• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০২ অপরাহ্ন
Headline
দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করায় ২ নারী সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ফিলিস্তিন আখ্যান: প্রোপাগান্ডার নতুন ও ভয়ংকর ফ্রন্টে ইসরায়েল দিলারা জামানের বাড়ি দখলের ঘটনা নিয়ে আলোচনা, অভিনেত্রী যা বললেন কাগজে-কলমে শতভাগ কাভারেজের রেকর্ড: বাস্তবে ওয়ার্ডজুড়ে হামের হাহাকার শিক্ষকদের শেষ সম্বল গিলে খেল সিন্ডিকেট: অবসর তহবিলের ৭ হাজার কোটি টাকা হরিলুটের নেপথ্যে আমদানির মোহ ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: জ্বালানির নতুন রোডম্যাপে সংস্কারের অনুপস্থিতি তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালে চড়া মাশুল: অসঙ্গতি জেনেও চীনা কোম্পানির প্রস্তাবে সায় দেওয়ার পথে সরকার তালাবদ্ধ ওটি ও ধুলোজমা যন্ত্রপাতি: দেশের ৮০ শতাংশ উপজেলায় বিকল সরকারি শল্যচিকিৎসা কলকাতার ফুটপাতে রোগীর কান্না: হোটেল সংকটে খোলা আকাশের নিচে বাংলাদেশি ক্যানসার আক্রান্তরা দ্য হিন্দুর এক্সপ্লেইনার: ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে শেখ হাসিনাকে কি ফেরত পাঠাবে ভারত?

কলকাতার ফুটপাতে রোগীর কান্না: হোটেল সংকটে খোলা আকাশের নিচে বাংলাদেশি ক্যানসার আক্রান্তরা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রোগের কঠিন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের কলকাতায় গিয়ে এখন উল্টো চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন শত শত বাংলাদেশি রোগী ও তাদের অসহায় স্বজনেরা। বিশেষ করে জটিল ও মরণব্যাধি ক্যানসারের চিকিৎসায় সেখানে যাওয়া রোগীরা এখন মাথা গোঁজার একটি সামান্য আশ্রয়ের অভাবে কলকাতার রাস্তা ও হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি কলকাতার প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেট সংলগ্ন ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট আবাসন সংকট কোনোভাবেই স্বাভাবিক হচ্ছে না, বরং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বিষাদময় রূপ নিচ্ছে। কলকাতার বিভিন্ন ক্যানসার হাসপাতালের সামনে এখন তল্পিতল্পা ও ওষুধের ফাইলপত্র নিয়ে শত শত মানুষকে খোলা আকাশের নিচে, কখনো বা অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে ভিজে নির্ঘুম রাত কাটাতে দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসা ভিসায় বৈধভাবে কর ও ফি দিয়ে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে এমন চরম দুর্দশায় পড়ার ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে রোগী ও তাদের পরিবারের মাঝে।
এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে গত ১৮ আগস্টের একটি মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড। ওই দিন কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত ‘শিখা ইন’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে আগুন লেগে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুইজন ভারতীয় নাগরিক প্রাণ হারান। এই রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন ও কলকাতা পৌর করপোরেশন। পুরো শহরজুড়ে হোটেল, গেস্ট হাউস ও লজগুলোতে অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে শুরু হয় এক কঠোর ও ব্যাপক অভিযান। পৌর করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র না থাকায় শহরের সাত শতাধিক হোটেল ও গেস্ট হাউসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানকে রাতারাতি সিলগালা বা খালি করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অবশিষ্ট হোটেলগুলোতেও নতুন কোনো অতিথি না তোলার বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়। প্রশাসনের এই আকস্মিক পদক্ষেপে নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য থাকলেও, কোনো ধরনের বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করেই অভিযান চালানোয় শহরজুড়ে সাশ্রয়ী মূল্যে থাকার সব জায়গা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়।
নিরাপত্তা অভিযানের এই খড়্গ সবচেয়ে নির্মমভাবে আঘাত হেনেছে কলকাতার ঠাকুরপুকুর ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের আশপাশের এলাকায়। তুলনামূলকভাবে কম খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ক্যানসার রোগী এই নির্দিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। একইভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও প্রত্যন্ত জেলা থেকেও অনেক অসচ্ছল রোগী এখানে আসেন। কিন্তু হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল চত্বরের সামনের সড়ক ও ফুটপাতে জমেছে অসহায় মানুষের এক বিশাল ভিড়। ক্যানসার এমন একটি জটিল ও স্পর্শকাতর ব্যাধি, যার চিকিৎসায় কেমোথেরাপির মতো তীব্র কষ্টদায়ক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রোগীকে যেতে হয়। কেমো নেওয়ার পর একজন রোগীর জন্য সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ আশ্রয় প্রয়োজন এবং দীর্ঘ দূরত্বের জার্নি করা তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু থাকার মতো কোনো কম দামি গেস্ট হাউস না পাওয়ায় কেমোথেরাপির ক্ষত আর তীব্র শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে অনেক রোগীকেই ফুটপাতের নোংরা কংক্রিটের মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
ফুটপাতে আশ্রয় নেওয়া এক বাংলাদেশি রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, তারা দুই দেশের সরকারকেই নির্ধারিত সব ধরনের রাজস্ব, ভিসা ফি এবং আনুষঙ্গিক খরচ পরিশোধ করে সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে এসেছেন। কিন্তু শহরে আসার পর এমন মারাত্মক আবাসন সংকটের মুখে পড়তে হবে, সে সম্পর্কে তাদের আগে থেকে কোনো সতর্কবার্তাই দেওয়া হয়নি। যদি দুই দেশের ইমিগ্রেশন বা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো রোগীদের আগাম এই বিপদের কথা জানাত, তবে তারা হয়তো বাড়ি থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা করে আসতেন অথবা যাত্রা কিছুদিন পিছিয়ে দিতেন। এমন তথ্যহীনতার কারণে হাসপাতালে একজন নারী স্বজনকে ফুটপাতে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাত কাটাতে হচ্ছে, যেখানে তার রোগী হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন। আশপাশে কোনো পাবলিক টয়লেট বা মৌলিক নাগরিক সুবিধা না থাকায় রোগ নিয়ে আসা নারী ও বয়োবৃদ্ধদের যে কী পরিমাণ অমানবিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
চিকিৎসার পাশাপাশি আবাসনের এই তীব্র বৈষম্য সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। ঠাকুরপুকুর এলাকার হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলো সাধারণত সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে থাকত বলেই রোগীরা এই এলাকায় ভিড় করতেন। কিন্তু বর্তমান অভিযানে সেই সস্তা গেস্ট হাউসগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। বিকল্প হিসেবে যেসব বড় হোটেল খোলা রয়েছে, সেগুলোর দৈনিক ভাড়া তিন থেকে চার হাজার রুপি বা তারও বেশি, যা মাসের পর মাস ধরে চিকিৎসা করানো কোনো সাধারণ পরিবারের পক্ষে বহন করা একেবারেই অসম্ভব। ফলে একপর্যায়ে হোটেল থেকে বিতাড়িত হয়ে এবং পুলিশের কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে ফুটপাতকেই শেষ ভরসা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। একই সংকট মোকাবিলা করছেন ভারতের নিজস্ব নাগরিকেরাও, যারা পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছেন। স্থানীয় হোটেল মালিক জয়ন্ত সাউ আক্ষেপ করে বলেছেন যে, কোনো সাইক্লোন বা বড় দুর্যোগ এলে মানুষকে উদ্ধার করে যেভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, রোগীদের এই জরুরি মানবিক বিপর্যয়ে প্রশাসন কেন তেমন কোনো অস্থায়ী তাঁবু বা আশ্রয় শিবিরের ব্যবস্থা করতে পারল না, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
এমন চরম মানবিক সংকটের মুখে ঠাকুরপুকুর ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিসরে কিছু মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের নিজস্ব জায়গায় স্থান সংকুলান হওয়া অত্যন্ত কঠিন হলেও, রোগীদের চরম দুর্দশা দেখে হাসপাতাল ভবনের ভেতরে প্রায় ৫৫ জন মানুষের জন্য সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই সামান্য উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। কারণ এখনো শতাধিক রোগী ও স্বজন হাসপাতালের বাইরে বৃষ্টি ও খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা করছেন। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই তাদের সামনে একই নিদারুণ প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—আজ রাতে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই কোথায় হবে। একদিকে প্রিয়জনকে হাসপাতালে ফেলে দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, অন্যদিকে চড়া দামের হোটেলে ওঠার আর্থিক সামর্থ্যও তাদের নেই।
পরিস্থিতি কয়েক সপ্তাহ ধরে শোচনীয় আকার ধারণ করার পর অবশেষে টনক নড়েছে বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের। গত বৃহস্পতিবার কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশন থেকে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি জারি করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশি নাগরিকদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, কলকাতায় ভ্রমণের আগে যেন তারা নিশ্চিতভাবে আবাসিক হোটেলের বুকিং সম্পন্ন করেন। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৯ আগস্টের অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শহরের অনিরাপদ হোটেলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিয়ে সেগুলো পুনরায় চালু হতে আরও এক মাসের বেশি সময় লাগতে পারে। তাই বিশেষ করে যারা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশ থেকে রওনা হওয়ার আগে হোটেল বুকিংয়ের বৈধতা, রুমের প্রাপ্যতা এবং তা হাসপাতালের কত কাছে অবস্থিত—এসব বিষয় নিখুঁতভাবে যাচাই না করে দেশ ত্যাগ না করেন। তবে এই দীর্ঘমেয়াদি পরামর্শ ইতোমধ্যে কলকাতায় গিয়ে ফুটপাতে আটকে পড়া শত শত রোগীর তাৎক্ষণিক কষ্ট কমাতে পারছে না। দুই দেশের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে জরুরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত কোনো অস্থায়ী আবাসন বা মানবিক সহযোগিতা নিশ্চিত না করা হলে, চিকিৎসার সন্ধানে যাওয়া এই রোগীদের শারীরিক অবস্থা যেকোনো সময় আরও চরম ও প্রাণঘাতী সংকটে রূপ নিতে পারে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category