• রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন
Headline
লোহিত সাগরের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কী বদলে যাচ্ছে? ভাইভায় বিশেষ নম্বরে কাউকে পাশ করানোর পরিকল্পনা নেই সরকারের: পানিসম্পদমন্ত্রী লংমার্চে উৎসাহিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ‘ফ্যাসিস্টরা’ মিছিল করছে: পাট প্রতিমন্ত্রী সরকারের ৬ মাসে খাদ্য মজুত বেড়েছে দেড় লাখ মেট্রিক টন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫১ শয্যায় উন্নীত হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট সরকারের দুর্নীতির কারণে মানুষ ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছে না: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলা শুরু আজ তিন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ ৫ কর্মকর্তাকে বদলি নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে: রুহুল কবির রিজভী কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

হাম-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কোথায় গলদ?

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

একবিংশ শতাব্দীর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে বাংলাদেশ আজ এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী মোড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে| যে সংক্রামক ব্যাধিকে কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচির সুবাদে প্রায় নিয়ন্ত্রণে এনে নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রতিরোধযোগ্য হাম আজ দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারি আকারে ফিরে এসেছে| একই সময়ে বর্ষা মৌসুমের চেনা কিন্তু প্রাণঘাতী মশাবাহিত ব্যাধি ডেঙ্গুর বিপজ্জনক উল্লম্ফন যোগ হয়ে পুরো স্বাস্থ্য খাতকে এক চরম দ্বিমুখী বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে| একদিকে নিবিড় পরিচর্যা ও সাধারণ শয্যার অভাবে হাসপাতালের মেঝেতে হামে আক্রান্ত হয়ে ঢলে পড়ছে হাজারো নিষ্পাপ শিশু, অন্যদিকে এডিস মশাবাহিত ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের মৃত্যুর তালিকা| সংক্রামক ব্যাধির এই যুগপৎ আক্রমণ দেশের ভঙ্গুর চিকিৎসা অবকাঠামোকে কেবল বিপর্যস্তই করেনি, বরং সাধারণ পরিবারগুলোর টিকে থাকার লড়াইকে রূপ দিয়েছে চরম এক মানবিক ট্র্যাজেডিতে|
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক হালনাগাদ পরিসংখ্যান এবং বৈশ্বিক মহামারি পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে| ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশব্যাপী হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৮৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে আধুনিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে বিশ হাজারেরও বেশি রোগীর দেহে| সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই স্বল্প সময়ে কেবল হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে এক হাজার ১২ জন রোগীর প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে শতভাগ নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু একশটি| আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (ইউএস-সিডিসি) বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশকে বর্তমানে ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ হাম প্রাদুর্ভাবের হটস্পট’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে| অতীতে কোনো একক মৌসুমে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে একসঙ্গে এক হাজারের বেশি শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর নজির দেখা যায়নি|
অন্যদিকে, মশাঘটিত রোগ ডেঙ্গুর চিত্রটিও কোনো অংশে স্বস্তিদায়ক নয়| বিগত কয়েক বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথমার্ধে মৃত্যুর গতি কিছুটা ধীরগতির মনে হলেও আগস্টের শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সংক্রমণ পুনরায় লাগামছাড়া হয়ে উঠেছে| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের মোট সংখ্যা ৪৯ হাজার ২২০ জনে পৌঁছেছে এবং সরকারি হিসাবে প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১৪১ জনে| গত কয়েক বছরের রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুতে রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা ২০২৪ সালে ছিল ৫৭৫ জন এবং বিগত ২০২৫ সালে তা কমে ৪১৩ জনে নেমে আসে| তবে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে এসে হঠাৎ করেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে| এমনকি একদিনে দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী ভর্তি এবং ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে|
হাম ও ডেঙ্গুর জৈবিক ধরন, সংক্রমণের গতিপথ এবং বাহক সম্পূর্ণ পৃথক হলেও উভয় সংকটের গোড়ায় রয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নীতিগত সমন্বয়হীনতা, সময়োচিত পদক্ষেপের অভাব এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির চরম শৈথিল্য| নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইতোমধ্যে ছয় মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে| একটি রাজনৈতিক রূপান্তরের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরে পাবে| কিন্তু হামের বিস্তার রোধ কিংবা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিতে সেই কাঙ্ক্ষিত সক্রিয়তা দেখা যায়নি| বরং সংকট গভীর হওয়ার পর কেবল অতীত সরকারের ওপর দোষ চাপানোর এক ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে| বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং টিকা সংগ্রহের নীতি পরিবর্তনের কারণে টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছিল—এটি সত্য হলেও, পরবর্তী ছয় মাসে নতুন প্রশাসন কেন প্রতিরোধমূলক বিজ্ঞানভিত্তিক জরুরি পরিকল্পনা নিতে পারল না, সেই প্রশ্ন এখন তীব্র হচ্ছে|
বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য গবেষকদের বিশ্লেষণে হামের এই নিয়ন্ত্রণহীন বিস্ফোরণের পেছনে টিকাদান কর্মসূচির এক মারাত্মক পরিসংখ্যানগত ভুলের চিত্র উঠে এসেছে| গত এপ্রিলে যখন ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, তখন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশু| অথচ মাত্র দুই মাস পর জুনে একই বয়সী শিশুদের জাতীয় ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় দুই কোটি ২৬ লাখ শিশুকে| অর্থাৎ দুটি জাতীয় ক্যাম্পেইনের হিসাবের মধ্যেই প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর বিরাট গরমিল স্পষ্ট ধরা পড়েছে| রোগতত্ত্ববিদদের ধারণা, এই মারাত্মক তথ্যগত ফাঁকের কারণে দেশের অন্তত ৪৬ লাখ শিশু কোনো ধরনের সুরক্ষা টিকা ছাড়াই অরক্ষিত রয়ে গিয়েছিল| আর সেই বাদ পড়া শিশুর দলই পরবর্তীতে ভাইরাসের প্রধান প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়ে সমগ্র দেশে মহামারির আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে| ভুল পরিসংখ্যানের এই প্রশাসনিক খেসারত আজ জীবন দিয়ে শোধ করছে লাখ লাখ অসহায় নিষ্পাপ শিশু|
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. মাহমুদুর রহমান এ বিষয়ে স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন| তাঁর মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে শিশুদের নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান (ইপিআই) কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছিল| বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যারা বয়সের কারণে নিয়মিত টিকার আওতায় আসতে পারে না, তারা হার্ড ইমিউনিটি বা সমষ্টিগত সুরক্ষার অভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে| অতীতে বাংলাদেশে হামের টিকার কভারেজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী ৯৫ শতাংশের ওপরে থাকত, যা দেশকে হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল| কিন্তু সাম্প্রতিক অবহেলা সেই দুই দশকের অর্জনকে চোখের পলকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে|
হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে কম নয়| রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো প্রধান কেন্দ্রগুলোতে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ দ্বিগুণেরও বেশি| এক হাজার ৩৫০ শয্যার হাসপাতালে বর্তমানে দুই হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে, যার একটি বড় অংশই হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশু| শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পেডিয়াট্রিক স্যালাইন ও জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট চিকিৎসকদের হাত-পা বেঁধে ফেলছে| নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই সংকট যেন দ্বিগুণ অভিশাপ হয়ে এসেছে; একদিকে সন্তানকে হামের সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে দিনমজুরি ফেলে হাসপাতালে দৌড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের ঘরে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে|
এই জটিল পরিস্থিতির মুখে সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্বেগ ও কিছুটা তৎপরতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই এই স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আগামী তিন মাসকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন| মশক নিধনের চিরাচরিত ফটোসেশনের বাইরে গিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে তিনি আজ শনিবার দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী বিশেষ ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করছেন| স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন| তিনি উল্লেখ করেন যে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া শূন্য ভাণ্ডারের বিপরীতে মাত্র ২১ দিনের মধ্যে এক কোটি ৮৫ লাখ শিশুর জন্য টিকা সংগ্রহ করে বিতরণ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ১৪ লাখ শিশুকে ‘মপ-আপ’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতায় আনা হয়েছে| আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় দেশব্যাপী নতুন টিকাদান রাউন্ড শুরু হচ্ছে, যার জন্য প্রয়োজনীয় অবশিষ্ট ভ্যাকসিন ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ইউনিসেফের মাধ্যমে দেশে পৌঁছাবে| এছাড়া ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে উপজেলা ও প্রান্তিক হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত এবং চিকিৎসকদের জরুরি গাইডলাইন দেওয়ার কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়|
তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজ মনে করছে, কেবল মন্ত্রীদের বক্তৃতা আর সাময়িক বিশেষ ক্যাম্পেইনে এই জাতীয় মহামারি ঠেকানো সম্ভব নয়| ডেঙ্গু ও হামের মতো দ্বৈত প্রাদুর্ভাবকে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই; কারণ এগুলো পুরোপুরি মানুষের অবহেলা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ফসল| সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংসদে রয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক সংসদ সদস্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে লক্ষ লক্ষ নিবেদিত কর্মী| এই বিপুল রাজনৈতিক শক্তিকে কেবল রাজপথ বা ভোটের মাঠে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি প্রতিটি এলাকায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকাকেন্দ্রে আনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির কাজে নামানো যায়, তবেই এই মহাবিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব| অন্যথায়, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি ও স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে মৃত্যুর এই অনাকাঙ্ক্ষিত মিছিল আগামী দিনগুলোতে দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে|
তথ্যসূত্র: দৈনিক ইনকিলাব


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category