• রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন
Headline
লোহিত সাগরের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কী বদলে যাচ্ছে? ভাইভায় বিশেষ নম্বরে কাউকে পাশ করানোর পরিকল্পনা নেই সরকারের: পানিসম্পদমন্ত্রী লংমার্চে উৎসাহিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ‘ফ্যাসিস্টরা’ মিছিল করছে: পাট প্রতিমন্ত্রী সরকারের ৬ মাসে খাদ্য মজুত বেড়েছে দেড় লাখ মেট্রিক টন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫১ শয্যায় উন্নীত হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট সরকারের দুর্নীতির কারণে মানুষ ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছে না: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলা শুরু আজ তিন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ ৫ কর্মকর্তাকে বদলি নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে: রুহুল কবির রিজভী কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের নতুন রূপ: রাজপথে সর্বস্ব লুটের পাশাপাশি বাড়ছে হত্যা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সংযোগ সড়কগুলোতে ছিনতাইকারী চক্রের অপতৎপরতা এখন আর কেবল নগদ অর্থ কিংবা মোবাইল ফোন খোয়ানোর সাধারণ অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই| সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধী চক্রগুলো তাদের কৌশল ও ধরনে এনেছে এক মারাত্মক ও নির্মম পরিবর্তন| এখন আর কেবল অস্ত্রের মুখে ভীতি প্রদর্শন করে মালামাল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে না, বরং সামান্যতম দ্বিধা বা বাধা ছাড়াই পথচারী, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের ওপর নেমে আসছে ধারালো অস্ত্রের আঘাত কিংবা নির্দয় প্রাণঘাতী আক্রমণ| ফলে দিনে-দুপুরে কিংবা রাতের আঁধারে রাজপথে বের হওয়া সাধারণ মানুষের কাছে চলাফেরা করা এক ধরনের জীবনমরণ ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে| আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের দাবি সত্ত্বেও রাজপথে রক্ত ঝরার এই ক্রমবিকাশ নাগরিক নিরাপত্তাকে চরম এক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে|
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক নথি ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে মোট ১৭৮টি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে| তবে অপরাধের এই সরকারি হিসাবকে বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও ভুক্তভোগীরা| তাদের মতে, থানায় গিয়ে মামলার জটিল আইনি প্রক্রিয়া, দীর্ঘসূত্রতা এবং সম্ভাব্য হয়রানি এড়াতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই সরাসরি মামলা করার সাহস বা আগ্রহ পান না| প্রতিকার পাওয়ার ক্ষীণ আশার বিপরীতে বহু ভুক্তভোগী সাধারণ ডায়রি বা জিডি করেই দায়িত্ব শেষ করেন, যার ফলে অসংখ্য সহিংস ছিনতাইয়ের ঘটনা অপরাধের মূল পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্তই হয় না| ফলে পুলিশের খাতায় যে সংখ্যাটি দেখা যাচ্ছে, রাজপথের বাস্তব চিত্র তার চেয়ে বহুগুণে ভয়াবহ ও রক্তাক্ত|
সাম্প্রতিক কিছু নির্মম ঘটনার বিবরণ বিশ্লেষকদের এই আশঙ্কার সত্যতা প্রমাণ করে| গেল ১৮ আগস্ট রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকার এক নম্বর সড়কে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল হোসেন| হঠাৎ করেই একটি রিকশা এসে তাঁর গতিরোধ করে এবং সেখান থেকে দ্রুত নেমে চারজন অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে| কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাঁর ওপর ধারালো চাপাতি দিয়ে অতর্কিত কোপ বসায়| গুরুতর জখম করে তাঁর কাছে থাকা প্রায় ৯৮ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন এবং শেষ সম্বল মোটরসাইকেলটি নিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা| আবুল হোসেন ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরলেও এর মাত্র এগারো দিন পরেই ঘটে আরেক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি| ছিনতাইকারীদের হেঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পিচঢালা রাস্তায় পড়ে করুণভাবে প্রাণ হারান স্কুলশিক্ষিকা রঞ্জিলা পারভীন| এরপর গেল ৮ সেপ্টেম্বর যে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে, তা ছিনতাইয়ের নামে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের এক নৃশংস দলিল| জামালপুর থেকে পৈতৃক জমি বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে রাজধানীতে ফিরছিলেন ইসমাইল হোসেন নামের এক ব্যক্তি| তবে পথিমধ্যে যাত্রীবাহী বাসের চালক ও সহকারীর লোভের শিকার হন তিনি| তাঁর সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে বাসের ভেতরেই তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ ফেলে দেওয়া হয় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশের ওপরে|
চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত অন্তত ২২টি মারাত্মক ও অতি-গুরুতর ছিনতাইয়ের ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অপরাধীদের আচরণে এক ধরনের চরম বেপরোয়া ভাব স্পষ্ট| এসব ঘটনায় শুধু ভয় দেখানো নয়, বরং দেশীয় ধারালো রামদা, চাপাতি থেকে শুরু করে ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার হয়েছে| এমনকি চলন্ত বাস বা আন্তঃনগর ট্রেন থেকে যাত্রীদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার মতো বর্বরোচিত ঘটনাও ঘটছে| প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, অনেক সময় ব্যস্ত সড়কে শত শত মানুষের চোখের সামনে অপরাধীরা কাউকে কুপিয়ে মোটরবাইক বা টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেলেও ভয়ে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পান না| আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ভয় এবং পরবর্তী সময়ে আইনি সুরক্ষা না পাওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ পথচারীরা কেবল নির্বাক দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে বাধ্য হচ্ছেন| ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবিকার তাগিদে বের হওয়া সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এই আতঙ্ক সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নেবে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজ|
নথিপত্র ও পুলিশি নজরদারির মানচিত্র অনুযায়ী, রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকা এখন ছিনতাইকারীদের শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ জোনে পরিণত হয়েছে| এর মধ্যে মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা সেতু সংযোগ সড়ক, ঢাকা উদ্যান ও চাঁদ উদ্যান এলাকা অপরাধীদের অন্যতম নিরাপদ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে| এছাড়া শিল্পাঞ্চল তেজগাঁও, হাতিরঝিলের নির্জন সংযোগ সড়ক, জাতীয় সংসদ ভবনের আশপাশের খোলা পথ, উত্তরা মডেল টাউনের নির্জন সেক্টর, বিমানবন্দর মহাসড়ক এবং জনবহুল যাত্রাবাড়ী এলাকার বেশ কিছু নির্দিষ্ট স্পটে একাধিক ছিনতাইকারী চক্রের নিয়মিত অপতৎপরতা রয়েছে| অপরাধের এই ভূগোলে কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো| আগে সাধারণত অন্ধকার গলিতে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সুযোগ বুঝে পথ রোধ করা হতো, কিন্তু এখন তারা তিন থেকে চারজনের ছোট ছোট দ্রুতগামী দল বা স্কোয়াডে বিভক্ত হয়ে চলাফেরা করে| কখনো সাধারণ যাত্রীর বেশে রিকশায় চড়ে শিকারের পিছু নেয়, আবার কখনো দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ব্যবহার করে পথচারীকে মুহূর্তের মধ্যে জখম করে চোখের পলকে উধাও হয়ে যায়|
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক সতর্কাবস্থান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে| পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে অপরাধের নির্দিষ্ট সময় ও প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা হচ্ছে| নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়মিত টহল টিমের পাশাপাশি মোবাইল টিম, পিকেট টিম ও ফুট প্যাট্রোল বা পদাতিক পুলিশ দল মাঠে কাজ করছে| এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে হঠাৎ করে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজন মোটরসাইকেল ও যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে| যেসকল নির্দিষ্ট স্পটে ঘন ঘন অপরাধ ঘটছে, সেখানে কেন এমনটা হচ্ছে তার পেছনের কারণ পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করছে পুলিশ প্রশাসন|
তবে অপরাধবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল গতানুগতিক টহল আর চেকপোস্ট দিয়ে এই আধুনিক ও হিংস্র অপরাধের শেকড় উপড়ানো সম্ভব নয়| তাদের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, এ ধরনের ছিনতাই ও রক্তাক্ত অপরাধে যারা লিপ্ত থাকে, তাদের সিংহভাগই চিহ্নিত ও ‘দাগি আসামী’| অতীতে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েও তারা জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই চক্রে যোগ দেয় এবং একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটায়| পুলিশের কাছে এই পুরোনো অপরাধীদের বিস্তারিত তালিকা, পরিচয় ও অপরাধের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে| ফলে ঘটনা ঘটার পর সক্রিয় হওয়ার চেয়ে এই দাগি অপরাধীদের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় আটকে রাখা বেশি কার্যকর কৌশল হতে পারে| একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিচ্ছেন যে, অপরাধ দমনে পুলিশ বাহিনীকে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে| এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী, তরুণ সমাজ ও কমিউনিটি পুলিশিংকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে পারলে অপরাধীদের গোপন আস্তানা ও তথ্য দ্রুত উন্মোচিত হবে, যা রাজপথকে সাধারণ মানুষের জন্য রক্তপাতহীন ও নিরাপদ করে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে|
তথ্যসূত্র: দূরবীন নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category