দেশে কিডনি অকার্যকর হওয়া বা বিকল রোগীর সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ভুগছেন। এদের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে চূড়ান্ত বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই বিপুল সংখ্যক মূমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে নিয়মিত ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প থাকে না। দেশে প্রায় চার দশক আগে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম শুরু হলেও এবং এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় চার হাজার কিডনি সংযোজন সম্পন্ন হলেও সরকারি খাতের শীর্ষ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে (এনআইকেডিইউ) গত ২১ বছরে কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৮৬টি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জাতীয় পর্যায়ের এই প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিস্থাপনের সংখ্যা একশ পূর্ণ করতে পারেনি।
দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে দশটিরও কম প্রতিষ্ঠানে কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের স্বল্পমূল্যে উন্নত সেবা পাওয়ার প্রধান ভরসাস্থল হিসেবে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে মাত্র ১০০ শয্যা দিয়ে রোগী ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হয়। সময়ের সাথে সাথে রোগীর চাপ বাড়ায় ২০১২ সালে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ এবং ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তা ৩০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে প্রশাসনিকভাবে ৫০০ শয্যার অনুমোদন মিললেও এবং বাস্তবে ৪৫০ শয্যায় রোগী ভর্তি রাখা হলেও পুরো হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সেই পুরোনো ১৫০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে। অনুমোদিত সাড়ে ছয়শ পদের মধ্যে প্রায় একশ পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। অথচ একটি ৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট সফলভাবে পরিচালনার জন্য প্রায় পৌনে তিন হাজার দক্ষ জনবল প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। জনবল এবং কাঠামোগত এই তীব্র ভারসাম্যহীনতা পুরো চিকিৎসাসেবার গতিকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করে রেখেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কিডনি প্রতিস্থাপনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৫ সালে এখানে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার শুরু হয়। এরপর ২০০৮ সালে ৪টি, ২০০৯ সালে ৮টি, ২০১০ সালে ৪টি, ২০১১ সালে ৫টি এবং ২০১২ ও ২০১৩ সালে ৩টি করে প্রতিস্থাপন করা হয়। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে একটি করে অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘ পাঁচ বছর এই জীবন রক্ষাকারী কার্যক্রমটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে ২০২১ সালে পুনরায় ৩টি কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কার্যক্রমটি সচল করা হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে ৫টি, ২০২৩ সালে ১১টি, ২০২৪ সালে ৮টি এবং ২০২৫ সালে ১৭টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। আর চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১২টি সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের এই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে ২১ বছরে মাত্র ৮৬ জন রোগী নতুন কিডনি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, কিডনি প্রতিস্থাপন অত্যন্ত সূক্ষ্ম, সংবেদনশীল এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। দাতা ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ এবং টিস্যু ম্যাচিংসহ একাধিক জটিল ধাপ পার হতে হয়। এনআইকেডিইউতে বর্তমানে প্রতিস্থাপনের জন্য বহু রোগী অপেক্ষমাণ রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ২০ জন রোগীর প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানদের অভিমত, বর্তমান লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা ও সার্জন সংকট সত্ত্বেও যদি প্রশাসনিক ও আইনি অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন করা যায়, তবে সপ্তাহে অন্তত দুটি করে বছরে প্রায় একশটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভব। চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় উচ্চতর ডিগ্রি, দক্ষতা ও সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সমন্বিত সহায়তার অভাবে এই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি বড় কারণ হলো কঠোর ও বহুস্তরীয় আইনি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া। কিডনি কেনাবেচা ও পাচার রোধে দাতা ও গ্রহীতার পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে একাধিক ধাপে প্রশাসনিক তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে পুলিশের মাধ্যমে বিশেষ ভেরিফিকেশন করা হয়। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ আইনি কমিটি নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে ছাড়পত্র দেয়। পাশাপাশি চিকিৎসকদের একটি বিশেষ বোর্ড দাতার শারীরিক সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে নিকটাত্মীয় ছাড়াও আবেগী বা ইমোশনাল ডোনারের পরিধি কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে, তবুও প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়।
আইনি জটিলতার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ের উন্নত প্রযুক্তির অভাবও একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতাল ভবনটি চারতলা থেকে আটতলায় সম্প্রসারণ করা হলেও এবং পঞ্চম তলায় ১০ শয্যার আধুনিক রেনাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আরআইসিইউ) স্থাপন করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে মাত্র ৫টি শয্যা চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য সবচেয়ে জরুরি দুটি পরীক্ষা—টিস্যু ক্রস-ম্যাচিং এবং হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন (এইচএলএ) টাইপিং করার মতো সুবিধা এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানে নেই। ফলে অসহায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বাড়তি অর্থ খরচ করে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এসব পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
তবে কিডনি প্রতিস্থাপনের সংখ্যা সীমিত হলেও সার্বিক ইউরোলজিক্যাল সেবায় হাসপাতালটির ওপর রয়েছে রোগীদের পর্বতসম চাপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক বছরে এই প্রতিষ্ঠানের বহির্বিভাগে ২ লাখ ৫ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। জরুরি বিভাগ থেকে সেবা নিয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন সাড়ে ১৩ হাজার মানুষ। শয্যা সংখ্যার বিপরীতে রোগী ভর্তির হার ছিল ১১৯ শতাংশ। বছরজুড়ে ২ হাজার ১৭৬টি বড় এবং প্রায় তিন হাজার ছোট অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন এখানকার শল্য চিকিৎসকেরা। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি জটিল অস্ত্রোপচার হচ্ছে, যার ৯৫ শতাংশই সম্পন্ন হচ্ছে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক, এন্ডোস্কোপিক এবং মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতিতে। রোবোটিক সার্জারির মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে অস্ত্রোপচারের মান ও গতি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো।
সার্বিক সংকট উত্তরণে কেবল জীবিত আত্মীয়-স্বজনের কিডনি দানের ওপর নির্ভর না করে ‘ক্যাডাভেরিক ডোনেশন’ বা ব্রেন ডেথ ঘোষিত ব্যক্তির অঙ্গদানের বিষয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সামাজিক ও ধর্মীয় সচেতনতা গড়ে তোলার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের বহু উন্নত দেশে মরণোত্তর অঙ্গদানের মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের হার বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। একই সাথে প্রতিস্থাপন পরবর্তী সময়ে আজীবন ব্যয়বহুল অ্যান্টি-রিজেকশন ওষুধ ক্রয়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র রোগীদের সরকারি তহবিল থেকে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে বিশেষজ্ঞ সার্জন বৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট হয়ে উঠতে পারে দেশের লাখ লাখ কিডনি রোগীর জন্য এক নিরাপদ ও কার্যকর আশ্রয়স্থল।