• শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৪ অপরাহ্ন

হরমুজ সংকটে দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যে আকাশচুম্বী ব্যয়

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাত, পারস্য উপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় সমুদ্রবন্দরগুলোতে নোঙর করার অপেক্ষায় থাকা জাহাজের ভয়াবহ যানজটের জোড়া ধাক্কায় দক্ষিণ এশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতে নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন সংক্রান্ত বাজার গবেষণা সংস্থা ড্রিউরির অতি সাম্প্রতিক ‘কনটেইনার ফ্রেইট রেট ইনসাইট’ বার্ষিক প্রতিবেদনে আশঙ্কাজনক এই উপাত্ত প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান সংকট ঘনীভূত হওয়ার ফলে কেবল বিগত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশ, ভারতসহ পার্শ্ববর্তী অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে পাঠানো পণ্যের কনটেইনার পরিবহন ভাড়া বা সমুদ্র মাশুল গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য বাণিজ্যিক হাবসমূহ যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবমুখী সমুদ্র রুটগুলোতে সাধারণ সময়ের স্বাভাবিক ভাড়ার হারের তুলনায় বর্তমানে তিন গুণেরও বেশি মাশুল গুণতে বাধ্য হচ্ছেন বৈশ্বিক রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

সমুদ্র বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ড্রিউরি তাদের পূর্বাভাসে সতর্ক করে ব্যক্ত করেছে যে, অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অভ্যন্তরীণ রুটে সরাসরি কনটেইনারবাহী ফিডার সার্ভিসগুলো পূর্ণাঙ্গ স্বাভাবিক ধারায় ফিরে না আসা পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ভাড়া আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এর ওপর লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জেদ্দা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার চলমান ঝুঁকি পরিবহন খাতের জটিলতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যগামী মূল রুটটিতে জাহাজ চলাচলের মাশুল সবচেয়ে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় উর্ধমুখী হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের চরম ঝুঁকির কারণে শিপিং লাইনগুলোকে এখন দীর্ঘ, আঁকাবাঁকা ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল স্থল ও সমুদ্র সমন্বিত বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন সারচার্জ, আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান বন্দরগুলোতে কনটেইনার ধারণক্ষমতার সংকট।

শিপিং তথ্যের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের জওহরলাল নেহরু বন্দর (জেএনপিটি) থেকে দুবাইয়ের অত্যন্ত ব্যস্ত জেবেল আলী বন্দর পর্যন্ত ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কনটেইনার পরিবহনের স্পট ভাড়া ২০২৫ সালে গড়ে ছিল মাত্র ৭৩৪ ডলার। কিন্তু ইরান সংঘাত রূপ নেওয়ায় ২০২৬ সালের এপ্রিলে সেই একই রুটে ভাড়ার পরিমাণ পৌঁছে যায় অবিশ্বাস্য ৬ হাজার ২১৬ ডলারে, যা মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ৮০৭ শতাংশের এক অভূতপূর্ব লাফ। যদিও পরবর্তীতে জুনে এই ভাড়া কিছুটা কমে ৫ হাজার ৬০৯ ডলারে নেমে আসে, তবুও তা সংঘাত-পূর্ব স্বাভাবিক ভাড়ার স্তরের চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি। একই ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা গেছে জেদ্দামুখী সমুদ্র চালানেও, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৮৪ ডলারের শিপিং ফি মার্চে লাফিয়ে উঠে যায় ৫ হাজার ৩৫৪ ডলারে। পারস্য উপসাগরের ফিডার সার্ভিসগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ায় দূরবর্তী বিকল্প রুট ব্যবহার করতে গিয়ে পরিবহন কোম্পানিগুলোকে দ্বিগুণ সময় এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যের ওপর।

জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার মূল বাণিজ্যিক রুটগুলোতে সমুদ্র মাশুল একলাফে বৃদ্ধি পেয়েছে। জেএনপিটি থেকে ইতালির জেনোয়া বন্দরগামী ৪০ ফুট কনটেইনারের স্পট ফি ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩০ ডলারে এবং নিউইয়র্কগামী সমুদ্র ভাড়ার পরিমাণ ৪৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৯৭ ডলারে। বিশ্ববাজারে সমুদ্র সক্ষমতা হঠাৎ অস্বাভাবিক কমে যাওয়াকে এই সংকটজনক দরবৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে। গ্লোবাল শিপিং কোম্পানি এমএসসি তাদের ‘ইন্ডাস এক্সপ্রেস’ সার্ভিস সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে এবং ওশান নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস (ওয়ান) তাদের ‘উইন’ সেবার পরিধি কমিয়ে আংশিক বন্ধ করে দেওয়ায় কসকো ও এইচএমএমের মতো বড় বড় ক্যারিয়ারগুলো তাদের বরাদ্দকৃত কনটেইনার স্পেস হারিয়েছে। অন্যদিকে, সংকট সত্ত্বেও পশ্চিমা বাজারে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় পণ্যের প্রবল চাহিদা বহাল থাকায় আগস্টের শেষ পর্যন্ত জাহাজগুলোর সব বুকিং আগেই পূর্ণ হয়ে গেছে, যা চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত লোকসান সামাল দিতে বিশ্বখ্যাত শিপিং কোম্পানিগুলো এখন বুকিং ও শিপমেন্ট বাতিলের নিয়মে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বৈশ্বিক পরিবহন জায়ান্ট হ্যাপাগ-লয়েড বুকিং বাতিলের জরিমানা তিন গুণ বাড়িয়ে প্রতি কনটেইনারে ৩০০ ডলার নির্ধারণ করেছে। একইভাবে মায়ের্স্ক, এমএসসি, কসকো এবং ওয়ান কোম্পানিগুলো বুকিং বাতিলে ১০০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত নতুন ফি যুক্ত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার কন্টেইনার রুটে গত জুনে মধ্যমধ্যসাগরীয় জাহাজের মোট সক্ষমতা আগের মাসের চেয়ে অন্তত ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং মার্কিন রুটে অতিরিক্ত স্থান দ্রুত খালি হয়ে গেছে। ভারতের মুন্দ্রা ও নাভা শেভা বন্দরে স্থান সংকটের কারণে প্রতি যাত্রায় হাজার হাজার টিইইউ কনটেইনার পণ্য পড়ে থাকছে এবং জাহাজ ভিড়তে দীর্ঘ সময় লঙ্গার করে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যেমন, জেএনপিটি বন্দরে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় ১৮ ঘণ্টা থেকে বেড়ে এক লাফে ২৬ ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকেছে, যা বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ভূরাজনৈতিক এই মহাসংকট কেবল সমুদ্রপথেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আকাশপথে কার্গো পরিবহনের ওপরও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের খবর ছড়ানোর সাথে সাথে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় তাদের ফ্লাইট চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী বিমান কার্গোর প্রায় ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পরিবহন সক্ষমতা সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে। সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত বিলম্ব হওয়ার কারণে অনেক জরুরি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে আকাশপথ বেছে নিচ্ছেন। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ভারতের মুম্বাই ও দিল্লি থেকে লন্ডনের এয়ার ফ্রেইট স্পট ভাড়া প্রায় ৫৭ থেকে ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার এবং দক্ষিণ এশীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হরমুজ ও সুয়েজ খালের অনিশ্চিত রুট এড়িয়ে চলার পাশাপাশি জরুরি ব্যাকআপ প্ল্যান বা বিকল্প বাণিজ্যিক রুট প্রস্তুত রাখার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থাটি।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category