• শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০১:০৮ অপরাহ্ন
Headline
লোকসানের মুখে উত্তরের কৃষকেরা: ধানের কম দাম ও সংগ্রহে পদে পদে অনিয়ম চারদেয়ালেও নিরাপত্তাহীনতা: ৬ মাসে ১৮ ঘটনায় ৪৭ খুন আবারও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কথা ভাবছে সরকার যৌন কেলেঙ্কারির ক্ষতিপূরণ দাবি ৯৮ কোটি, অভিনেত্রী পেলেন ৫ কোটি ছাদের অব্যবহৃত পরিসরে বছরে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের মেগা পরিকল্পনা আলোচনায় ইউনাইটেড এর যুবদলে খেলা বাংলাদেশী বংশদ্ভূত মোহাম্মদ নেহাল ৩ মিনিটের যে ব্যায়াম ৯০ মিনিটের ওয়ার্কআউটের চেয়েও বেশি কার্যকর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মস্তিষ্কে মিথ্যা তথ্যের বিষবাষ্প: শত কোটি ডলারের গোপন ইসরায়েলি প্রচার অভিযান হিমালয়ের চূড়ায় গলিত বরফের তাণ্ডব: উজানের আকস্মিক ঢল কি বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদের পদধ্বনি? সৈকতের বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণ: পরিবেশের ঝুঁকি ও আইনি নোটিশের মুখে কাজ স্থগিত

চারদেয়ালেও নিরাপত্তাহীনতা: ৬ মাসে ১৮ ঘটনায় ৪৭ খুন

Reporter Name / ০ Time View
Update : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক সংঘটিত নৃশংস ও রোমহর্ষক পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে চরম আতঙ্ক ও গভীর নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে একসঙ্গে কুপিয়ে বা শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনা। গত ছয় মাসে (২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট) দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অন্তত ১৮টি লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একই পরিবারের একাধিক সদস্যসহ মোট ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। রংপুর ও লক্ষ্মীপুরের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে চারজন করে সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের অপরাধ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং তা সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে বসা মাদকাসক্তি, সম্পদের বিরোধ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যাবলি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আলোচিত ১৮টি ঘটনার মধ্যে ১২টিতে একই পরিবারের দুজন করে, দুটিতে তিনজন করে, তিনটিতে চারজন করে এবং একটি ঘটনায় পাঁচজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু মে মাস ও আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেই ১০টি ঘটনায় একই পরিবারের ২৭ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো, ১৮টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্তত ১৪টিই ঘটেছে ভুক্তভোগীদের নিজেদের বসতবাড়ি, শোবার ঘর বা ফ্ল্যাটের চারদেয়ালের ভেতরে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের মনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ঘরের ভেতরে দরজা বন্ধ করেও কি মানুষ নিরাপদ?

হত্যাকাণ্ডগুলোর ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি ঘটনার পেছনে আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন প্রেক্ষাপট থাকলেও মূল কারণগুলোর মধ্যে স্পষ্ট মিল রয়েছে। রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় মাদক সেবনে বাধার অভিযোগ সামনে এসেছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শাহিনুর বেগম ও তাঁর তিন মেয়েকে দিনের আলোয় ঘরে ঢুকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকের দীর্ঘমেয়াদি মাদকাসক্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাকরি ও বেকারত্ব নিয়ে তর্কের জেরে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে নিহত হয়েছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। এছাড়া সিলেটের রায়নগরে ব্যবসায়ী দম্পতি ও গৃহপরিচারিকাকে হত্যার পেছনে গৃহকর্মীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের দাবির পাশাপাশি পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যান্য ঘটনার মধ্যে মানিকগঞ্জে দেবরের হাতে ভাবি-ভাতিজা, কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী-শাশুড়ি এবং গাজীপুরের কাপাসিয়ায় পাঁচ খুনের মতো বহু নৃশংসতায় জমি, পারিবারিক অশান্তি ও প্রতিশোধপরায়ণতার ছায়া দেখা গেছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে মাদক এখন শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। মাদকের টাকার জন্য এবং বিকৃত মানসিকতার কারণে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। অন্যদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি ও অমীমাংসিত জমির বিরোধ আরেকটি বড় কারণ, যা যুগ যুগ ধরে সহিংসতা তৈরি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, একের পর এক এমন ঘটনা মানুষের মধ্যে গভীর কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। পারিবারিক টানাপোড়েন, প্রভাব খাটানো ও প্রতিশোধের সঙ্গে সঙ্গে মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াই এই ধরনের নৃশংসতাকে উসকে দিচ্ছে।

বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা মানুষকে কোথাও কোথাও নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ হত্যা মামলায় সব আসামি উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়ে যায়। সাজার এই নিম্নহার এবং বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকার কারণে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যও দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের উদ্বেগজনক বৃদ্ধির প্রমাণ দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের (১ হাজার ৯৪৭টি) তুলনায় ১২৯টি বেশি।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, প্রকৃত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেবল রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; একজন নাগরিক যখন নিজের ঘরের ভেতরও নিরাপদ বোধ করেন, তখনই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে ঘটা এসব অপরাধ বন্ধে পুলিশ শুধু আসামি গ্রেপ্তার নয়, বরং ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধেও কাজ করছে। তবে সমাজ বিশ্লেষকদের অভিমত, ঘরে-বাইরে নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে হলে মাদকের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা এবং কার্যকর সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

 

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category