রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে হঠাৎ করেই উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে এসেছে| আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় তদন্ত ও গোয়েন্দা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত কয়েক দিনে রাজধানীর বুকে যেসব যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, তার একটি বড় অংশের মালিক মূলত সদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী নেতারা| রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পুলিশের মতে, নিজেদের মালিকানাধীন বাসে আগুন দিয়ে এই কায়েমি গোষ্ঠী এক ঢিলে একাধিক পাখি শিকারের এক ভয়ংকর অপচেষ্টা চালাচ্ছে| একদিকে যেমন নাশকতা সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি আওয়ামী লীগের গোপন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং নিজেদের অসহায় প্রমাণ করে জনগণের ভুয়া সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা চলছে| এর পাশাপাশি নিজেদের পোড়া বাসের বিপরীতে বিমা কোম্পানির কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণের টাকা দাবি করাও তাদের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক লক্ষ্য| তবে অপরাধীদের এই আত্মঘাতী কৌশল খুব বেশি দিন গোপন থাকেনি| আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতিমধ্যেই এই নাশকতার মাস্টারমাইন্ড, মূল নির্দেশদাতা এবং নেপথ্যের বিপুল অর্থ জোগানদাতাদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে|
নাশকতা বাস্তবায়নের জন্য নিষিদ্ধ এই রাজনৈতিক দলটি রাজধানীর ভৌগোলিক অবস্থানকে অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করে ‘হিট অ্যান্ড রান’ বা চোরাগোপ্তা হামলার কৌশল অবলম্বন করছে| পুলিশের পরিভাষায় ‘হিট অ্যান্ড রান’ হলো অতর্কিতভাবে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানোর আগেই দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পলায়ন করা| বর্তমানে এই নিষিদ্ধ ঘোষিত গোষ্ঠীটি তাদের অপতৎপরতা চালাতে এই পলায়নপর কৌশলটিই ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে| তবে তাদের এই গোপন পরিকল্পনা ও কার্যপদ্ধতি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তা বাহিনী নড়েচড়ে বসেছে এবং অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে| নাশকতা সমূলে উৎপাটন এবং প্রতিরোধ করতে রাজধানীতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নিয়মিত বাহিনী, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট একযোগে মাঠে নেমে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে| শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, বরং এই নাশকতার ঢেউ যেন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য দেশের সব বিভাগ ও জেলা পর্যায়েও নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে|
গোয়েন্দা সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আওয়ামীপন্থি এই চক্রের নাশকতার নতুন ধরন, পরিবর্তিত কৌশল এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে অত্যন্ত গোপনে এবং সফলভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে| এই সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে এবং বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিম অংশের স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে| নাশকতাকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হওয়া রাজধানীর পূর্ব অঞ্চলের এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, বাসাবো এবং খিলগাঁও| অন্যদিকে, পশ্চিম অঞ্চলে তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে গাবতলী, মোহাম্মদপুর, বসিলাসহ মিরপুরের শেষ প্রান্তের এলাকাগুলোকে| অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই এসব এলাকায় জড়ো হয়ে নাশকতা ঘটাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে এবং ড্রোন ওড়ানোর মাধ্যমে আকাশপথের নজরদারি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে|
সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এই দলের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে প্রথমে ককটেল নিক্ষেপের মাধ্যমে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে তাদের মহড়া শুরু করে| সাধারণ মানুষ ভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে গেলে তারা টার্গেট করা বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়| ছোট আকারের এই বাস পোড়ানোর পাশাপাশি বড় ধরনের জাতীয় নাশকতা সৃষ্টির ব্লুপ্রিন্টের অংশ হিসাবে গত রোববার রাতে তারা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে একটি ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেয়| গোয়েন্দা তথ্য বলছে, তাদের এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার চূড়ান্ত তালিকায় আরও রয়েছে স্বপ্নের মেট্রোরেলসহ সারা দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কেপিআইভুক্ত (কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ| এমন আশঙ্কাজনক তথ্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সারা দেশে অবস্থিত সব কেপিআই প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ মাত্রার নিরাপত্তা জোরদারের জন্য জরুরি ও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে|
এই সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন| তিনি জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পর ইতিমধ্যেই রাজধানীর সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই এলাকাগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ ও প্রশিক্ষিত টিম মোতায়েন করা হয়েছে| এসব স্থাপনার একটি তালিকা তৈরি করে পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরাসরি তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে| নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অর্থ জোগান ও ইন্ধন দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ওই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতারা বর্তমানে দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করছেন| বিদেশের সেই নিরাপদ আস্তানা থেকেই তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের ভেতরের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং হুন্ডির মাধ্যমে নাশকতার অর্থ পাঠাচ্ছেন| মূলত তাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশেই দেশে এই অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা তৈরির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে| তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বসে নেই, তারা ইতিমধ্যে এই অর্থ জোগানদাতা ও মূল নির্দেশদাতাদের সম্পূর্ণ তথ্যভাণ্ডার হাতে পেয়েছে| অর্থের জোগানদাতা এবং ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন|
পুলিশের অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে যেসব যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তার একটি বড় অংশই আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ী বা সরাসরি দলীয় নেতাকর্মীদের মালিকানাধীন গণপরিবহণ| নিজেদের বাসে এভাবে আগুন দেওয়াটা তাদের একটি অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত চাল| এর মাধ্যমে একদিকে যেমন তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর মূল অপরাধীদের থেকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছে, ঠিক অন্যদিকে তেমনি সাধারণ জনগণের সহানুভূতি আদায় করে সরকারের ওপর ব্যর্থতার দায় চাপানোর এক জঘন্য অপকৌশল হাতে নিয়েছে| এছাড়া এর নেপথ্যে রয়েছে পরিবহণ খাতে একটি কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি করে দেশের রাজপথ পুরোপুরি অচল করার এক গভীর রাজনৈতিক পাঁয়তারা| একই সঙ্গে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করার হীন উদ্দেশ্যে আওয়ামী চক্র সেখানেও আগুন দিচ্ছে এবং ককটেল ফাটাচ্ছে|
রেলপথের নিরাপত্তা ও সাম্প্রতিক নাশকতার বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ইনচার্জ) ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন যে, রেলস্টেশনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ ঘটনার পরপরই সারা দেশে রেলপথ এবং সমস্ত স্টেশনে নিরাপত্তাব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে জোরদার করা হয়েছে| গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও সাইমুন নামের দুই দুষ্কৃতকারীকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ| তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, গ্রেফতারকৃত রায়হান বাংলাদেশ রেলওয়ের কমলাপুর রেলস্টেশনের এমওডি শাখায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসাবে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন| এর পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি সদ্য নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন| অন্যদিকে, তার সহযোগী সাইমুনও শাহজাহানপুর থানা এলাকায় যুবলীগের একজন অত্যন্ত সক্রিয় ও চিহ্নিত কর্মী| এই দুই রাজনৈতিক সন্ত্রাসীর দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম ও বিস্তারিত পরিচয় পুলিশের হাতে এসেছে| যাদের নাম এই নাশকতায় এসেছে, তাদের প্রত্যেককে গ্রেফতারের জন্য চিরুনি অভিযান চলছে| ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান আরও জানান, রোববার রাতে ট্রেনে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই একটি আনুষ্ঠানিক মামলা রুজু হয়েছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ সহায়তায় এই ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে|
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম এই নাশকতার ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন| তিনি বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহণে আগুন, ককটেল নিক্ষেপ ও নাশকতার মূল ও একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সাধারণ জনমনে সীমাহীন আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সরকার যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ—এমন একটি ভিত্তিহীন চিত্র বহির্বিশ্বের কাছে ফুটিয়ে তোলা| ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম সীমানায় নাশকতার আধিক্য প্রসঙ্গে এই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এই নির্দিষ্ট এলাকাগুলো ঢাকার প্রধান প্রবেশদ্বার বা প্রান্তিক সীমানা হওয়ায় অপরাধীরা খুব সহজেই অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত শহর থেকে বের হয়ে যেতে বা আশপাশের জেলাগুলোতে পালিয়ে যেতে পারে| এসব এলাকায় জনসংখ্যার অত্যন্ত ঘনবসতি রয়েছে এবং মূলত নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের বসবাস এখানে বেশি| এই জনঘনত্ব অপরাধীদের খুব সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে এবং গোপন আস্তানা হিসাবে এসব এলাকা ব্যবহারের এক বিশাল সুবিধা প্রদান করে| তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আরও বলেন, মিরপুর বা পল্লবী রুটের বাসগুলোতে সাধারণত চলাচলের সময় মাত্রাতিরিক্ত গাদাগাদি বা যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে, যা রাজধানীতে চলাচলকারী অন্যান্য যেকোনো বাসের তুলনায় অনেক বেশি| গণপরিবহণের এই অতিরিক্ত ভিড়ের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা খুব সহজেই সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে বাসে উঠে নাশকতামূলক কাজ করে মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের ভেতর সটকে পড়তে পারে| অপরাধীদের এই অভিনব কৌশলটির দিকেও ডিবির অত্যন্ত কড়া ও তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন|