অনেকেরই ধারণা বর্তমান বিশ্ব হয়তো খনিজ তেল, গ্যাস কিংবা বিপুল অর্থের শক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু আধুনিক ভূরাজনীতি ও প্রযুক্তির গভীর সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বর্তমান দুনিয়া আসলে টিকে আছে মাত্র কয়েক ন্যানোমিটারের অতি ক্ষুদ্র সিলিকন চিপের ওপর, যা মূলত আমাদের চেনা বালি বা মাটিরই একটি পরিশোধিত রূপ। মানবজাতি হাজার বছর ধরে সোনা, সীমানা কিংবা তেলের দখল নিয়ে বড় বড় যুদ্ধ করলেও, সমকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং ঠান্ডা লড়াইটি লড়া হচ্ছে ল্যাবরেটরিতে রিফাইন করা সামান্য একমুঠো বালির নিয়ন্ত্রণ ঘিরে। এই মাইক্রোচিপ বা সেমিকন্ডাক্টরের বাজারকে কেন্দ্র করে বিশ্বের দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এখন এমন এক নিঃশব্দ যুদ্ধ চলছে, যার সামান্যতম উনিশ-বিশ পুরো মানব সভ্যতার জন্য এক মহা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আজকের দিনে আমরা যেসব অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাট জিপিটির ডাটা সেন্টার নিয়ে কথা বলি কিংবা যেসব আধুনিক আইফোন পকেটে নিয়ে ঘুরি, সেগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো এই চিপ। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অ্যাপল, এনভিডিয়া কিংবা এএমডির মতো বৈশ্বিক টেক জায়ান্টদের কারোরই এই চিপ বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করার নিজস্ব কোনো কারখানা নেই। তারা কেবল খাতা-কলমে চিপের অতি জটিল নকশা বা ডিজাইন তৈরি করে। সেই সূক্ষ্ম ডিজাইনকে বাস্তবে রূপ দিয়ে চিপ উৎপাদনের একচ্ছত্র ও একক ক্ষমতা এই পুরো গ্রহে যার হাতে রয়েছে, সে হলো তাইওয়ানের ‘টিএসএমসি’ (তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি)। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে মানচিত্রে চীনের পেটের ভেতর অবস্থিত ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো দ্বীপ তাইওয়ান, আর সেখানেই অবস্থান করছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান এই চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানি।
২০২৬ সালের সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সেমিকন্ডাক্টরের ৭০ শতাংশের বেশি এককভাবে উৎপাদন করে টিএসএমসি। আর সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মিলিটারি গ্রেড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ৩ থেকে ৫ ন্যানোমিটারের অ্যাডভান্সড সুপারফাস্ট চিপের প্রায় ৯২ শতাংশই তৈরি হয় তাইওয়ানের এই একটি মাত্র কোম্পানির প্ল্যান্টে। অ্যাপলের বায়োনিক প্রসেসর, এনভিডিয়ার গ্রাফিক্স চিপ কিংবা আমেরিকার টমাহক মিসাইলের গাইডেন্স সিস্টেম—সবকিছুই এই একটি ল্যাবের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। মার্কিন সামরিক থিংক ট্যাংক পেন্টাগনের হিসাব মতে, যদি কোনো কারণে তাইওয়ানের এই চিপ সরবরাহ চেইন মাত্র এক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বের আইটি এবং ইলেকট্রনিক্স খাতে সরাসরি ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বড় বিশ্বযুদ্ধেও কখনো এক মাসে হয়নি। ব্লুমবার্গের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিপর্যয় ঘটলে রাতারাতি পুরো পৃথিবীর মোট সম্পদের ১০ ভাগের এক ভাগ হাওয়া হয়ে যাবে এবং অ্যামাজন, টেসলা, মেটা বা মাইক্রোসফটের মতো ট্রিলিয়ন ডলারের টেক সাম্রাজ্যগুলো ধসে পড়বে।
ঠিক এই কারণেই এই সেমিকন্ডাক্টর চিপকে তাইওয়ানের অদৃশ্য ‘সিলিকন শিল্ড’ বা আক্ষরিক অর্থেই এক পারমাণবিক মিসাইলের চেয়েও শক্তিশালী রক্ষা কবচ বলা হয়। চীনের অনবরত সামরিক হুমকি সত্ত্বেও এই সিলিকন শিল্ডের কারণেই বেইজিং তাইওয়ানে সহজে সামরিক আগ্রাসন চালাতে পারছে না, কারণ তাইওয়ানকে রক্ষা করতে আমেরিকা কৌশলগতভাবে বাধ্য। তবে চীনও এই চিপের বাজারে নিজেদের স্বনির্ভরতা আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বেইজিং প্রতি বছর খনিজ তেল আমদানি করতে যত টাকা খরচ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে এই মাইক্রোচিপ আমদানির পেছনে, যার বার্ষিক বাজেট ইতিমধ্যে ৪২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, আমেরিকা বা চীনের মতো পরাশক্তিরা বিপুল অর্থ থাকা সত্ত্বেও কেন নিজেদের দেশে এই চিপ বানিয়ে নিচ্ছে না? আসলে চিপ তৈরি করা শুধু টাকার খেলা নয়, এটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ারিং। চিপের সিলিকন পাতের ওপর মানুষের চুলের চেয়েও হাজার গুণ পাতলা নকশা খোদাই করতে নেদারল্যান্ডসের ‘এএসএমএল’ কোম্পানির তৈরি বিশেষ ‘ইইউভি’ লিথোগ্রাফি মেশিন লাগে, যার একেকটির দাম ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এই মেশিনের যন্ত্রাংশ আসে পৃথিবীর ৪০টি আলাদা দেশ থেকে এবং এটি তৈরি করা এত জটিল যে বছরে মাত্র অল্প কয়েকটি মেশিন বানানো সম্ভব হয়, যার সিংহভাগই তাইওয়ানের টিএসএমসি আগে থেকে বুক করে রাখে। তাছাড়া চিপ তৈরির জন্য হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের চেয়েও লাখ গুণ বেশি ধূলিকণামুক্ত ‘ক্লিন রুম’ এবং গত ৩০ বছরের কঠোর সাধনায় তৈরি তাইওয়ানের অত্যন্ত দক্ষ ও বিশেষায়িত জনবলের বিকল্প অন্য কোনো দেশ রাতারাতি বিলিয়ন ডলার ঢাললেও তৈরি করতে পারবে না।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই প্রযুক্তিগত ব্যবধান ঘোচাতে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট ঘোষণা করেছেন এবং হুয়াওয়ে ইতিমধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে ৭ ন্যানোমিটারের প্রসেসর তৈরি করে পেন্টাগনকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। তবে সামরিক এআই এবং স্যাটেলাইটের জন্য প্রয়োজনীয় ৩ ন্যানোমিটারের চিপ তৈরিতে চীন এখনো তাইওয়ানের চেয়ে অন্তত ১০ বছর পিছিয়ে আছে। এই ১০ বছরের গ্যাপ পূরণ করার একমাত্র শর্টকাট রাস্তা হলো তাইওয়ানকে সামরিকভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। বেইজিং ভালো করেই জানে, তাইওয়ান দখল করতে পারলে এক রাতেই পুরো পৃথিবীর প্রযুক্তির চাবি তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।
কিন্তু আমেরিকাও এই চাবিকাঠি সহজে চীনের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। সিআইএ এবং পেন্টাগন এ নিয়ে ইতিমধ্যে একটি অত্যন্ত গোপন ও ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে, যার অফিশিয়াল কোডনেম ‘স্কোরজড আর্থ পলিসি’ বা পোড়ামাটি নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, চীনের প্যারাট্রুপাররা যখনই টিএসএমসি ফ্যাক্টরির গেটে পৌঁছাবে, তার আগেই পেন্টাগন থেকে পাঠানো এনক্রিপ্টেড সিগনালের মাধ্যমে টিএসএমসির সমস্ত ল্যাব, লিথোগ্রাফি মেশিন এবং বিলিয়ন বিলিয়ন চিপের ডাটাবেস রিমোট সেলফ-ডেস্ট্রাকশন মেকানিজমের সাহায্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে। একই সাথে তাইওয়ানের মূল বিজ্ঞানী ও চিপ ডিজাইনারদের বিশেষ সামরিক বিমানে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হবে।
তবে ২০২৬ সালের জুন মাসে তাইওয়ানের নতুন প্রধান নির্বাহী সিসিউই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে এক বড় উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাইওয়ানে বর্তমানে ক্রমাগত বিশুদ্ধ পানি এবং বিশেষ খনিজের তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। এর অর্থ হলো, কোনো যুদ্ধ না হলেও প্রাকৃতিকভাবেই তাইওয়ানের চিপ বাজারে এক বিশাল ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। যদি কোনো কারণে চিপের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে যায়, তবে আমেরিকার ফাইটার জেট থেকে শুরু করে পেন্টাগনের নিউক্লিয়ার সাবমেরিন—সবকিছুর লাইফলাইন বেইজিংয়ের ইশারায় চলবে।
চোখ বন্ধ করে একবার ভাবলে শিউরে উঠতে হয় যে, আমরা মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি কিংবা সুপার কম্পিউটার বানাচ্ছি, অথচ প্রশান্ত মহাসাগরের ওই ছোট্ট দ্বীপের সিলিকনের স্পন্দন যদি মাত্র এক সপ্তাহের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে মুহূর্তেই অচল হয়ে যাবে আমাদের হাতের স্মার্টফোনটি, অন্ধকারে তলিয়ে যাবে বিশ্বের কোটি কোটি ডাটা সেন্টার এবং দিক হারাবে আকাশের ফাইটার জেট। কোনো পারমাণবিক বোমা বা বারুদ বিস্ফোরণ ছাড়াই, স্রেফ সিলিকনের এক নীরব দুর্ভিক্ষে আধুনিক ডিজিটাল মানব সভ্যতা রাতারাতি আছড়ে পড়বে আদিম পাথরের যুগে। আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছি ভাবলেও নির্মম সত্য হলো, বালি থেকে তৈরি ওই চিপের ছোট্ট টুকরোটিই এখন নির্ধারণ করছে এই চেনা পৃথিবী কাল সকালে টিকে থাকবে নাকি স্রেফ একটা সিস্টেম এরর হয়ে ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস