দেশজুড়ে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন গ্যাস সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাস নতুন এক বিকল্প পদ্ধতিতে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া একমাত্র এলএনজি টার্মিনালটি কবে নাগাদ চালু হবে তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় বিকল্প হিসেবে এই প্রস্তাব এনেছে কোম্পানিটি। পাত্র বা লরি ট্যাংকারভিত্তিক ‘আইএসও’ পদ্ধতিতে এক সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি এনে জরুরি সংকট মোকাবিলার কথা বলা হলেও, প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম বর্তমান স্থানীয় মূল্যের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি চাওয়ায় এতে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে যেখানে দেশীয় শিল্পকারখানায় প্রতি ইউনিট গ্যাসের জন্য ৩১ টাকা গুনতে হয়, সেখানে পেট্রোনাস প্রতি ইউনিটের দর হাঁকিয়েছে ন্যূনতম ১০০ টাকা। ফলে গ্যাস না পেয়ে স্থবির হয়ে পড়া পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়ীরা এত চড়া মূল্যে মালয়েশিয়ার এই জ্বালানি নিতে তীব্র অনিচ্ছা ও সংশয় প্রকাশ করছেন।
জ্বালানি খাতের এই মহাসংকট এখন আর কেবল বাসা-বাড়ির বন্ধ থাকা চুলা কিংবা সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর দীর্ঘ সারিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো দেশের কয়েক হাজার শিল্পকারখানার চাকা একপ্রকার অচল করে দিয়েছে। কারিগরি ত্রুটি ও দুর্ঘটনাকবলিত হওয়া ভাসমান টার্মিনালটি দ্রুত মেরামত করে সচল করা সম্ভব না হওয়ায় পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে অন্যান্য দেশের সাথে জরুরি যোগাযোগ শুরু করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকালে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সুবাদেই পেট্রোনাস এই স্বল্পমেয়াদি বিকল্প সরবরাহের বার্তা নিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছে। তারা জানিয়েছে যে লরি বা কনটেইনারের মতো বিশেষ আইএসও ট্যাংকে করে জাহাজে চাপিয়ে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে গ্যাস পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চড়া দর এবং গ্রাহক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত মূলধন বিনিয়োগের আবশ্যকতা।
পেট্রোনাসের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি জাহাজে প্রায় ছয়শোটি বিশেষায়িত ট্যাংক পরিবহন করা যাবে। তবে এই গ্যাস ব্যবহারের উপযোগী করতে হলে প্রতিটি শিল্পকারখানা কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি স্থাপনায় নিজস্ব রিগ্যাসিফিকেশন প্ল্যান্ট এবং আলাদা স্টোরেজ রিজার্ভার স্থাপন করতে হবে। এতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বা মালিকপক্ষকে নতুন করে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়ে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হওয়া এবং অন্যদিকে সিএনজিচালিত যানবাহনের অচলাবস্থা কাটানোর জন্য এই প্রস্তাবটি সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবালেও, সরকারি খাত কিংবা বেসরকারি খাতের বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ নেতাদের জন্য ১০০ টাকার দর মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ বিদ্যমান বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতিতে এত উচ্চ দামে গ্যাস কিনে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা সম্ভব নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা পেট্রোবাংলার সাধারণ আমদানিকৃত প্রতি ইউনিট গ্যাসের ক্রয়মূল্যকে ইতিমধ্যে ৬৬ টাকায় নিয়ে ঠেকিয়েছে। যেখানে গত বছর এই খাতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ব্যয় হয়েছিল, সেখানে নতুন এই বছরে তা আশঙ্কাজনকভাবে আরও বৃদ্ধি পেয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিশাল চাপ ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এখন হিসাব কষে দেখছে যে, গ্যাস সংকটে তেলভিত্তিক প্ল্যান্ট থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ বানানোর তুলনায় আইএসও পদ্ধতির ১০০ টাকা দরের গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ বানালে তা আদৌ কোনো সাশ্রয় বা অর্থনৈতিক সুফল আনবে কি না। এ ছাড়া ডিমান্ড নোট জমা দিয়েও গত কয়েক বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা সাড়ে পাঁচ শতাধিক নতুন শিল্পকারখানার ভাগ্য এই চড়া দরের চক্করে আরও বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।
পেট্রোনাসের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বড় বড় শিল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে টেকনিক্যাল সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি মন্ত্রনালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। তবে শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ ভর্তুকি বা মূল্য পুনর্বিন্যাসের সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেওয়া না হলে কেবল সংকট নিরসনের অজুহাতে বর্তমান দরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ চড়া দামে গ্যাস কিনে ব্যবসা চালানো অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই অসম্ভব। ফলে আপদকালীন সময়ে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আনার এই বিকল্প পথটি দামের মারপ্যাঁচে থমকে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি দেখা দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর