জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদ্যমান আর্থিক ক্ষত ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার কোনো টেকসই রূপরেখা ছাড়াই প্রণয়ন করা হয়েছে আগামী পাঁচ বছরের নতুন রোডম্যাপ| ২০৩১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঘোষিত এই কৌশলগত পরিকল্পনায় মূলত গুরুত্ব পেয়েছে নতুন মেগা প্রকল্প নির্মাণ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণ| অথচ বর্তমান বিদ্যুৎ খাতের একক পাইকারি ক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা বিপিডিবি বছরের পর বছর ধরে যে চরম আর্থিক বোঝায় ন্যুব্জ হয়ে আছে, কিংবা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বসিয়ে রাখা সক্ষমতার কারণে যে বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে, তা নিরসনের কার্যকর কোনো পথরেখা এই নথিতে নেই| প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা কাটিয়ে উঠতে জরুরি কাঠামোগত সংস্কারের সুনির্দিষ্ট কৌশল কিংবা সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাদ দিয়ে কেবল নতুন প্রকল্প গ্রহণের দিকেই সরকারের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও সংবেদনশীল ও ব্যয়বহুল ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে|
ঘোষিত কৌশলগত কাঠামোর আওতায় খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে| এর পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহারের অজুহাতে সেখানে ৪০০ মেগাওয়াটের গ্যাসচালিত কেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরও একটি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার| অথচ বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বলছে, কয়লা, এলএনজি কিংবা পারমাণবিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, নির্মাণ সামগ্রী এবং কাঁচামালের জন্য বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে| যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে যেকোনো মুহূর্তে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার চরম ঝুঁকি থেকে যায়| বিগত বছরগুলোতে এলএনজি আমদানির তীব্র খরচ মেটাতে গিয়ে জাতীয় কোষাগার যে চাপের মুখে পড়েছে, তা থেকে শিক্ষা না নিয়ে পুনরায় আমদানিনির্ভর অবকাঠামো বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা|
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় আর্থিক রক্তক্ষরণের জায়গা হলো অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং তার বিপরীতে পরিশোধিত ক্যাপাসিটি চার্জ| বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা যেখানে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট, সেখানে উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি| এই অতিরিক্ত অলস সক্ষমতা বসিয়ে রাখার দায়ে প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই বিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা সরকারের বিশাল ভর্তুকির প্রধান কারণ| ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গুনতে হয়েছে| আগামী পাঁচ বছরে বিদ্যুতের চাহিদা বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে এবং ১৫ শতাংশ সংরক্ষিত মার্জিন যোগ করে ২০৩১ সাল নাগাদ তা ২৫ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও বিদ্যমান সক্ষমতার একটি বড় অংশ এমনিতেই অলস পড়ে থাকবে| এই বাস্তবতায় পুরনো অদক্ষ কেন্দ্রগুলো বন্ধ না করে কিংবা চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন না করে নতুন কয়লা ও পারমাণবিক সক্ষমতা যুক্ত করা হলে আর্থিক দায় আরও বিপজ্জনক রূপ নেবে|
আমদানি ব্যয়ের গতিপ্রকৃতিও জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা বহন করছে| দেশে জ্বালানি আমদানিতে বার্ষিক ব্যয় ইতিমধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে| নতুন দুটি টার্মিনাল চালু হলে এবং আমদানি বাড়ানো হলে এই ব্যয় খুব দ্রুত ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন| পেট্রোবাংলার নিজস্ব হিসাব অনুসারেই, চলতি অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে| এলএনজি আমদানি শুরুর সময় থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যার পেছনে সরকারকে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে| বিদ্যমান দুটি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত বিল পরিশোধ করতেই যেখানে পেট্রোবাংলা হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন টার্মিনালের উচ্চ আর্থিক দায় কীভাবে মেটানো হবে, তার কোনো স্পষ্ট জবাব মিলছে না|
অন্যদিকে স্থানীয় জ্বালানির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিকল্পনার মারাত্মক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে| ভোলা জেলায় ইতিমধ্যে প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট বা টিসিএফ গ্যাসের বিশাল মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে| মাত্র ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় করতে না পারার অজুহাতে সেই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আনার প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে| অথচ সেই গ্যাস ব্যবহার করার নামে দ্বীপ জেলাটিতেই নতুন করে ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে| বিশ্লেষকদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস সরাসরি জাতীয় গ্রিডে নিয়ে আসা গেলে খুলনা ও দক্ষিণাঞ্চলের গ্যাস সংকটে থাকা বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা সম্ভব হতো, যা নতুন প্রকল্পের চেয়ে বহুগুণ সাশ্রয়ী হতো| এর বিপরীতে দেশীয় অনুসন্ধান ও উত্তোলনের বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ না নিয়ে সমুদ্রে এলএনজি টার্মিনাল বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে|
১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রূপপুরে নির্মিত রাশিয়ান অর্থায়নের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসতে পারেনি| এই বিপুল বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ, পরিচালনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জটিলতা এখনো সমাধান হয়নি| এই অমীমাংসিত সংকটের মধ্যেই দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা নেওয়াকে অপরিপক্ব বিবেচনা বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা| বিপিডিবি, পেট্রোবাংলা, পিজিসিবি এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো মান্ধাতার আমলের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে আটকে রয়েছে| সরকার আগামীতে সৌরশক্তি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিলেও এই পুরনো ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক বিকেন্দ্রীভূত ও গ্রিন এনার্জি গ্রিড ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে|
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ বা জিইডির দাবি, স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কটি মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকারমূলক নীতি নির্ধারণের একটি প্রাথমিক রূপরেখা, যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো নিজ নিজ বাস্তবায়ন বা অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে| তবে শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের অভিমত, বিদ্যমান আর্থিক সংকটের মুহূর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই| অতীতে একের পর এক মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার সংস্কারকে অবহেলা করা হয়েছে| ফলে নতুন অবকাঠামোর পেছনে না ছুটে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা অপচয় রোধ করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত জাতীয় অগ্রাধিকার, অন্যথায় এই আমদানিমুখী রোডম্যাপ পুরো জ্বালানি খাতকে এক দীর্ঘমেয়াদি দেনার ফাঁদে বন্দি করে ফেলবে|