দেশের আর্থিক খাতের মূল স্তম্ভ ব্যাংক ব্যবস্থা বর্তমানে নজিরবিহীন অস্থিরতা ও কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে নতুন করে খেলাপি ঋণের খাতায় যুক্ত হয়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকার নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আইনি বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যাংক দেউলিয়া বা ব্যর্থ ঘোষিত হলে গ্রাহকের শত কোটি টাকা জমা থাকলেও তিনি সর্বোচ্চ মাত্র ২ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার অধিকার রাখেন। এর ফলে দেশের সামগ্রিক ব্যাংক আমানতের মাত্র ১৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বীমার আওতায় সুরক্ষিত থাকলেও বাকি ৮১ শতাংশ অর্থই সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবনমন লক্ষ্য করা গেছে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোতে। ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৫৮.৪ শতাংশই খেলাপিতে রূপ নিয়েছে, যা এক বছর আগের ২৯.২ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অপরদিকে ২০১৩ সালে লাইসেন্স পাওয়া চতুর্থ প্রজন্মের ৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২.২ শতাংশে। ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের অনুপাত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর এডিআর বা ঋণ-আমানত অনুপাত পৌঁছেছে ১২০.৩ শতাংশে এবং চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে তা ১০১.৬ শতাংশ। অর্থাৎ নিজেদের সংগৃহীত আমানতের চেয়েও বেশি অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে, যা মেটানো হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ ধারের মাধ্যমে।
ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায়, যা গত বছরের ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আইনগত বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ব্যাংকটির ভল্ট ও তহবিলে ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে রক্ষিত তহবিলের পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকায়। এর প্রভাবে শেয়ারবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দর ৫২ টাকা থেকে কমে ২৯ টাকায় নেমে এসেছে। একই সাথে আইএফআইসি ব্যাংকের মোট ঋণের ৬৩ শতাংশ বা ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া এক্সিম ব্যাংকে ৩ হাজার ৩২০ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকে ২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বড় অঙ্কের খেলাপির সরাসরি প্রভাবে ব্যাংকগুলোর মূলধনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বর্তমানে দেশের ২৪টি ব্যাংক তাদের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পুঁজি সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়ে মোট ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এর মধ্যে ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত, ২টি বিশেষায়িত এবং ১৮টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। প্রধান ঘাটতিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা, ইউসিবি ব্যাংকের ৫ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৫ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ৩১৬ কোটি টাকা এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫৪ কোটি টাকায়। সমস্যাগ্রস্ত এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল, সোশ্যাল এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত ১.৪৭ ট্রিলিয়ন টাকার খেলাপি ঋণগ্রস্ত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ সরকারি সহায়তার পরও পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজ ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নেওয়া এবং পরবর্তীতে সুদ মওকুফের সংস্কৃতিই পুরো খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর এখন বিশেষ এক্সিট সুবিধার মাধ্যমে সুদ মওকুফের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে সংকট উত্তরণে চীন ও ভারতের মতো কঠোর পদক্ষেপের মডেল অনুসরণের দাবি উঠেছে। চীন যেমন ব্যাংকিং জালিয়াতির দায়ে শীর্ষ কর্তাদের সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর করে খেলাপি হার ১ শতাংশে নামিয়েছে এবং ভারত বেসরকারি ব্যাংক জাতীয়করণ করে শৃঙ্খলা এনেছে, বাংলাদেশেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে এখনো পর্যন্ত দেশের ২৬টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় ১২.৫ শতাংশ মূলধন সক্ষমতা ধরে রেখে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে, যা সঠিক নীতিমালার কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পুরো খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।