দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যখন খাদের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ২৫টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে কেবল একটি চরম আত্মঘাতী পদক্ষেপ হিসেবেই আখ্যায়িত করা যায়। একদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রার ভয়াবহ সংকট এবং ডলারের তীব্র আকাল, অন্যদিকে পরাশক্তির মন জুগিয়ে চলার এক নির্লজ্জ রাজনৈতিক আপস আজ জাতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ একটি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত। গোটা বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম এখন ওপরের সারিতে উঠে এসেছে এবং ঋণের বিশাল বোঝায় দেশের প্রতিটি নাগরিক যখন দিশেহারা, তখন এই ধরনের বিলাসী ও সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা সাধারণ মানুষের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি প্রয়োজনীয় ডলারের অভাবে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ব্যাংকে সাধারণ ঋণপত্র বা এলসি পর্যন্ত খুলতে পারছে না। এলসি খুলতে না পারার এই নিদারুণ অজুহাতে সরকার বারবার দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে এবং পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষিখাতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ সেই একই সরকার যখন আমেরিকার কাছ থেকে পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকার বিলাসবহুল উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে, তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং নীতিনির্ধারকদের মানসিকতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
উড়োজাহাজ কেনার এই সুবিশাল আয়োজনের গভীরে তাকালে খুব সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, এটি আসলে দেশের এভিয়েশন খাতের কোনো স্বাভাবিক উন্নয়ন বা ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের অংশ নয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত বর্তমান প্রশাসন মূলত একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভূরাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই বিপুল অঙ্কের কেনাকাটায় মেতেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুগে যুগে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের নিজস্ব কৌশলগত এজেন্ডা চাপিয়ে দিয়ে দুর্বল সরকারগুলোকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করে আসছে। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় পশ্চিমাদের সম্ভাব্য সব ধরনের চাপ, রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং ক্ষমতার পালাবদল-পরবর্তী নানামুখী বৈশ্বিক সংকট এড়াতেই মূলত আমেরিকার হাতে এই পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকার বিশাল নজরানা তুলে দেওয়া হচ্ছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, বোয়িং কেনার এই বিশাল চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও সমর্থন কিনে নেওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যার অর্থনৈতিক মাশুল গুনতে হবে এ দেশের সাধারণ জনগণকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই জটিল দাবা খেলায় কেবল একটি পরাশক্তিকে খুশি করেই পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ বৈশ্বিক অস্ত্র ও এভিয়েশন বাণিজ্যে পশ্চিমা মিত্রদের ভেতরেই রয়েছে তীব্র ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব।
আমেরিকাকে বোয়িংয়ের বিশাল অর্ডার দিয়ে সন্তুষ্ট করার এই পদক্ষেপের পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। বোয়িংয়ের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের এয়ারবাসকে এই কেনাকাটার বাইরে রাখায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্যত বাংলাদেশের ওপর প্রচ্ছন্ন কিন্তু ভয়াবহ এক হুমকি দিয়ে বসেছে। তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছে যে, ফ্রান্সের কাছ থেকে যদি কমপক্ষে ১০টি এয়ারবাস কেনা না হয়, তবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে নানাবিধ অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হবে। এর মানে হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের পুরো রপ্তানিমুখী খাতটির গলা টিপে ধরার এক ভয়ংকর চক্রান্ত শুরু করেছে। এর সহজ এবং মর্মান্তিক অর্থ হলো, বাংলাদেশের জাতীয় বিমান সংস্থার কয়টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন, তা এখন আর ঢাকা নিজে নির্ধারণ করতে পারছে না। যারা উড়োজাহাজ বিক্রি করবে, সেই পরাক্রমশালী আমেরিকা ও ফ্রান্সই এখন ঠিক করে দিচ্ছে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের আকার ঠিক কেমন হবে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবমাননা আর কিছুই হতে পারে না। পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশ আজ নিছক একটি ফুটবল বা দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের সুবিধামতো চাল চালছে আর এ দেশের মানুষ কেবল সাইডলাইনে বসে সেই নীরব দর্শক হয়ে দেখছে। ভবিষ্যতে এই পরাশক্তিগুলোই হয়তো ঠিক করে দেবে বাংলাদেশ কার কাছ থেকে গম কিনবে, কার কাছ থেকে এলএনজি কিনবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কার সাথে সম্পর্ক রাখবে আর কার সাথে রাখবে না।
যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাঁধে এই বিশাল সংখ্যক উড়োজাহাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে, সেই প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার চিত্র চরম হতাশাজনক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। অত্যন্ত নির্মম সত্য হলো, এত বড় একটি আধুনিক ফ্লিট বা বিমান বহর পরিচালনা করার মতো বিন্দুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা, জনবল বা কারিগরি সক্ষমতা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নেই। বর্তমানে বিমানের বহরে থাকা মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজই তারা তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় ও লাভজনকভাবে পরিচালনা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পাঠানো হলেও বিমানের চরম মার্কেটিং দুর্বলতা, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে জাপান কিংবা রোমের মতো অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও লাভজনক রুটগুলোতেও দিনের পর দিন ২৩ শতাংশের বেশি আসন সম্পূর্ণ খালি থাকছে। মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোতে যাওয়ার সময় প্রবাসী শ্রমিকদের ভিড়ে বিমানের আসন কিছুটা পূর্ণ থাকলেও, ফেরার সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত যাত্রীর দেখা মেলে না। বিমানের পুরো ব্যবস্থাপনা এখনো অত্যন্ত সেকেলে এবং মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণায় পরিচালিত হচ্ছে। এমন একটি ভঙ্গুর, অদক্ষ ও অপেশাদার কাঠামোর ভেতরে একলাফে যদি এত বিশাল সংখ্যক অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ৭৩৭ আর্ট ম্যাক্স এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্ম দেবে। এই অত্যাধুনিক উড়োজাহাজগুলো চালানোর জন্য যে মানের দক্ষ পাইলট, কেবিন ক্রু এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণকারী কারিগরি জনবল প্রয়োজন, বিমানের বর্তমান কাঠামোতে তার চরম আকাল রয়েছে। বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কাস্টমার সার্ভিসের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এতটাই জঘন্য যে, উপযুক্ত জনবল ও ব্যবস্থাপনার অভাবে হাজার কোটি টাকার এই অত্যাধুনিক বিমানগুলো হয়তো দিনের পর দিন কেবল হ্যাঙ্গারেই অলস বসে থাকবে। কিন্তু বিমানগুলো উড়ুক বা না উড়ুক, প্রতি মাসের শেষে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে এই বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ঠিকই কেটে নেওয়া হতে থাকবে।
উড়োজাহাজ কেনার এই মহোৎসবকে সাধারণ মানুষের চোখে জায়েজ করার জন্য স্বার্থান্বেষী কিছু মহল হয়তো এমন একটি মুখরোচক অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করবে যে, এই বিপুল সংখ্যক বিমান এনে রাজধানী ঢাকাকে পুরো অঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হাব বানানো হবে। বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি নির্জলা মিথ্যাচার এবং নিছক এক আকাশকুসুম কল্পনা বা ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিছুই নয়। যেকোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একটি সফল ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রথম ও প্রধান যে যোগ্যতাটি লাগে, তা হলো ওই দেশ বা শহরের ভৌগোলিক অবস্থানকে একটি বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দু বা ক্রসরোড পজিশনে থাকতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দোহা কিংবা দুবাই যেভাবে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে পুরো দুনিয়ার আকাশপথের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, ঢাকা সে তুলনায় আঞ্চলিক মানচিত্রে একটি প্রান্তিক স্টপেজ মাত্র। ভৌগোলিক এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ট্রানজিট যাত্রীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিখুঁত ফ্লাইট শিডিউল, একাধিক গন্তব্যের নিয়মিত কানেক্টিং ফ্লাইট এবং বিশ্বমানের টার্মিনাল ও লাউঞ্জ সুবিধা। আমাদের দেশে বিমানের কোনো একটি নির্দিষ্ট ফ্লাইট ঠিক সময়ে ছাড়বে, এমন গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষমতা স্বয়ং বিমান কর্তৃপক্ষেরও নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কানেক্টিং ফ্লাইটের অপেক্ষায় অব্যবস্থাপনায় ভরপুর ঢাকা বিমানবন্দরে বসে থাকার মতো আহম্মক আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমাদের একেবারে পাশেই যেখানে দুবাই, ব্যাংকক কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দানবীয় সব আন্তর্জাতিক মেগা হাব অত্যন্ত সফলতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করছে, সেখানে বিমানের এই চরম অপেশাদার ও ভঙ্গুর ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ট্রানজিট হাব হওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখা সম্পূর্ণ পাগলামি ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশ কোনোভাবেই হাব হওয়ার এই কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক যোগ্যতার ধারেকাছেও যেতে পারবে না।
উড়োজাহাজ কেনার এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে বিদেশের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাংলাদেশকে একটি দুধেল গাভীতে পরিণত করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। ক্ষমতাবানরা নিজেদের রাজনৈতিক মসনদ টিকিয়ে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ও সম্পদ অবলীলায় বিদেশি পরাশক্তির হাতে তুলে দিচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে যেভাবে এ দেশের সাধারণ মানুষের রক্ত পানি করা ঘাম ও শ্রমের ফসল বিদেশে পাচার হয়ে যেত, আজকের প্রেক্ষাপটও ঠিক তেমনই নব্য উপনিবেশবাদী রূপ ধারণ করেছে। পার্থক্য শুধু এইটুকুই যে, এখন আর সরাসরি ব্রিটিশরা নেই, বরং দেশীয় শাসকরাই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দেশের হতদরিদ্র মানুষের কষ্ট দূর করার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে তারা পরাশক্তির সাথে যেই ভয়ংকর ভূরাজনৈতিক জুয়া খেলায় মেতে উঠেছেন, তার মাসুল আগামী শত শত বছর ধরে এ দেশের সাধারণ জনগণকেই গুনে যেতে হবে। পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকার এই ঋণের বিশাল বোঝা শেষ পর্যন্ত ওই গরিব কৃষকের এবং ঘাম ঝরানো পোশাক শ্রমিকের কাঁধেই চাপবে, যা একটি স্বাধীন জাতির জন্য এক চরম অবমাননাকর ও মর্মান্তিক পরিণতি।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পেপারস