• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:১২ পূর্বাহ্ন
Headline
পর্তুগাল–স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম দ্বৈরথ: কার জয়রথ চলবে কোয়ার্টার ফাইনালে মেয়ের বিয়ে: আমিন চাচার আট পরামর্শ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি মুলতবি প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ গুলশান লেকের পরিবেশ রক্ষা ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ : ডা. জুবাইদা রহমান অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্ততি ইসির ফিলিস্তিনকে সমর্থন করায় খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: হুথি মুখপাত্র গাজার শাসনভার ছাড়ার ঘোষণা হামাসের সংসদহীন ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকার লড়াই

হালান্ড-জুজুতে চূর্ণ হেক্সা স্বপ্ন, মাঠের হতাশায় ব্রাজিলের সান্ত্বনা ৩১৬ কোটি

ক্রীড়া প্রতিবেদক / ১ Time View
Update : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

ইস্ট রাদারফোর্ডের নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে উপচে পড়া ভিড়, গ্যালারিতে হলুদ-নীল উৎসবের আমেজ। প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী, সামনে শেষ আটে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ। একই সাথে ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপ নকআউটে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে দীর্ঘদিনের অস্বস্তিকর গেরো কাটার স্বপ্ন। কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ, সব রণকৌশল মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দিলেন নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। তাঁর বিধ্বংসী জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। মাঠের এই চরম হতাশা ও হেক্সা স্বপ্নের অকাল মৃত্যুতে কোটি কোটি সেলেসাও ভক্তের মন ভাঙলেও, আর্থিক দিক থেকে খুব একটা খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে না ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনকে (সিবিএফ)। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়েও ফিফার নির্ধারিত পুরস্কার কাঠামোর কল্যাণে সিবিএফের কোষাগারে যোগ হচ্ছে এক বিপুল অঙ্কের অর্থ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সোয়া তিনশ কোটি টাকার সমান।

এবারের বিশ্বকাপে রেকর্ড ৭২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৯ হাজার ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা) পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করছে ফিফা। এটি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। ফিফার নির্ধারিত এই বিশাল পুরস্কার কাঠামো অনুযায়ী, মাঠের জয়-পরাজয় নির্বিশেষে গ্রুপ পর্বে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলই নিশ্চিতভাবে ১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার অর্থ পায়, যার মধ্যে ১৫ লাখ ডলার ধরা হয়েছে প্রস্তুতি ব্যয় বাবদ। এর সাথে শেষ ষোলো বা রাউন্ড অব সিক্সটিনে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য দলগুলোর জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের পুরস্কার বরাদ্দ রয়েছে। সব মিলিয়ে, টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর ব্রাজিল পাচ্ছে ২ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ১২৪ টাকা ধরে) যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিনশ কোটি ষোলো কোটি বিশ লাখ টাকা। এই বিপুল অঙ্কের সান্ত্বনা পুরস্কার বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের হতাশাজনক পারফরম্যান্স সত্ত্বেও সিবিএফের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং ভবিষ্যতে ব্রাজিল ফুটবল ও জাতীয় দলের উন্নয়ন ও প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

টাকার অংকে পকেট ভারি হলেও, নরওয়ের কাছে এই ঐতিহাসিক পরাজয় ব্রাজিলের জন্য এক বড় লজ্জার ঘটনা হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে। বিগত ৩৬ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপে এটিই ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্সের রেকর্ড। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ষোলোতে হেরে বিদায় নিয়েছিল সেলেসাওরা। এবার নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোল এবং প্রথমার্ধে মাঝমাঠের স্তম্ভ ব্রুনো গিমারেসের একটি পেনাল্টি মিস পরাজয় নিশ্চিত করে ব্রাজিলের। ম্যাচের দ্বিতীয় মেয়াদে হালান্ডের বিধ্বংসী আক্রমণের সামনে ভেঙে পড়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। ম্যাচের শেষ মুহূর্তের অতিরিক্ত সময়ে (স্টপেজ টাইম) নেইমার সান্ত্বনাসূচক একটি গোল করলেও, তা কেবল হারের ব্যবধানই কমিয়েছে, দলের হেক্সা স্বপ্নকে রক্ষা করতে পারেনি।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই অপ্রত্যাশিত ও ঐতিহাসিক পরাজয়ের পেছনে অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তির কিছু সুনির্দিষ্ট ভুল কৌশল ও সিদ্ধান্তকে কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। সমালোচনার তীরে প্রথম যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো, ম্যাচের আগে ব্রুনো গিমারেসকে দলের অফিসিয়াল পেনাল্টি টেকার হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত কোচিং স্টাফদের। দ্বিতীয়ত, ইনজুরিতে পড়া লুকাস পাকেতার বিকল্প বেছে নিতে গিয়ে আনচেলত্তি মাঝমাঠে গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে নামানোর যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, তা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এই কৌশলের কারণেই হাইতি, স্কটল্যান্ড ও জাপানের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বে সফল হওয়া ব্রাজিলের চেনা ছন্দ ও ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। পাকেতার পজিশনে ফ্ল্যামেঙ্গোর মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও, মূলত লেফট উইঙ্গার মার্তিনেল্লি মাঝমাঠের কঠিন পরীক্ষায় তার স্বাভাবিক খেলা উপহার দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। মার্তিনেল্লি পাকেতার ভূমিকা পালনের আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, মাঠের খেলায় ব্রাজিলকে মনে হচ্ছিল তারা সেই পুরনো ও সেকেলে ৪-২-৪ ফর্মেশনে খেলছে, যার কারণে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নরওয়ের হাতে চলে যায়। ব্রাজিল বল পজিশন ধরে রাখতে পারছিল না এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। আক্রমণভাগের কৌশল তখন মূলত দুই উইং দিয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রায়ানের ব্যক্তিগত গতিভিত্তিক (ভার্টিকাল) খেলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই কৌশলে কিছু বিচ্ছিন্ন ভালো সুযোগ তৈরি হলেও, নরওয়ের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ ভেদ করে তা গোলমুখে কাজে লাগানো যায়নি।

ম্যাচের ধারাবিবরণী অনুযায়ী, মাত্র ৯ মিনিটে আক্রমণভাগে রায়ান নরওয়ের ডিফেন্স থেকে বল কেড়ে নিয়ে মার্তিনেল্লিকে পাস দেন। মার্তিনেল্লি বক্সে থাকা কুনিয়ার উদ্দেশে বল বাড়ালে নরওয়ের ডিফেন্ডার আয়ার তাকে ফাউল করেন। যুক্তরাষ্ট্রের রেফারি ইসমাইল এলফাত প্রথমে ফাউলটি এড়িয়ে গেলেও, পরবর্তীতে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির সহায়তায় পেনাল্টির বাঁশি বাজান। কিন্তু কোচিং স্টাফদের গভীর ভরসার পাত্র ব্রুনো গিমারেস অত্যন্ত দুর্বল ও সহজ একটি শট নেন, যা নরওয়ের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক অরজান নালান্ড অনায়াসেই রুখে দেন। পুরো ম্যাচজুড়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটির এই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন গোলরক্ষক নালান্ড। পেনাল্টি ঠেকানোর পাশাপাশি তিনি ভিনিসিয়ুস, মার্তিনেল্লি ও রায়ানের অন্তত তিনটি নিশ্চিত গোল নিশ্চিত হাত থেকে নস্যাৎ করেন। এমনকি ম্যাচের ৮৫ মিনিটে (দ্বিতীয় মেয়াদে ৪০ মিনিট) নরওয়ের এক ডিফেন্ডারের একটি আত্মঘাতী শটও তার হাতে লেগে পোস্টে গিয়ে প্রতিহত হয়।

নরওয়ের গোলরক্ষক যখন তাদের জার্সিতে উজ্জ্বল, তখন ব্রাজিলের পোস্টার বয় ও প্রধান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ছিলেন পুরো মাঠেই একেবারেই নিষ্প্রভ ও ছন্দহীন। দলের সবচেয়ে বড় তারকা হওয়া সত্ত্বেও এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পেনাল্টি নেওয়ার জন্য তাকে কেন বিবেচনা করা হয়নি, তা নিয়ে ইতিমধ্যে সিবিএফের ভেতরে-বাইরে বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মাঠের বাঁ প্রান্ত দিয়ে ভিনি আপ্রাণ চেষ্টা করলেও उसे বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল। আক্রমণভাগে সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব এবং গ্রুপ পর্বের মতো দলের আক্রমণভাগের হাল ধরার ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। তাঁর এই নিষ্প্রভ ফর্ম এবং কোচের ভুল কৌশলের খেসারত দিতে হলো পুরো দল ও কোটি কোটি ভক্তকে। অন্যদিকে, নরওয়ে এই ঐতিহাসিক জয়ে আনন্দিত। হালান্ডের জোড়া গোল তাদের শেষ আটে যাওয়ার স্বপ্নকে আরও উজ্জ্বল করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category