যারা ভাড়া বাড়িতে থাকেন তাঁরা ঠিক বাড়ি পছন্দ করতে না পারলে মোটামুটি দুনিয়াতেই দোযখবাস হয়ে যায়। এর চেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা খুব আছে। শুধু তাই নয়, বাড়ি নির্বাচনে ভুল হলে সন্তানদের উপরও খারাপ প্রভাব পড়ে। তাদের উপর আশেপাশের খারাপ পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা—এসব এত চাপ ফেলে যে মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তেত্রিশ বছর ধরে ভাড়া বাড়িতে থাকায় ব্যাপারটির গুরুত্ব আমি বুঝি। একই সঙ্গে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় কী কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত, সে ব্যাপারে আমি মোটামুটি বিশেষজ্ঞ হয়ে গিয়েছি বলতে পারেন। এ অভিজ্ঞতা থেকে আমি কিছু পরামর্শ দিতে চাই।
১) শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এলাকায় বাসা নিন। যেখানে পরিবেশ ভালো নেই সেখানে বাসা নিলে ছেলেমেয়েদের বিকাশ ভালো হয় না। একটি কথা আছে- আমরা যে পরিবেশে বাস করি, আমরা তা হই।
২) বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে রিকশা বা হেঁটে এলাকাটি ঘুরে দেখুন। তাহলে পরিবেশ ও নিরাপত্তার ব্যাপারে ধারণা পাবেন। এক্ষেত্রে আমি দুবার এলাকাটি দেখার পক্ষে। দিনে একবার, রাতে একবার। কারণ পরে হয়তো দেখা যাবে দিনে পরিবেশ ভালো হলেও রাতে তা নয়। এছাড়া এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ইতিহাসও জানার চেষ্টা করবেন।
৩) বাড়িওয়ালা সম্পর্কে ধারণা নিন। উল্টপাল্টা বাড়িওয়ালা বড় অভিশাপ। আমি একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলাম। তখন আব্বা ছাদে হাঁটতেন। বাড়িটিতে ওঠার পর তিনি হাঁটার জন্য ছাদে যেতে চাইলে দারোয়ান কঠোর কণ্ঠে বলে দিলেন, ছাদে বাড়ির মালিক ছাড়া কেউ যেতে পারবেন না। আমি পরদিন বাসাটি ছেড়ে দিই। যে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে সম্মান করে না, সেখানে থাকা মানে নিজেকে ছোট করে ফেলা।
৪) বাড়ির ভেতরটা ভালোভাবে দেখুন। স্যাঁতসেঁতে বাড়ি শরীরের জন্য ক্ষতিকর। পানি, গ্যাস—এসব সুবিধা ঠিকমতো আছে কিনা তা দেখুন। একেবারে মেইন রোডের পাশে বাসা না নেওয়াই ভালো। গাড়ির আওয়াজে জান বেরিয়ে যাবে।
৫) যে বিল্ডিংয়ে বাসা ভাড়া নেবেন সেখানকার অন্য বাসিন্দা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। প্রতিবেশী ঠিক না হলেও জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
৬) আপনার জীবনযাত্রার চাইতে উন্নত জীবনযাত্রা যাদের, তাদের প্রতিবেশী না হওয়াই ভালো। এতে হীনমন্যতা সৃষ্টি হয়। অন্যদের দেখে সন্তানদের প্রত্যাশা বাড়ে। অনেক সময় তাল মেলানোর জন্য সর্বনাশা প্রতিযোগিতায় নামতে হয়।
৭) বাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। এ ব্যাপারে একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক তাঁর বইয়ে চমৎকার একটি কথা বলেছেন। তা হলো- বাড়ি ভাড়া করা বা কেনার আগে ভাবুন যদি আপনি নিজে গোপনে সে বাড়িতে ঢুকতেন, তাহলে কোন দুর্বলতা ব্যবহার করে সেখানে ঢুকতেন। সেরকম কিছু পাওয়া গেলে বাড়িটিতে উঠবেন না।
৮) বাড়িতে উঠতি বয়সের মেয়ে থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েক দিন রাস্তাঘাটে হাঁটুন। দেখুন পাড়ার কিশোর-তরুণদের আচরণ কেমন। যদি দেখেন মোড়ে মোড়ে তারা আড্ডা দিচ্ছে, সিগারেট খাচ্ছে, তাহলে এড়িয়ে যান। বাড়িটি মেয়ের জন্য নিরাপদ হবে না। বিশেষ করে আসা-যাওয়ার পথে সে ইভ টিজিংয়ের শিকার হবে।
৯) সম্ভব হলে আশেপাশে পরিচিত বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন আছে এমন জায়গায় বাসা নিন। তাহলে বিপদে-আপদে তাদের সাহায্য নিতে পারবেন। পরিচিত কারো মাধ্যমে বাসা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করুন। তাহলে বাড়িটির ব্যাপারে সব সহজে জানতে পারবেন।
১০) বাসা দেখার সময় যদি কোনো কারণ ছাড়া অস্বস্তি লাগে তবে তা না নেওয়াই ভালো। মনের কু-ডাক অনেক সময় সত্য হয়। সিক্সথ সেন্সের কথা শুনুন।
আমি জানি, যা বলেছি সবগুলো বিবেচনা করে বাসা ভাড়া করা কঠিন। তারপরও যতদূর পারা যায় বিবেচনা করা উচিত। বাস করার জায়গাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতেই আমরা বিভিন্ন অশান্তিতে থাকি- তার উপর বাসায় এসে শান্তি না পেলে জীবন নরকতুল্য হয়ে ওঠে।
ভাড়া বাসা নিয়ে আহসান হাবিবের অসাধারণ একটি কবিতার অংশ দিয়ে শেষ করি…
’আপনারা যাচ্ছেন বুঝি?
চলে যাচ্ছি, মালপত্র উঠে গেছে সব।
বছর দু’য়েক হলো, তাই নয়?
……
আপনার ডাকনাম শানু, ভালো নাম?
শাহানা, আপনার?
মাবু। মাহবুব হোসেন।
…….
যাই। হলুদ শার্টের মাঝখানে বোতাম নেই, লাগিয়ে নেবেন, যাই।
যান, আপনার মা আসছেন।
মা ডাকছেন, যাই।’