দেশের ইতিহাসের সর্বাধিক ব্যয়বহুল উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আর্থিক ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার মাত্রা রূপ নিয়েছে নজিরবিহীন পরিসরে। আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডের’ প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অকল্পনীয় অসংগতির চিত্র। বিগত ৯ অর্থবছরে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ ও ব্যয় হওয়া মোট ৯৪ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশাল অংকের আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছেন সরকারি নিরীক্ষকেরা। সোজা কথায়, প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হওয়া প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকার খরচ নিয়েই তৈরি হয়েছে মারাত্মক অডিট আপত্তি। ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সময়কালে ফাপাডের পক্ষ থেকে মোট ২৩০টি অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। অডিটরদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, সার্বিক অনিয়মের অর্ধেকেরও বেশি বা ১২০টি অডিট আপত্তি গড়ে উঠেছে মূলত রাশিয়ার প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের বসবাসের জন্য নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে।
অর্থনৈতিক অনিয়মের পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সার্বিক বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে সরকারের বাস্তবায়নে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ বা আইএমইডি। সম্প্রতি মেগা প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা পরিদর্শন করে আইএমইডি জানিয়েছে যে, ঠিক কখন থেকে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে, সেই সংক্রান্ত হালনাগাদ কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। এছাড়া প্রকল্পে এখনও কোন কোন কাজ অসম্পূর্ণ পড়ে রয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা বা নথিও প্রজেক্ট অফিসে সংরক্ষণ করা হয়নি। মূল অনুমোদন অনুযায়ী ২০১৬ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু হওয়া ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে পরবর্তীতে সরকারিভাবে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। সময় বাড়ার সাথে সাথে প্রাথমিক খরচ ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। তবে এত বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচের পরও প্রকল্পের সামগ্রিক পরিচালনা পদ্ধতিকে আইনি ও প্রশাসনিক বিধিবিধানের চরম লঙ্ঘন হিসেবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
ফাপাডের বাৎসরিক হিসাব পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, প্রথম পাঁচ অর্থ বছরেই ৪১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা খরচের বিপরীতে ৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার অনিয়ম উন্মোচিত হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে অডিট আপত্তির পরিমাণ ১০৬ কোটি টাকা হলেও এর পরের অর্থ বছরেই তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায়। তবে অনিয়মের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে, যখন ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের হিসাব নিয়েই সরাসরি আপত্তি তোলে ফাপাড। সর্বশেষে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও অডিট আপত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যমতে, প্রযুক্তি প্রদানকারী ও ঋণদাতা হিসেবে রাশিয়ার বৈশ্বিক দুর্নীতির নিম্ন অবস্থান এবং পতিত কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের আমলে স্বচ্ছতার অভাবই রূপপুরকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক চোরতন্ত্রের আস্তানে পরিণত করেছিল। চুক্তি সম্পাদনের শুরু থেকেই রাশিয়া ও এর নির্মাণ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের চুক্তিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো দেশকে।
রূপপুর প্রকল্পের ভেতরে গ্রিন সিটি আবাসন খাতের কেনাকাটা ও নির্মাণকাজ ছিল অনিয়মের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু। ১১টি ভবনের ইলেকট্রিক্যাল উপকেন্দ্র, পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেল ও জেনারেটর সরঞ্জামাদি কিনতে সরকারি বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল সাড়ে ২৭ কোটি টাকা, অথচ একই পণ্য ক্রয়ে ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে প্রায় ২১৪ কোটি টাকা। কেবল এই একটি খাতেই প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার বেশি রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট করা হয়েছে। একটি ভবনের অভ্যন্তরীণ উচ্চ ভোল্টেজ ট্রান্সফরমার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ক্রয়ের সরকারি অনুমোদিত প্রাক্কলন ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা হলেও, ভুয়া কাগজপত্রে সরকারি তহবিল থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ভবনপ্রতি প্রায় ১৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। বালিশ কেনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনায় প্রকৃত খরচ ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও কাগজপত্রে মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা ছিল কেবল মহাসাগরের ওপরের ভাসমান বরফের মতো অনিয়মের সামান্য অংশ মাত্র। গ্রিন সিটির ২০টি আবাসিক ভবনের সামগ্রিক অবকাঠামোতেই প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৯৫ কোটি টাকার বাড়তি আর্থিক ক্ষতি ঘটাতে প্রতারণামূলক দরপত্রের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রযুক্তিগত ধীরগতি ও অসংগতি সম্পর্কে আইএমইডির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, প্রকল্পের রাশিয়ান ঠিকাদারি সংস্থা অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও নতুন কোনো বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়নি। বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদন না দেওয়ায় প্রকল্প তদারকি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। সাবেক পরিকল্পনা সচিবদের মতে, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) পুরোপুরি অমান্য করে কেনাকাটা চালানো এবং তদারকি স্টিয়ারিং কমিটির নিষ্ক্রিয়তার কারণেই আজ এই বিশাল অডিট আপত্তি তৈরি হয়েছে। কেবল প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা নয়, বরং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা নীতি নির্ধারকদের পরোক্ষ অনুমোদন ছাড়া সরকারি তহবিলের এত বড় নয়ছয় কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না বলে নিশ্চিত করেছেন বিষেজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর