• শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৮ অপরাহ্ন

সৌদি-হুথি সংঘাত: রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ বাড়ছে

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে গত ছয় মাস ধরে চলা অস্থিরতা এখন সম্পূর্ণ নতুন ও ভয়ংকর এক রূপ ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ইয়েমেন ফ্রন্টে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরাসরি এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনে সৌদি জোটের বিমান হামলার জবাবে সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে একের পর এক বিধ্বংসী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে হুথিরা। লোহিত সাগরের উপকূল এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় এই সংঘাতের পরিধি ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধাবস্থার সরাসরি ও বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। কারণ, সৌদি আরব কেবল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের প্রধান উৎসই নয়, বরং দেশের জ্বালানি তেলের অন্যতম বৃহৎ সরবরাহকারীও। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সৌদি আরবের প্রতিশ্রুত বিশাল বিনিয়োগ—সবকিছুই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, সৌদি আরবের ওপর আমাদের অর্থনীতি কতটা গভীরভাবে নির্ভরশীল। বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী প্রবাসী অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন কর্মী সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন, যা ওই বছর বিদেশ যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এছাড়া চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আরও ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন কর্মী দেশটিতে গেছেন। রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রেও সৌদি আরব সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের শুধু জুলাই মাসেই ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। কিন্তু চলমান এই যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের নির্মাণ, সেবা ও অন্যান্য শ্রমঘন খাতে বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলোর গতি ধীর হয়ে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে। এতে নতুন কর্মী নিয়োগ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিকের আয় ও কাজের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী বাংলাদেশীরা চাকরি হারাতে পারেন, যার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রবল চাপ তৈরি হবে। কভিড মহামারির সময়কার পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হলে অনেক প্রবাসীকে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হতে পারে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
সংঘাতের কারণে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইতিমধ্যে বেশ নাজুক হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি হুথি বিদ্রোহীরা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত, আবহা, নাজরান ও জিজান শহরের পাশাপাশি সৌদি আরামকোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। জরুরি সতর্কতার সাইরেন বাজানো হয়েছে মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফের মতো শহরগুলোতেও। মক্কা নগরীর কাছাকাছি এলাকায় একটি ড্রোন ধ্বংসের ঘটনা প্রবাসীদের মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। মক্কায় বসবাসরত বাংলাদেশীরা জানিয়েছেন, সতর্কতামূলক সাইরেন শোনার পর তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। জেদ্দায় ব্যবসা করা ফেনীর নুরুল আফসারের মতো প্রবাসী ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কভিড-পরবর্তী স্থবিরতা কাটিয়ে ব্যবসা যখন সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ক্রেতা সমাগম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। দোকান ভাড়া ও কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন মেটানোই এখন তাদের জন্য একটি টিকে থাকার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রমবাজারের এই সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের বার্ষিক ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ আসে সৌদি আরব থেকে। দেশে পরিশোধনের জন্য আমদানি করা ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেলের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টনই আসে সৌদি আরামকোর ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ থেকে। চলমান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে ইউরোপের অনেক দেশে তেল সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে রিয়াদ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন আপাতত দেশে কোনো জ্বালানি সংকটের শঙ্কা না দেখলেও, যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার বিশাল ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাব এল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং পরিবহন ব্যয় আকাশচুম্বী হতে পারে, যা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়কে ধারণাতীতভাবে বাড়িয়ে দেবে।
এই প্রলম্বিত যুদ্ধের কারণে স্বয়ং সৌদি আরবের অর্থনীতিও এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও তেল পরিবহনে সীমাবদ্ধতার কারণে দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন গত ফেব্রুয়ারির দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল থেকে আগস্টে এসে মাত্র ৬২ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া ২০২৬ সালের বাজেটে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থনীতির এই ভগ্নদশার কারণে সৌদি আরবে বাংলাদেশের জন্য প্রতিশ্রুত মেগা বিনিয়োগগুলোও এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর করা সৌদি প্রতিনিধি দল রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল বে টার্মিনাল নির্মাণসহ বন্দর খাতে মোট ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের যে আগ্রহ দেখিয়েছিল, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সেই বিশাল বিনিয়োগের বাস্তবায়ন এখন পিছিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্যের চাকাও যুদ্ধের কারণে শ্লথ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বর্তমান পরিস্থিতির আশু কোনো উন্নতির সম্ভাবনা দেখছেন না। কেজ বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মনে করেন, হুথিদের মোকাবেলায় সৌদি আরব এখন বেশ কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি এই সংঘাতে জড়াতে চাইছে না। এর সুযোগ নিয়ে হুথিরা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির সতর্ক করে বলেছেন যে, সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটলে শুধু সৌদি আরব নয়, ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হলো, দক্ষিণাঞ্চলের আবহা, নাজরান ও জিজানের মতো শহরগুলোতে, যেখানে হুথিদের হামলার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি, সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কৃষি ও ছোট ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে লাখো বাংলাদেশীকে এসব অঞ্চল থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কিংবা চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশে ফেরত পাঠানোর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমনটা ঘটলে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য পরিবার যেমন নিঃস্ব হবে, তেমনি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

 

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category