তিন উদীয়মান প্রতিভাবান বাংলাদেশি শিল্পী—মোঃ ফারিয়াজ ইমরান, নীহারিকা অহনা বারসাত এবং সুরভী আক্তারের স্বতন্ত্র শিল্পকর্মের এক অনন্য মেলবন্ধন নিয়ে আজ শুক্রবার (১২ জুন) থেকে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা-য় শুরু হয়েছে সম্মিলিত চিত্রপ্রদর্শনী ‘ত্রিবন্ধন’। আজ সন্ধ্যা ৬টায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা-র ‘লা গ্যালারি’-তে এই প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। আগামী ১৭ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সকল শিল্পপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে।
‘ত্রিবন্ধন’ মূলত তিনটি ভিন্ন ভিন্ন নিজস্ব শিল্পভাষাকে একত্রিত করে মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, আত্মপরিচয়, প্রকৃতি, মনস্তাত্ত্বিক মানবিক সংযোগ এবং প্রাত্যহিক নগরজীবনের নানা জটিল অনুষঙ্গকে ক্যানভাসে অন্বেষণ করেছে। যদিও প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া তিন শিল্পীর কাজের দৃষ্টিভঙ্গি, মাধ্যম ও সৃজনপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা, তবুও তাদের কাজগুলো একই ছাদের নিচে এসে গভীর পর্যবেক্ষণ, পারস্পরিক সহমর্মিতা, মানসিক স্থিতিস্থাপকতা এবং আত্মরূপান্তরের এক চমৎকার দৃশ্যমান সংলাপ গড়ে তুলেছে।
প্রদর্শনীতে শিল্পী নীহারিকা অহনা বারসাত দর্শকদের এমন এক কাব্যিক ও স্নিগ্ধ জগতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গভীর অভিজ্ঞতাগুলো একসূত্রে গাঁথা। বর্তমানে ভারতের বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ভিজ্যুয়াল আর্টসের পেইন্টিং বিভাগে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস (মুরাল বিশেষায়নসহ) অধ্যয়নরত এই শিল্পীর ক্যানভাসে পাখি, বৃক্ষ ও নারীমূর্তির পুনরাবৃত্ত মোটিফ বা প্রতীকগুলো বারবার ঘুরে এসেছে। অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের বহুস্তরবিশিষ্ট কম্পোজিশনের মাধ্যমে তিনি মূলত আরোগ্য, বিকাশ ও আত্ম-অন্বেষণের গল্প বলেছেন, যেখানে প্রকৃতি কেবল কোনো জড় পটভূমি নয়, বরং মানুষের আত্মিক রূপান্তরের এক সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।
অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ থেকে ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিংয়ে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস সম্পন্ন করা শিল্পী সুরভী আক্তারের শিল্পচর্চার মূল কেন্দ্রে রয়েছে মানবমুখের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অভিব্যক্তিপূর্ণ উপাদান—চোখ। ব্রাউন পেপারের উপর লাল বলপয়েন্ট কলম এবং রঙিন পেন্সিলের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের প্রতিকৃতিতে আবেগ, উপলব্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার নানা স্তর ফুটিয়ে তুলেছেন। ক্ষণস্থায়ী ও চটজলদি চিত্রে পরিপূর্ণ এই ডিজিটাল যুগে সুরভীর এই সূক্ষ্ম প্রতিকৃতিগুলো দর্শকদের কিছুটা ধীর হতে এবং প্রতিটি দৃষ্টির আড়ালে থাকা চিরন্তন মানবিকতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
অপর শিল্পী মোঃ ফারিয়াজ ইমরান তাঁর শিল্পচর্চার মূল প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন ঢাকার ব্যস্ত রাজপথ এবং নগরজীবনের সবচেয়ে উপেক্ষিত খেটে খাওয়া মানুষ, বিশেষত রিকশাচালকদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে। নীহারিকার মতোই ভারতের বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা নিয়ে অধ্যায়নরত ফারিয়াজ তাঁর জলরঙের সুনিপুণ স্তরবিন্যাস ও মানবকেন্দ্রিক কম্পোজিশনের মাধ্যমে এসব শ্রমজীবী মানুষের নীরব মর্যাদা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও গভীর আত্মমগ্নতার মুহূর্তগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন। যারা শহরের মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক আলোচনায় প্রায়শই অদৃশ্য থেকে যান, ফারিয়াজের চিত্রকর্মের মাধ্যমে সেই মানুষগুলোর শ্রম, সামাজিক পরিচয় এবং ন্যায্য স্বীকৃতির এক নতুন ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে।
ব্যক্তি, সমাজ এবং প্রকৃতির চিরন্তন সম্পর্কের নানা জটিল স্তরকে ফ্রেমবন্দি করে ‘ত্রিবন্ধন’ প্রদর্শনীটি শিল্পের মাধ্যমে আত্মিক সংযোগ নির্মাণের এক অপার সম্ভাবনাকে উদযাপন করছে, যা উদ্বোধনের প্রথম দিনেই উপস্থিত দর্শকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।