ডিএমপির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ক্যামেরার মাধ্যমে আধুনিক ট্রাফিক মামলা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর, সেটিকে পুঁজি করে দেশে এক নতুন ধরনের সাইবার প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে ডিজিটাল অপরাধীরা। ‘আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে, জরিমানা দিন’—এমন ভুয়া এসএমএস এবং ফিশিং লিংক পাঠিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ডের ওটিপি (OTP) হাতিয়ে লাখ লাখ টাকা লুটে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
এমনই এক অভিনব প্রতারক চক্রের মূল তিন সদস্যকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারকৃতরা হলো—রাব্বি শেখ, রিয়াদ হোসেন ও সাজ্জাদ হোসেন। আজ বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য জানান সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সানা শামিনুর রহমান।
সিআইডি জানায়, প্রতারক চক্রটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর মূল ওয়েবসাইটের হুবহু নকল বা ক্লোন করে একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করেছিল। অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততা বা দৈনন্দিন কাজের মাঝে হুট করেই চালক বা গাড়ি মালিকদের মোবাইলে একটি খুদে বার্তা (SMS) পাঠানো হতো। সেখানে লেখা থাকত, ‘আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। দ্রুত জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বার্তাটির সাথে একটি ফিশিং লিংক দেওয়া থাকত। সম্ভাব্য আইনি ঝামেলা ও মামলার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগীরা যখনই ওই লিংকে প্রবেশ করতেন, তারা চলে যেতেন বিআরটিএ’র আদলে তৈরি করা ভুয়া পেমেন্ট পোর্টালে। সেখানে ভুক্তভোগীদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য আরেকটি লোভনীয় অফার দেওয়া হতো—‘আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত জরিমানা পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে!’ এই প্রলোভনে পা দিয়ে মানুষ যখনই জরিমানা মেটাতে যেতেন, তখন কৌশলে তাদের ব্যাংক কার্ডের নম্বর, গোপন পিন, নেট ব্যাংকিংয়ের পাসওয়ার্ড এবং মোবাইলের ওটিপি সংগ্রহ করে নিত প্রতারকেরা। ওটিপি পাওয়ার সাথে সাথে ভুক্তভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ খালি করে নিজেদের অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে নিত এই চক্র। সিআইডি নিশ্চিত করেছে, গ্রেফতার হওয়া এই তিন আসামি এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে মোট ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি সানা শামিনুর রহমান একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী তাঁর মোবাইলে বিআরটিএ’র নামে একটি ট্রাফিক জরিমানার এসএমএস পান। লিংকে প্রবেশ করে তিনি দেখেন, তাঁর অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দিলে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিলেই হবে।
বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্য মনে করে তিনি জরিমানা দিতে যান এবং পোর্টালে তাঁর স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন আইডি ও ওটিপি প্রদান করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই তাঁর মোবাইলে মেসেজ আসে যে, কোনো জরিমানা পরিশোধ হয়নি, উল্টো তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে এক দফায় ৩ লাখ টাকা অন্য একটি অজানা অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর হয়ে গেছে। পরবর্তীতে একই ধরনের আরও দুটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্টের একটি বিশেষ দল প্রযুক্তিগত তদন্ত শুরু করে। অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দেশের খুলনা (বটিয়াঘাটা), ফেনী (সদর) এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে এই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ডিআইজি সানা শামিনুর রহমান সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ডিএমপির এআই (AI) ক্যামেরার মাধ্যমে বর্তমানে যেসব স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক মামলা করা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার মোবাইল এসএমএস বা ডিজিটাল লিংক পাঠানোর কার্যক্রম শুরুই হয়নি। ডিএমপির পক্ষ থেকে বর্তমানে সম্পূর্ণ ম্যানুয়ালি কাগজের নোটিশ সরাসরি গাড়ির মালিকের ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, নোটিশ পাওয়ার পর সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী শুধুমাত্র ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB) এবং কমিউনিটি ব্যাংকের কাউন্টার বা অনুমোদিত অ্যাপের মাধ্যমেই জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যাচ্ছে। এর বাইরে কোনো ওয়েবসাইট, বিকাশ, রকেট বা অন্য কোনো পেমেন্ট লিংকের মাধ্যমে বিআরটিএ বা ট্রাফিক পুলিশ টাকা নেয় না। ফলে ট্রাফিক জরিমানার নামে কেউ মোবাইলে এসএমএস, ফোনকল বা অন্য কোনো মাধ্যমে ওটিপি বা কার্ডের তথ্য চাইলে সেটি নিশ্চিতভাবেই প্রতারণা। সিআইডি দেশবাসীকে এই ধরনের ফিশিং লিংক থেকে দূরে থাকার এবং যেকোনো লেনদেনের আগে লিন্কের ইউআরএল (URL) ভালোভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: মানবজমিন