• বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১১:১৩ অপরাহ্ন
Headline
বার্ধক্য বুড়ো বয়সে নয়- শুরু হয় আজ: সাতটি সতর্কবার্তা রেলযাত্রায় আসছে বৈদ্যুতিক ট্রেন, মেগা সেতুসহ মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিডের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর শুভেন্দুর ‘ডিপোর্ট’ নীতি মানবাধিকারের লঙ্ঘন: এইচআরডব্লিউ চালের বাজারে কোনো ঊর্ধ্বগতি নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দি রয়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণের অর্থ পাচার হতে দেওয়া হবে না, সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশব্যাপী ক্রিয়েটিভ হাবের পরিকল্পনা সরকারের ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ ও সাইবার সুরক্ষার তাগিদ প্রভার এআই ট্রাফিক মামলার আড়ালে ভয়ঙ্কর সাইবার জালিয়াতি ১৫ কোটি রুপি ও প্রাইভেট জেটে এমপি ‘বিক্রি’ হচ্ছে ভারতে: সঞ্জয় রাউত

নতুন বাজেট: করছাড় ও রাজস্বের চ্যালেঞ্জ

Reporter Name / ১৩ Time View
Update : বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিশাল খরচ মেটাতে হবে, অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও বাড়ানো হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। এই বর্ধিত ব্যয়ের জোগান দিতে গিয়ে স্বভাবতই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে এবার পাহাড়সম রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের জন্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের চেয়ে এক লাখ কোটি টাকা বেশি। এত বিশাল অঙ্কের অর্থ সংস্থান করতে গিয়ে এনবিআর বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা সাজিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বড় ধরনের করছাড় ও নীতিগত সুবিধার ঘোষণাও থাকছে।

ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য সুখবর ও নতুন নিয়ম

সাধারণ আয়ের মানুষদের কিছুটা স্বস্তি দিতে আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা রয়েছে, যা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ (৩ লাখ ৭৫ হাজার) টাকায় উন্নীত করার ঘোষণা আসতে পারে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় হয়তো এ কথাও জানাবেন যে, পরবর্তী দুই বছর এই সীমা ৪ লাখ টাকায় স্থির থাকবে এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমার একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখাও দেওয়া হবে।

সাধারণ করদাতাদের পাশাপাশি সমাজের বিশেষ শ্রেণির নাগরিকদের জন্যও করমুক্ত আয়ের সীমায় বিশেষ ছাড় থাকছে। নারী, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিক, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ২০২৪’-এর আহত গেজেটভুক্ত যোদ্ধাদের করমুক্ত আয়ের সীমা আনুপাতিক হারে বাড়ানো হবে। এছাড়া কোনো প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত করছাড়ের সুবিধা বহাল থাকবে।

আয়কর রিটার্ন জমার প্রক্রিয়াকে আরও নমনীয় করার একটি উদ্যোগ এবারের বাজেটে থাকছে। বছরজুড়েই এখন থেকে রিটার্ন দেওয়া যাবে। তবে যাঁরা বছরের শুরুতেই নিয়ম মেনে রিটার্ন দেবেন, তাঁরা বিশেষ করছাড় পাবেন। উল্টোদিকে যাঁরা দেরিতে রিটার্ন জমা দেবেন, তাঁদের জন্য জরিমানার বিধান রাখা হচ্ছে—হয় ৫ হাজার টাকা, নতুবা প্রদেয় করের ১০ শতাংশ জরিমানা গুনতে হতে পারে।

করজালে আটকাতে টিআইএন ও অগ্রিম করের কড়াকড়ি

রাজস্ব আদায়ের জাল বিস্তৃত করতে বেশ কিছু নতুন কড়াকড়ি আরোপের কথা ভাবছে এনবিআর। দেশে বর্তমানে ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এই বিশাল আর্থিক লেনদেনকে করের আওতায় আনতে আগামী অর্থবছর থেকে যেকোনো ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) থাকা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতাভোগী এবং পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় দেওয়া হবে। শুধু ব্যাংক হিসাবই নয়, রাস্তায় চলা ১৫০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতার যেকোনো মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও টিআইএন প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা আসতে পারে।

পাশাপাশি, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বা ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায়ে প্রতি হাজারে ২ টাকা বা দশমিক ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর আদায়ের নতুন নিয়ম চালু হতে পারে, যা বছর শেষে করদাতার চূড়ান্ত প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও তরুণদের জন্য প্রণোদনা

বর্তমান সময়ের সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি ও ফ্রিল্যান্সিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই তরুণ পেশাজীবীদের উৎসাহিত করতে আগামী বাজেটে কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ফ্রিল্যান্সারদের আয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার যুগান্তকারী ঘোষণা আসতে পারে। শুধু তাই নয়, বিদেশ থেকে উপার্জিত তাঁদের এই অর্থকে ‘প্রবাসী আয়’ বা রেমিট্যান্স হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে, যার ফলে তাঁরা প্রবাসীদের মতোই সরকারি প্রণোদনা সুবিধা ভোগ করবেন। এছাড়া দেশের স্টার্টআপ, ইনোভেশন ভেঞ্চার ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিদ্যমান কর অব্যাহতি সুবিধাও আগের মতোই বহাল থাকবে।

ব্যবসাবান্ধব নীতি ও শিল্প সুরক্ষায় ছাড়

অর্থনীতি সচল রাখতে ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ‘ডি-রেগুলেশন’ বা নিয়মনীতি সহজ করার একটি বড় উদ্যোগ থাকছে বাজেটে। এর আওতায় ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসা নবায়নের মেয়াদ একবারে পাঁচ বছর করা হতে পারে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, তাঁদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হতে পারে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণের নাগালে রাখতে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, লবণ ও চিনির মতো ভোগ্যপণ্য সরবরাহে উৎসে করের হার ৫%, ২% বা ১% থেকে নামিয়ে মাত্র দশমিক ৫ (০.৫%) শতাংশে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

দেশীয় শিল্পের বিকাশে বেশ কিছু মেগা ছাড় থাকছে। মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম এবং সিসিটিভি ক্যামেরা দেশীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কর অব্যাহতি মিলবে। পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনে ২০৩০ এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত একই সুবিধা দেওয়া হবে। দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদনে বিনিয়োগ করলে প্রথম ১০ বছরের জন্য কর অব্যাহতির প্রস্তাবও থাকছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জনপ্রিয় করতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও সরবরাহে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়ের ওপর সম্পূর্ণ আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও রপ্তানি খাতের প্রণোদনার অর্থের ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া বেসরকারি ঋণের সুদের বিপরীতে উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে।

বাজারে যেসব পণ্যের দাম কমবে ও বাড়বে

শুল্ক কাঠামোর এই ব্যাপক রদবদলের ফলে বাজারে অনেক পণ্যের দামেই প্রভাব পড়বে।

যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে: * এসি ও ফ্রিজের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করার কারণে এগুলোর দাম কমবে।

  • দেশে তৈরি মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের কাঁচামালের অগ্রিম কর ৫% থেকে কমিয়ে ১% করায় দেশি মোবাইলের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

  • ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে পিওএস (POS) মেশিনের আমদানি শুল্ক অর্ধেক (১০% থেকে ৫%) করা হচ্ছে।

  • বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি আমদানিতে বর্তমানে ৯৩ শতাংশ করভার রয়েছে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভিতে তা ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ৫০ হাজার ডলার দামের ইভিতে ৮০ শতাংশ করা হতে পারে। পাশাপাশি ১৮০০ সিসি পর্যন্ত ব্র্যান্ড নিউ হাইব্রিড গাড়ির নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার হতে পারে।

  • প্রসাধন সামগ্রী, যেমন—বিদেশি লিপস্টিকের প্রতি কেজির শুল্কায়ন মূল্য ৪০ ডলার থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার এবং লোশন ও ফেসওয়াশের শুল্কায়ন মূল্য ১০ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলার করা হচ্ছে।

  • মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত মরচুয়ারি যন্ত্রপাতির শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে এক লাফে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে: * স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সিগারেট ও বিড়িসহ সকল তামাকপণ্যের মূল্যস্তর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।

  • দেশীয় কৃষকদের সুরক্ষায় আমদানি করা কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে।

  • নির্মাণকাজের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান রডের ওপর ভ্যাট টনপ্রতি ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা করা হতে পারে।

  • বিলাসবহুল ভোজনের ক্ষেত্রে পাঙাশ মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ নতুন সম্পূরক শুল্ক বসানোর কারণে রেস্তোরাঁয় এই খাবারের দাম বাড়তে পারে।

এনবিআরের ঘাটতি ও বিশেষজ্ঞদের মত

এনবিআরকে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না, যার ফলে সরকারকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৬ থেকে ৭ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। এনবিআরের নিজস্ব হিসাবমতেই, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে নিম্নস্তরের সাধারণ করদাতাদের সুরক্ষা দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দোহাই দিয়ে ছোটখাটো খাতে উৎসে কর চাপিয়ে দেওয়ার যে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা এনবিআর কর্মকর্তাদের হাতে রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কর দেওয়ার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও সহজ করা গেলে মানুষ নিজ থেকেই কর দিতে উৎসাহিত হবেন, যা পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category