‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’—এই প্রাচীন প্রবাদটি যেন বাংলাদেশের বর্তমান বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে নিখুঁত ও বাস্তব প্রতিচ্ছবি। দেশের সাধারণ ও অসহায় মানুষ যখন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এমনকি যুগের পর যুগ ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরেও ন্যায়বিচার পান না, তখন এই প্রবাদটির সত্যতা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। একটি সাধারণ মামলার রায় পেতে গিয়ে একজন বিচারপ্রার্থীর যৌবন থেকে কীভাবে বার্ধক্যে উপনীত হতে হয়, তার সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক উদাহরণ হলো সোনালী ব্যাংকের সাবেক কর্মী হরেন্দ্রনাথ চন্দ্রের আইনি লড়াই। ১৯৮৫ সালে অর্থ আত্মসাতের একটি অভিযোগ মাথায় নিয়ে তার যে দুর্বিষহ আইনি যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তার চূড়ান্ত ও আইনি পরিসমাপ্তি ঘটে ২০২৪ সালে এসে। একটিমাত্র মামলার চূড়ান্ত রায় পেতে তাকে টানা চার দশক বা ৪০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। যখন সর্বোচ্চ আদালত থেকে তিনি তার আইনি অধিকার ফিরে পান এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ লাখ টাকা পাওয়ার নির্দেশ লাভ করেন, ততদিনে তার বয়স হয়ে গেছে ৭৮ বছর। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো যখন আদালতের বারান্দায় আর আইনজীবীর চেম্বারে ঘুরে ঘুরে নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন সেই বিচার আর কোনো আনন্দ বা স্বস্তি বয়ে আনে না।
হরেন্দ্রনাথের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক উদাহরণ নয়। দেশের বিচার বিভাগের ধীরগতির আরেকটি ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হলো কান্তি মারাক নামের এক আসামির ফাঁসির রায়ের ঘটনা। একটি আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধে বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিল। কিন্তু সেই দণ্ডের আইনি বৈধতা যাচাই এবং হাইকোর্টে রায় বহাল হতে সময় লেগে যায় দীর্ঘ সাত বছর। হাইকোর্ট যখন চলতি বছরের ১ জুলাই তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন, তখন একটি বিস্ময়কর ও হতাশাজনক তথ্য বেরিয়ে আসে। জানা যায় যে, হাইকোর্টের এই রায় ঘোষণার আরও পাঁচ বছর আগেই ২০২১ সালে কাশিমপুর কারাগারে বন্দি অবস্থায় কান্তি মারাক মারা গেছেন। মৃত্যুর পাঁচ বছর পর একজন মৃত মানুষের ফাঁসির রায় বহাল রাখার এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমাদের বিচার ব্যবস্থা কতটা ধীরগতির এবং কাঠামোগত দিক থেকে কতটা বিপর্যস্ত। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাধ্য হয়ে মৃত ব্যক্তির দণ্ড বহালের রায়টি প্রত্যাহার করে মামলার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করেন। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ বা ‘বিলম্বিত বিচার মূলত বিচারহীনতারই নামান্তর’—কথাটি আমাদের দেশের বিচারপ্রার্থীদের জন্য এক নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতা।
দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে কত বিশাল সংখ্যক মামলা ঝুলে আছে, তার পরিসংখ্যান যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। সুপ্রিম কোর্টের চলতি বছরের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সব স্তরের আদালত মিলিয়ে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক অবিশ্বাস্য অঙ্কে—৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি। তবে সরকারের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬। এর মধ্যে দেশের অধস্তন বা নিম্ন আদালতগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মামলা জমে আছে, যার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি। জাতীয় সংসদে দেওয়া খোদ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের তথ্যমতে, নিম্ন আদালতে জমে থাকা এই বিপুল সংখ্যক মামলার মধ্যে দেওয়ানি বা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের মামলাই রয়েছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি। অন্যদিকে, ফৌজদারি বা বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলার সংখ্যা আরও অনেক বেশি—প্রায় ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি। সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টেও মামলার পাহাড় জমে আছে। সেখানে বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সাত লাখ ১৩ হাজার ৪৮৯টি। এর মধ্যে শুধু হাইকোর্ট বিভাগেই ঝুলে আছে ছয় লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি মামলা এবং আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি মামলা।
মামলার এই পাহাড়সম জট এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত একটি মত প্রকাশ করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, বর্তমানে দেশে যে প্রচলিত আইনি কাঠামো ও বিচারব্যবস্থা চালু রয়েছে, তা দিয়ে এই লাখ লাখ বকেয়া মামলা কোনোভাবেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তবে তিনি মনে করেন, এই জটকে এখনই একটি সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা না গেলেও, অন্তত নতুন করে মামলা জট যাতে আর বাড়তে না পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করাটা অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, ছোটখাটো বা তুলনামূলক কম সাজার ফৌজদারি মামলাগুলোকে যদি আদালতের বাইরে আপস বা মীমাংসাযোগ্য করে তোলা যায়, তবে আদালতের ওপর থেকে একটি বড় চাপ কমানো সম্ভব। একই সাথে জমিজমা বা দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা অল্টারনেটিভ ডিসপুট রেজল্যুশন (এডিআর) পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। তিনি গ্রাম আদালতগুলোকে আরও বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়েই ছোটখাটো বিরোধ মিটিয়ে ফেলার পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া দেশের মানুষের মধ্যে কথায় কথায় মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা করার যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে, তা থেকে নাগরিকদের বেরিয়ে আসার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অনেক সময় দেখা যায়, একজনের অপরাধের জন্য তার পুরো পরিবারকে বা গ্রামের নিরপরাধ মানুষকে মামলার আসামি করা হয়, যা বিচার ব্যবস্থাকে অযথা ভারাক্রান্ত করে তোলে।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, যেকোনো নতুন মামলা বা রিট গ্রহণ করার আগে একজন বিচারকের উচিত সেই মামলার মেরিট বা আইনি ভিত্তিটি অত্যন্ত গভীরভাবে বিবেচনা করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাইভেট বা বেসরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিট মামলা চলে না বলে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও নিম্ন ও উচ্চ আদালতের অনেক বিচারক হরহামেশাই এসব মামলা গ্রহণ করছেন, যা মামলা জটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
মামলাজট নিরসনের জন্য অতীতেও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিভিন্ন কমিশনের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ। ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগ সংস্কারের লক্ষ্যে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে প্রধান করে একটি আট সদস্যের কমিশন গঠন করেছিল। ওই কমিশন তাদের দীর্ঘ ও বিশদ প্রতিবেদনে মামলাজট কমানোর জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল—নিম্ন আদালতে বিচারকের সংখ্যা এক লাফে কমপক্ষে ছয় হাজারে উন্নীত করা এবং সাময়িকভাবে মামলাজট সামাল দেওয়ার জন্য অবসরপ্রাপ্ত সৎ ও দক্ষ জেলা জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা। এর আগে আইন কমিশনও তাদের এক প্রতিবেদনে বিচারকের তীব্র সংকট, জনবলের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো এবং মিথ্যা মামলার প্রবণতাকে মামলাজটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তারা চার বছরের মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার নতুন বিচারক নিয়োগ এবং আদালতগুলোতে তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল।
বর্তমানে দেশে বিচারকের সংখ্যার দিকে তাকালে জনসংখ্যার তুলনায় তা যে কতটা নগণ্য, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমানে মাত্র পাঁচজন বিচারপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০০ জন বিচারপতি রয়েছেন। অন্যদিকে নিম্ন আদালতের চিত্র আরও ভয়াবহ। দেশে অনুমোদিত বিচারকের পদ রয়েছে দুই হাজার ৬২০টি, কিন্তু বাস্তবে বিচারকাজে নিয়োজিত আছেন মাত্র এক হাজার ৮৫৫ জন। জনসংখ্যা ও মামলার অনুপাত হিসাব করলে দেখা যায় যে, দেশে প্রায় এক লাখ নাগরিকের জন্য বিচারক রয়েছেন মাত্র একজন, যা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত হতাশাজনক।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ ও প্রখ্যাত আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই মামলাজটের পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণকে চিহ্নিত করেছেন—আইন অনুযায়ী সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া এবং সমাজে দিন দিন অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। তিনি মনে করেন, প্রচলিত সাধারণ ব্যবস্থা বা টুকটাক সংস্কার দিয়ে এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘মহাপরিকল্পনা’, যার জন্য প্রয়োজনে সংবিধান ও প্রচলিত আইনগুলোর আমূল পরিবর্তন ও সংশোধন করতে হবে।
তবে এই চরম হতাশার মধ্যেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছে। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর কিছু বিশেষ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে মামলার নিষ্পত্তির হার বেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব তথ্যমতে, বছরের শুরুতে যেখানে বিচারাধীন মামলা ছিল সাত লাখ ৮০০টি, সেখানে আগস্টের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৮৫ হাজার ৮৩০টিতে। এই আট মাসে নতুন মামলা দায়ের হওয়ার চেয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে অনেক বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে হাইকোর্টে রেকর্ড সংখ্যক ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা গত পুরো বছরের মোট নিষ্পত্তির চেয়েও প্রায় ৩১ হাজার ৮৪০টি বেশি। দ্রুত বিচার পাওয়া যে একজন সাধারণ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, তা নিশ্চিত করতে প্রধান বিচারপতির এই উদ্যোগকে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আইন অঙ্গনের সবাই ব্যাপকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং এই ধারা অব্যাহত রাখার জোর দাবি তুলেছেন।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ