• শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৬ অপরাহ্ন

গবেষণার নামে ১৫ উটপাখি জবাই: ১৩৪ কোটি টাকার প্রকল্পের অর্জন ‘শূন্য’

Reporter Name / ০ Time View
Update : শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

ঢাকার সাভারে অবস্থিত বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএলআরআই) দেশীয় পরিবেশে বিকল্প মাংসের উৎস হিসেবে আফ্রিকার উটপাখি পালনের সুদূরপ্রসারী ও উচ্চাভিলাষী গবেষণা প্রকল্প চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। পোলট্রি খাতের উন্নয়ন ও দেশীয় আবহাওয়ায় বাণিজ্যিক উটপাখি খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গ্রহণ করা ১৩৪ কোটি টাকার ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’-এর মেয়াদ শেষে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক অর্জন মেলেনি। বরং গবেষণার জন্য দুই দফায় আফ্রিকা থেকে আনা ২২টি দামি আফ্রিকান উটপাখির মধ্যে ১৫টিই ‘মাংসের স্বাদ ও গুণগত মান’ পরীক্ষার অজুহাতে জবাই করা হয়েছে। এছাড়া তিনটি মারা গেছে এবং দুটি উটপাখির কোনো হদিস মেলেনি। বর্তমানে শেডে অবশিষ্ট মাত্র দুটি উটপাখি নিয়ে প্রকল্পের সমাপ্তি টানা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয় ও অনিয়মের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

গবেষণা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ড. সাজেদুল করিম সরকারের অধীনে এই উচ্চাভিলাষী গবেষণা পরিচালিত হয়। প্রকল্প শুরুর সময় বলা হয়েছিল যে, একটি প্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি থেকে ১০০ থেকে ১৫০ কেজি মাংস পাওয়া সম্ভব এবং এটি অন্তত দুটি দেশীয় গরুর প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ ছয় বছর পার হলেও বাংলাদেশে এই পাখির কৃত্রিম প্রজনন, ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন বা খামারিদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের কোনো বাস্তবিক রূপরেখা তৈরি করা যায়নি। উটপাখির মতো দূরবর্তী প্রজাতির প্রাণীকে দীর্ঘমেয়াদে অভিযোজিত না করে গবেষণার মাঝপথেই সিংহভাগ পাখি জবাই করার এই সিদ্ধান্তকে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা চরম অযৌক্তিক এবং গবেষণা-নৈতিকতা বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। গবেষকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে গবেষণায় ব্যর্থতা আসতেই পারে, তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তব সুফল পৌঁছানোর আগেই এত বিপুল পরিমাণ বাজেট শেষ হওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

উটপাখি গবেষণা ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক ড. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি ও বড় ধরনের নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি খরচে কেনা ল্যাবরেটরির অত্যন্ত মূল্যবান যন্ত্রপাতি নিজের স্ত্রীর জিম্মায় রেখে তাকে ল্যাব ইনচার্জের ভুয়া ও কাগজে-কলমে পদ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি নিজের শ্যালক, ভাগ্নিজামাই, ভাগিনা, মামাতো ভাইয়ের স্ত্রীসহ নিজ পরিবারের প্রায় ১৮ জন নিকটাত্মীয়কে নিয়মবহির্ভূতভাবে এই প্রকল্পে চাকরি দিয়েছেন। শুধু উটপাখিই নয়, ইতিপূর্বে ২০২৩ সালে এই প্রকল্পের অধীনে গবেষণাধীন ৩৮টি উন্নত জাতের মোরগ জবাই করে খেয়ে ফেলার পর চুরির নাটক সাজানো হয়েছিল, যার তদন্ত প্রতিবেদন পরবর্তীতে ধামাচাপা দেওয়া হয়।

ইনস্টিটিউটের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে যে, উটপাখি বিদেশি প্রাণী হওয়ায় দেশীয় জলবায়ুতে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগছে এবং মাংসের স্বাদ ও খাদ্য গ্রহণের ধরণ মূল্যায়নের জন্যই কিছু পাখি জবাই করা হয়েছিল। তবে বিএলআরআইয়ের প্রশাসনিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও কোটি কোটি টাকার ব্যর্থ প্রকল্পের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, তদন্তে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category