রাজধানীর গুলশানের মতো অতি স্পর্শকাতর ও কূটনৈতিক সুরক্ষা বলয়ভুক্ত এলাকায় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের আকস্মিক ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে| সন্ত্রাস ও গণহত্যার দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া একটি রাজনৈতিক শক্তির এমন প্রকাশ্য তৎপরতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে| এই ঘটনায় ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতৃত্ব গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন| তাঁদের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ—প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্বে অবহেলা ও আগাম সতর্কতার শৈথিল্য না থাকলে এ ধরনের চরম ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসূচির কোনো সুযোগ তৈরি হতে পারত না| তবে এই প্রকাশ্য প্রশাসনিক ব্যর্থতার আলোচনার পাশাপাশি দলটির অভ্যন্তরেও নতুন করে শুরু হয়েছে আত্মবিশ্লেষণ| সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় তৃণমূল পর্যায়ে তৈরি হওয়া সাংগঠনিক শূন্যতা, নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের আশঙ্কা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে এক গভীর রাজনৈতিক টানাপড়েন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে|
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত শুক্রবার দুপুরে, যখন রাজধানীর গুলশান-৩ নম্বর সড়কের একটি গলিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মী হঠাৎ জড়ো হয়ে মিছিলের চেষ্টা চালান| স্পর্শকাতর কূটনৈতিক এলাকায় এই ঝটিকা কর্মসূচি চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বাধা দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে| পুলিশের দাবি অনুযায়ী, মিছিলকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুটি রাবার বুলেট ছোড়া হয় এবং এতে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়| পরবর্তীতে গুলশান থানা পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা থেকে মিছিলে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করে|
তবে এই গ্রেপ্তার তৎপরতা দিয়ে মূল নিরাপত্তা ঝুঁকির বিতর্ক ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে না| বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন| তাঁর মতে, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যথাসময়ে সজাগ ও তৎপর থাকলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কোনোভাবেই ঘটতে পারত না| গুলশান একটি আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষিত ও কূটনৈতিক এলাকা, যেখানে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতেও বিএনপি কখনো কর্মসূচি নিয়ে প্রবেশ করেনি; সর্বোচ্চ দুই নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত সীমারেখা মেনে চলেছে| এমন একটি সুরক্ষিত এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের অনুপ্রবেশ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রকাশ্য হুমকি| তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আদালতে যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা রয়েছে এবং যাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেই ফ্যাসিবাদের যদি পুনরায় উত্থান ঘটে তবে দেশের কোনো নাগরিকই নিরাপদ থাকবে না| একই সঙ্গে অরাজক শক্তি যাতে সুযোগ না পায়, সেজন্য জাতীয় স্বার্থে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি|
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরদারির ঘাটতি নিয়ে আরও তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন দলটির অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা| বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু সাফ জানিয়েছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক শূন্যতার ফল নয়, বরং এটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সরাসরি ব্যর্থতা| দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বিষয়টিকে সামগ্রিক জননিরাপত্তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| তিনি মনে করেন, প্রশাসনকে কর্মনিষ্ঠ ও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে বিএনপির বিশাল সাংগঠনিক শক্তিকেও সক্রিয় রাখতে হবে| বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রশ্ন তুলেছেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল এমন জমায়েত করার সাহস পায়; যার জন্য সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত| ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের পক্ষ থেকেও গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানানো হয়েছে| তাদের অভিযোগ, অতীতে এ ধরনের যেকোনো অপতৎপরতার তথ্য গোয়েন্দা সূত্রে আগেভাগে পাওয়া গেলেও এবার সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে রাখা হয়েছে, যা এক গভীর রহস্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে|
প্রশাসনিক দুর্বলতার এই দৃশ্যপটের পাশাপাশি আরেকটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চক্রান্তের দিকে ইঙ্গিত করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা| সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে নতুন একটি বয়ান তৈরির সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার মূল সুর হলো ‘আগেই ভালো ছিলাম’| পতিত স্বৈরাচারের শাসনামলের দীর্ঘ গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং বিরোধী মতের ওপর অবর্ণনীয় দমন-পীড়নের ইতিহাস আড়াল করে কৃত্রিম এই বয়ান ছড়ানো হচ্ছে| প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন এই অপপ্রচারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, যারা এই ধরনের বক্তব্য প্রচার করছে তারা মূলত ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা ছাড়া আর কিছুই নয়| বর্তমান সরকার যখন জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও চলমান বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের মতো জাতীয় সংকটগুলো আন্তরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করছে, তখন সংকটকে পুঁজি করে অতীতের গুম-খুনের শাসনব্যবস্থাকে জাস্টিফাই করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে| তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদে যেখানে বিরোধী দলও সরকারের আন্তরিকতার কথা বলছে, সেখানে যারা ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বলছে তারা কি প্রকারান্তরে হাসিনার খুন-খারাবির আমলকেই সমর্থন করছে?
তবে সংকটের শিকড় কেবল বাইরের অপপ্রচার বা প্রশাসনিক ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নয়; বিএনপির তৃণমূল থেকে খোদ নিজেদের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামোর দুর্বলতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে| সরকার পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে আসায় দলটির কেন্দ্রীয় ও দায়িত্বশীল বহু পরিচিত নেতা এখন আর মাঠের রাজনীতিতে আগের মতো সার্বক্ষণিক সময় দিতে পারছেন না| ফলে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক যোগাযোগ, নেতাকর্মীদের পারস্পরিক সমন্বয় ও স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতে এক ধরনের স্থবিরতা ও ঢিলেঢালা ভাব তৈরি হয়েছে| এই সাংগঠনিক শূন্যতার সুযোগে নিষিদ্ধ সংগঠনের সুবিধাবাদী অংশ ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী চক্র নানা কায়দায় মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে| আরও আশঙ্কাজনক অভিযোগ হলো, অতীতে আওয়ামী লীগের আমলে বিভিন্ন সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত ব্যক্তিরা সরাসরি রাজনৈতিক মঞ্চে না এলেও ব্যবসা-বাণিজ্য, পেশাজীবী সংগঠন ও সামাজিক উদ্যোগের আড়ালে নিজেদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চালাচ্ছেন| এমনকি বিএনপির কিছু স্থানীয় নেতার সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সমীকরণ বা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক আঁতাত তৈরির অভিযোগও তৃণমূলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করছে|
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিএনপির হাইকমান্ড অবশ্য বিষয়টিকে অত্যন্ত কঠোর নজরদারিতে রেখেছে| দলের কোনো স্তরের নেতা বা কর্মী অতীতে নিপীড়ন চালানো কোনো বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বা রাজনৈতিক সখ্য গড়ে তুলছেন কি না, তা যাচাই করতে দলের বিশেষ টিমের পাশাপাশি নিরপেক্ষ গোয়েন্দা চ্যানেলের মাধ্যমেও সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে| হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট বার্তা রয়েছে—কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের অশুভ আপসের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে সাংগঠনিক শাস্তির পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে| দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন যে, আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় ত্রুটি, বিশৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের শূন্যতাগুলো দ্রুত দূর করে সংগঠনকে ইস্পাতকঠিন রূপ দেওয়া হবে|
চূড়ান্ত বিচারে, নিষিদ্ধ শক্তির এই আকস্মিক মাথাচাড়া দেওয়া প্রমাণ করে যে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর অন্ধ নির্ভরতা ক্ষমতাসীন দলের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে| ২৪ ঘণ্টার জন্য বর্গমাইলের পর বর্গমাইল এলাকা পাহারা দেওয়া কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়; তার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের গোয়েন্দা সংস্থাকে নিরপেক্ষ ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে| একই সাথে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেকার অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন ও অহেতুক সংঘাত পরিহার করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য রক্ষা করা এখন সময়ের প্রধান দাবি| রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে প্রশাসনকে যেমন তার শৈথিল্য ঝেড়ে ফেলে শতভাগ সতর্ক হতে হবে, তেমনি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপিকেও তাদের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক ত্রুটি সারিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ রাখতে হবে—অন্যথায় প্রশাসনিক অসতর্কতা ও রাজনৈতিক অসচেতনতার ফাঁক গলে অরাজক শক্তির পুনরুত্থানের ঝুঁকি থেকেই যাবে|