গত কয়েক দিন ধরে চলা অবিরাম ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের এক বিশাল অংশে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যার পানিতে ভাসছে। পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকার নদীগুলোর পানি হু-হু করে বৃদ্ধি পেয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করায় লক্ষাধিক মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জীবন বাঁচাতে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর দিকে ছুটছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের পর্যটন খাত, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক স্থবিরতা নেমে এসেছে, যা জনজীবনকে পুরোপুরি অচল করে তুলেছে।
দেশের প্রধান বন্দর নগরী চট্টগ্রাম টানা তিন দিনের অবিরাম বৃষ্টির কারণে গতকালও চরম দুর্ভোগের এক নগরীতে পরিণত হয়েছিল। শহরের অধিকাংশ নিচু এলাকার ঘরবাড়ি এবং ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে এখন হাঁটুর ওপর পানি থইথই করছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, আকস্মিক জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর সিংহভাগ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার নিয়মিত ক্লাস এবং পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাগুলো স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এমনকি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার আগের দিন একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৪১২ মিলিমিটার। এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির কারণে মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ অন্তত ২০টি প্রধান এলাকায় কোমর পর্যন্ত পানি জমে যায়। নিচু এলাকার হাসপাতাল ও জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নিচতলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আকাশচুম্বী রূপ নিয়েছে।
জলাবদ্ধতার এই তীব্র প্রভাব পড়েছে দেশের রেল ও নৌ যোগাযোগ খাতের ওপর। চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুর ও ষোলশহর এলাকায় রেললাইন প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে থাকায় টানা দুই দিন ধরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে সম্পূর্ণভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। গত মঙ্গলবার ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ষোলশহর এলাকায় পানির তীব্রতায় আটকে পড়লে মাঝরাতেই সেটির যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এই রুটে প্রতিদিন চার জোড়া আধুনিক ট্রেন চলাচল করলেও লাইনের এই দশার কারণে হাজার হাজার যাত্রী মাঝপথে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এলাকাটি পরিদর্শন করে জানিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা এড়াতে ষোলশহর থেকে জানালীহাট সেকশনের বিদ্যমান রেললাইনটি আরও পাঁচ ফুট উঁচু করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের মূল জেটির কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে বন্দরে নতুন করে জাহাজজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে বেড়াতে গিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন ৬ শতাধিক দেশী-বিদেশী পর্যটক। টানা ভারী বর্ষণের ফলে দীঘিনালা-সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের মাচালং এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও সড়কের বড় দুটি অংশ ঢলের পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। এর ফলে সাজেকের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অল্প দিনের ছুটি নিয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা এই বিপুল সংখ্যক পর্যটক এখন কবে নাগাদ ঘরে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। অবশ্য মানবিক দিক বিবেচনা করে সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আটকে পড়া পর্যটকদের জন্য কক্ষ ভাড়া সম্পূর্ণ ফ্রি বা বিনামূল্যে করে দেওয়া হয়েছে, তবে প্রাত্যহিক ব্যবহারের পানির বিল পর্যটকদের নিজেদেরই পরিশোধ করতে হচ্ছে।
পাশাপাশি প্রতিবেশী জেলা খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও এখন পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন অংশ ৫ থেকে ৬ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে সোমবার বিকেল থেকেই এই রুটে সব ধরনের দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে নৌকার সাহায্যে সড়ক পারাপার হতে দেখা গেছে। পাহাড়ি এলাকায় অতি বৃষ্টির কারণে মারাত্মক পাহাড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৩৫টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম এবং রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্ধারকাজের জন্য প্রস্তুত রেখেছে এবং ইতিমধ্যে মেরুং এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রে বেশ কিছু দুর্গত পরিবারকে আশ্রয় দিয়ে খাবার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি এখন বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার বসতঘর, শত শত একর কৃষিজমি এবং প্রধান প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পাহাড় ধসের ভয়াবহ আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনবরত মাইকিং করা হচ্ছে। বান্দরবান সদর উপজেলার ৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতিমধ্যে ১৯০টি পরিবারের প্রায় ৭০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছেন।
উপকূলীয় ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই দুর্যোগের ক্ষত ছড়িয়ে পড়েছে। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন উত্তাল বঙ্গোপসাগরে গত কয়েক দিনে তিনটি মাছ ধরা ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে এখন পর্যন্ত ১৩ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। কোস্ট গার্ড ও স্থানীয়রা বেশ কয়েকজন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও নিখোঁজদের উদ্ধারে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তল্লাশি অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সাথে সারা দেশের নৌ-যোগাযোগ গত চার দিন ধরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞায় সব ধরনের লঞ্চ ও সি-ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকায় ফেরিঘাটে শত শত যানবাহন ও হাজারো যাত্রী আটকা পড়ে আছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় সাঙ্গু নদীর পাড় উপচে পানি লোকালয়ে ঢোকায় গ্রামীণ সড়কগুলো নদী ও খালের রূপ নিয়েছে।
দেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বৃষ্টির এই তাণ্ডব লক্ষ্য করা গেছে। ময়মনসিংহ নগরীতে টানা সাড়ে আট ঘণ্টার রেকর্ড ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কারণে প্রধান প্রধান সড়কসহ নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে গেছে, যা চলতি বছরে এই জেলায় সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশের সংস্কার কাজ চলাকালীন এক দিনের বৃষ্টিতেই নতুন ইটের কাঠামো ও মাটি ধসে পড়েছে, যা সরকারি কাজের গুণগত মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এছাড়া সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলাই ও লাঘাটা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে এবং হবিগঞ্জের মাধবপুরে ভারত থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলে শত শত একর সবজি ক্ষেত ও অসংখ্য মাছের পুকুর ভেসে গিয়ে কৃষকদের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের এই বৃষ্টিপাত আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে, যা বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে।
তথ্যসূত্র: সমকাল