি।
সভাপতি পদের প্রার্থিতার সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাঁর একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ভিশন স্টেটমেন্ট পেশ করেছিলেন, যার মূল শিরোনাম ছিল—“রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড ন্যাশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল” (আস্থা পুনর্গঠন, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: একটি জাতিসংঘ যা সবার জন্য কাজ করে)।
এই দূরদর্শী রূপরেখায় তিনি বিশ্বমঞ্চে কাজ করার জন্য প্রধানত ছয়টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন:
১. বিশ্বজুড়ে টেকসই শান্তি, নিরাপত্তা ও সকলের জন্য সমতাভিত্তিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
২. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) অগ্রগতি দ্রুততর করা।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বৈশ্বিক পরিবেশ সুরক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া।
৪. মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা এবং অভিবাসী ও শরণার্থীদের অধিকার রক্ষা করা।
৫. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সহ উদীয়মান প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল গভর্নেন্স নীতিমালার উন্নয়ন।
৬. জাতিসংঘের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করা।
বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গৌরবময়, সফল ও অগ্রগামী অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে খলিলুর রহমান প্রতিরোধমূলক কূটনীতি, শান্তি বিনির্মাণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য ও উজ্জ্বল নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন, যা আগামী এক বছর বিশ্বরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।