দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এ নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচনে ভোটাররা গোপন ব্যালটে নয়, ভোট দেবেন প্রকাশ্যে ‘ওপেন’ ব্যালটে। কে কাকে ভোট দিচ্ছেন তা উপস্থিত সবার কাছে দৃশ্যমান থাকবে।
সাধারণত নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জ্যেষ্ঠ সচিব ব্রিফ করে থাকেন। তবে আইনের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব সিইসির ওপর ন্যস্ত থাকায়, এই বিশেষ ও ঐতিহাসিক সময়ে তিনি নিজেই সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান সিইসি।
জাতীয় সংসদ বর্তমানে নিয়মিত অধিবেশনে না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সিইসি নিজেই সংসদ সদস্যদের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ১১ আগস্ট ন্যূনতম সাত দিন সময় রেখে এই সংক্রান্ত গ্যাজেট প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই এই নির্বাচনের ভোটার। নির্বাচন কমিশন আগেই ভোটার তালিকা ও তফসিল প্রকাশ করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনে মোট তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে দুটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় ড. অলি আহমদের নামে এবং বর্তমান সরকারি দল বিএনপির পক্ষে একটি মনোনয়ন জমা দেওয়া হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে। পরবর্তীকালে ১৬ আগস্ট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহায়তায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার দিনের মূল স্বাক্ষর রেজিস্টারের সঙ্গে প্রস্তাবক ও সমর্থকদের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে একটি বাড়তি হিসেবে গণ্য হওয়ায় চূড়ান্তভাবে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে কোনো প্রার্থীই নাম প্রত্যাহার করেননি।
ভোটার তালিকার ক্রমিকে কিছুটা বৈচিত্র্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সিইসি জানান, সংসদীয় সীমানার সিরিয়াল অনুযায়ী পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু হয়ে বান্দরবানে গিয়ে ৩০০ আসন শেষ হলেও এই নির্বাচনে মূলত সংসদের ‘বিভক্তি নম্বর’ অনুযায়ী ভোটিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা শূন্যতার কারণে ভোটার তালিকায় বিভক্তি নম্বরে কিছুটা ডিসকন্টিনিউইটি রয়েছে। তবে তা নিয়মানুগভাবেই সমাধান করা হয়েছে এবং মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জন। ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যরা এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি স্পষ্ট করেন যে, সংসদ ভবনের ভেতরের পরিবেশ ও বিধিমালা বজায় রাখার দায়িত্ব স্পিকারের, যা তাদের নিজস্ব আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে ভোটের দিন হাউজের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। এছাড়া এই নির্বাচনকে ঘিরে অতিরিক্ত বা কোটি কোটি টাকা খরচের খবর গুজব ছাড়া কিছু নয় বলে তিনি জানান। সংসদের বৈঠক ডাকার মতো নিয়মিত বিষয় এবং কিছু ব্যালট ও স্টেশনারি ছাড়া কমিশনের আলাদা কোনো বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় বা অতিরিক্ত বাজেট তৈরি হয়নি।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে উল্লেখ করে সিইসি নাসির উদ্দীন আশা প্রকাশ করেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন একটি অত্যন্ত সুন্দর, স্বচ্ছ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে সক্ষম হবে।