• বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন
Headline
অতিরিক্ত ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তাকে বদলি জামিনে মুক্তি পেলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক আহতদের চিকিৎসা ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : ইশরাক হোসেন চলতি মাসের শেষ দিকে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’: প্রতিমন্ত্রী শ্রম সহযোগিতা নি‌য়ে কাতারের মন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক পর্যটন খাতে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার বৈঠক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালট ‘ওপেন’, কে কাকে ভোট দেবেন সবই দেখা যাবে গণমাধ্যম বাংলাদেশে এখন সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে : তথ্যমন্ত্রী কলকাতায় হোটেলে আগুনে নিহতদের মধ্যে ৫ জন বাংলাদেশি ডপলার রিসার্চের জরিপ: প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ

দেড় লাখ কোটির খেলাপি ঋণের বোঝা: নেতৃত্বহীনতায় ধুঁকছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক

Reporter Name / ৭ Time View
Update : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

সরকার পরিবর্তনের পর ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসনের দৃশ্যমান কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। উল্টো শীর্ষ পদগুলোতে নতুন নিয়োগ ও সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোতে এক ধরনের প্রশাসনিক স্থবিরতা নেমে এসেছে। দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংকে সাড়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী কোনো চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। কেবল ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব দিয়ে পরিচালনা পর্ষদের কাজ চালানো হচ্ছে। একই সাথে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে পরিবর্তন আসার গুঞ্জনে শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র সিদ্ধান্তহীনতা। যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ বিতরণ ও সার্বিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে।
ব্যাংকিং খাতের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী এবং বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকসহ সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে যে কোনো মুহূর্তে পরিবর্তন আসতে পারে—এমন গুঞ্জনে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান চেয়ারম্যান ও এমডিরা নিজেদের মেয়াদের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম এখন কেবল আমানত সংগ্রহ, প্রবাসী আয় বিতরণ, সরকারি ঋণপত্র খোলা এবং ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের মতো গতানুগতিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতের প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে নতুন ঋণ প্রবাহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে সামগ্রিক ঋণ স্থিতি বৃদ্ধির পরিবর্তে সংকুচিত হচ্ছে।
দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের আর্থিক চিত্র পর্যালোচনা করলে এই স্থবিরতার গভীরতা স্পষ্ট হয়। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকটিতে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার আমানত থাকলেও ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৬ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যাংকটির ঋণ-আমানত অনুপাত ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের স্বাভাবিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক কম। গত ডিসেম্বর শেষে বিতরণকৃত মোট ঋণ স্থিতি যেখানে ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা ছিল, সেখানে ছয় মাসের ব্যবধানে তা না বেড়ে উল্টো প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা অবশ্য দাবি করছে যে নিয়মিত আদায় এবং সরকারি কিছু দায় সমন্বয়ের কারণেই সামগ্রিক স্থিতিতে এই পরিবর্তন এসেছে। তবে উদ্যোক্তা পর্যায়ে নতুন পুঁজি সরবরাহের যে গতি থাকা দরকার ছিল, তা দৃশ্যমান হয়নি।
অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক সূচকেও একই ধরনের মন্থর গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অগ্রণী ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি গত ডিসেম্বরের ৮০ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা থেকে কমে জুনে ৮০ হাজার ৮৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। রূপালী ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ঋণ স্থিতি সামান্য বাড়লেও একই সময়ে পরিচালন লোকসান হয়েছে ৬১১ কোটি টাকা। নতুন কোনো ব্যবসায়িক ঝুঁকি না নিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত তহবিল কেবল ঝুঁকিমুক্ত সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে খাটাচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে সরকারি ব্যাংকগুলোর যে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা থমকে গেছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও সাবেক নিয়ন্ত্রকদের মতে, বিগত দেড় দশকের অনিয়ম, অনৈতিক হস্তক্ষেপ ও লুণ্ঠনের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। বর্তমানে ৯টি সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৪৫ শতাংশেরও বেশি। বিশেষ করে জনতা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা খাদের কিনারায় এসে পৌঁছেছে। এই ভয়াবহ ক্ষত নিরাময়ে নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সংস্কার কর্মসূচি, একীভূতকরণ কিংবা ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার মতো সাহসী পদক্ষেপের প্রত্যাশা থাকলেও বিগত অর্ধবছরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগ্রতি লক্ষ্য করা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীর্ষ পদে যোগ্য ও স্বাধীন ব্যক্তিদের দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ না দিলে এই প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ পদ ফাঁকা রাখা কিংবা অনানুষ্ঠানিক গুঞ্জন জিইয়ে রাখা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সুশাসনের পরিচায়ক নয়। বিগত সরকারের আমলে দলীয় আনুগত্য ও অনিয়মের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণভাবে যোগ্য শীর্ষ নির্বাহীর মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে প্রয়োজনে বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে সৎ, দক্ষ ও পেশাদার ব্যাংকারদের চুক্তিভিত্তিক এনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানোর বিকল্পও সক্রিয়ভাবে ভাবা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানানো হয়েছে, সংস্কারের কাজগুলো গুছিয়ে আনা হচ্ছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা স্তরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। তবে অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে অবিলম্বে দক্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমিয়ে কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করাই এখন আর্থিক খাতের প্রধান জরুরি কাজ।
তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category