বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় যখন সবচেয়ে বেশি জরুরি, ঠিক সেই মুহূর্তে একটি অত্যন্ত বিপরীতমুখী ও বিস্ময়কর চিত্র ফুটে উঠেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে। দেশের নিজস্ব পতাকাবাহী এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে ক্রয় করা অত্যাধুনিক জাহাজগুলো ভাড়ায় খাটছে বিদেশের জলসীমায়। আর অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য যে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে, তা পরিবহন করা হচ্ছে বিদেশ থেকে চড়া মূল্যে ভাড়া করা বিদেশি জাহাজে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজের প্রদেয় ভাড়া বা প্রিমিয়াম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও সাশ্রয়ী বা ইতিবাচক কোনো দিক নয়।
দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে ব্যবসায়িক সুরক্ষা প্রদান করা এবং দেশীয় জাহাজের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনার মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সরকার ২০১৯ সালে ‘বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) আইন, ২০১৯’ প্রণয়ন করেছিল। এই আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুস্পষ্ট ধারা অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আমদানি করা যেকোনো পণ্যের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে পরিবহন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই এই আইনের কোনো তোয়াক্কা করছে না। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) অভিযোগ করেছে যে, তাদের বহরে থাকা শতভাগ জাহাজই দেশীয় পতাকাবাহী হওয়া সত্ত্বেও এই আইনের কোনো বাস্তব প্রয়োগ সরকারি কেনাকাটায় বা জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) পক্ষ থেকে জোরালোভাবে দাবি করা হচ্ছে যে, সরকারিভাবে আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য এবং সার তারা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ও নিয়মিতভাবে দেশে পরিবহন করে আসছে। কিন্তু যখনই পরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রসঙ্গটি সামনে আসে, তখনই নানা ধরনের নীতিগত জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতার কথা বলে তাদের সেই কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। অথচ বিএসসির বহরে ৩৯ হাজার টন ধারণক্ষমতার তিনটি সুবিশাল দেশীয় পতাকাবাহী ট্যাংকার জাহাজ রয়েছে। নিজেদের দেশের জ্বালানি পরিবহনের সুযোগ না পেয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি বাধ্য হয়ে তাদের মালিকানাধীন জাহাজ তিনটিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিশোধিতসহ নানা ধরনের তরল জ্বালানি পরিবহনের জন্য ভাড়ায় খাটাচ্ছে।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে ঠিক কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মধ্যে গত ১৩ বছর ধরে এক অদৃশ্য রশি টানাটানি ও দ্বন্দ্ব চলে আসছে, যার কোনো কাঙ্ক্ষিত বা যৌক্তিক সমাধান আজও পর্যন্ত মেলেনি। এই দীর্ঘস্থায়ী টানাপোড়েনের মধ্যেই বিশ্ববাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। বিশেষ করে গত মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে প্রদেয় প্রিমিয়াম অর্থাৎ জাহাজ ভাড়া, ইন্স্যুরেন্স বা বিমা খরচসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন গুণেরও বেশি হয়ে গেছে, যা বিপিসির আমদানি ব্যয়কে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলেছে।
বিএসসির বহরে থাকা এই তিনটি বিশাল ট্যাংকার জাহাজ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জি টু জি (সরকার টু সরকার) চুক্তির ভিত্তিতে কেনা হয়েছিল। সেসময় চীন থেকে মোট ছয়টি জাহাজ কেনার জন্য ১ হাজার ৮৪৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকার একটি বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই পুরো প্রকল্পটিতে চীন সরকারের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকার বিশাল ঋণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। এই মেগা প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালে মোট ৮৮৫ কোটি টাকা ব্যয় করে তিনটি অত্যাধুনিক ট্যাংকার জাহাজ বিএসসির বহরে যুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ‘এমটি বাংলার অগ্রদূত’ এবং ‘এমটি বাংলার অগ্রগতি’ নামের জাহাজ দুটির প্রতিটি কিনতে খরচ হয়েছিল ২৯৬ কোটি ১১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করে। আর তৃতীয় জাহাজ ‘এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা’ ক্রয় করতে ব্যয় হয়েছিল ২৯২ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
চীনের শিপইয়ার্ডে তৈরি করা এই তিনটি জাহাজ ২০১৯ সালের বিভিন্ন সময়ে বিএসসির নৌবহরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। এর মধ্যে ‘এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা’ জাহাজটি ২০১৯ সালের ২২ মে, ‘এমটি বাংলার অগ্রগতি’ ওই একই বছরের ২৫ জানুয়ারি এবং ‘এমটি বাংলার অগ্রদূত’ ওই বছরের ৩ জানুয়ারি বিএসসির বহরের অংশ হয়। কিন্তু বর্তমানে এই জাহাজগুলোর অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘এমটি বাংলার অগ্রগতি’ ভারতের চেন্নাই বন্দরে এবং ‘এমটি বাংলার অগ্রদূত’ ভারতেরই জয়গড় বন্দরে অবস্থান করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে ‘এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা’ জাহাজটি গত ২ অক্টোবর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বন্দর থেকে পণ্যবোঝাই করে ব্রাজিলের সুয়াপে বন্দরের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছে।
জ্বালানি খাতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর সব মিলিয়ে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশের ভেতরের রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরে থাকা পাঁচটি বেসরকারি খাতের প্ল্যান্ট থেকেও সামান্য কিছু পরিমাণ জ্বালানি তেল পাওয়া যায়। কিন্তু দেশের সিংহভাগ চাহিদা মেটানোর জন্য অবশিষ্ট বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিদেশ থেকেই সরাসরি আমদানি করতে হয়। এই পরিশোধিত জ্বালানির মধ্যে ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল এবং মেরিন ফুয়েলের মতো অত্যন্ত জরুরি পণ্যগুলো বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজেরাই আমদানি করে থাকে। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দেওয়া চরম সংকটের কারণে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রিমিয়াম সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিটুজি (সরকার টু সরকার) চুক্তি এবং উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিপিসি মোট ৫৫ লাখ টনের কিছু বেশি পরিমাণ পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে এই বিশাল আমদানির কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য দেখা গেছে। মোট আমদানির মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানি সরবরাহের কার্যাদেশ একাই পেয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের প্রতিনিধিত্বকারী ছয়টি প্রতিষ্ঠান, যা বিপিসির বার্ষিক মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ৭৮ শতাংশ। গত জানুয়ারি থেকে জুন মেয়াদে জিটুজি এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সর্বমোট ২৮ লাখ টন জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২৪ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল সরবরাহের বিশাল কার্যাদেশ যে প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে, তাদের স্থানীয় দুটি এজেন্ট প্রতিষ্ঠান হলো ‘সেভেন মার্ক’ এবং ‘ট্রান্সবাংলা কমোডিটিস লিমিটেড’, যার উভয়েরই মালিকানা ওই একই ডা. এজাজুর রহমানের হাতে।
এই সরবরাহের ধারাবাহিকতার মধ্যেই গত এপ্রিল মাসে ডা. এজাজুর রহমানের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান—‘ইউনিপ্যাক (সিঙ্গাপুর)’ এবং ‘পিটিএলসিএল’ তাদের চুক্তিকৃত কিছু পার্সেল বা চালান সরবরাহ করতে হঠাৎ করেই অপারগতা প্রকাশ করে। ঠিক ওই একই সময়ে, অর্থাৎ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে এক ধরনের যুদ্ধাবস্থা ও চরম উত্তেজনা শুরু হলে বিশ্বজুড়ে পেট্রোলিয়াম জ্বালানির বাজারে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়। এই বৈশ্বিক সংকটে প্রথমদিকে বিপিসি বেশ বেকায়দায় পড়ে গেলেও, ওই মাসের মধ্যেই সর্বোচ্চ ১৭টি পার্সেল বা তেলের চালান সরবরাহ দিয়ে সংকট সামাল দেওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বত্বাধিকারী ডা. এজাজুর রহমান দাবি করেছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের জন্য ডাকা উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে মোট চারটি প্যাকেজে ১৪ লাখ ২০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য দুটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘এ’ প্যাকেজের আওতায় প্রতি ব্যারেলে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭২ ডলার প্রিমিয়ামে ৫ লাখ টন ডিজেল এবং প্রতি ব্যারেলে ৬ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে ১ লাখ টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ অর্জন করে ‘ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর’। অন্যদিকে ‘বি’ প্যাকেজে প্রতি ব্যারেলে ৪ দশমিক ৭৮ ডলার প্রিমিয়ামে ৪ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল, প্রতি ব্যারেলে ৬ দশমিক ৮৮ ডলার প্রিমিয়ামে ১ লাখ ১০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কাজ পায় ‘ভিটল এশিয়া’। এছাড়া ‘সি’ প্যাকেজে প্রতি টনে ৩৭ দশমিক ৮১ ডলার প্রিমিয়ামে দেড় লাখ টন ফার্নেস অয়েল এবং ‘ডি’ প্যাকেজে প্রতি ব্যারেলে ৪ দশমিক ৭৮ ডলার প্রিমিয়ামে ১ লাখ টন অকটেন সরবরাহের বিশাল কার্যাদেশও এই ‘ভিটল এশিয়া’র ঝুলিতেই যায়। উল্লেখ্য, এই তিনটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানেরই স্থানীয় এজেন্টের মালিক হলেন সেই ডা. এজাজুর রহমান।
কিন্তু বিপিসির নথিপত্রের তথ্য বলছে, মাত্র তিন মাস পেরোতেই সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য ডাকা উন্মুক্ত দরপত্রে প্রিমিয়ামের হার আকাশচুম্বী হয়ে যায়। ‘প্যাকেজ-পিজি-০১’ এর অধীনে আড়াই লাখ টন ডিজেল সরবরাহের জন্য ‘ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর’ একলাফে প্রতি ব্যারেলে ১৬ ডলার ৬২ সেন্ট প্রিমিয়াম দাবি করে বসে। আর ‘ভিটল এশিয়া’ তো আরও একধাপ এগিয়ে ১৭ ডলার ১৬ সেন্ট দাবি করে। শেষ পর্যন্ত ওই নির্দিষ্ট প্যাকেজে ১৬ দশমিক ৪৯ সেন্টে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয় সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান ‘ট্রাফিগুরা পিটিই লিমিটেড’। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ‘প্যাকেজ-পিজি-০২’ এর অধীনে ২ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের জন্য ‘ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর’ প্রতি ব্যারেলে ১৭ ডলার ৫৯ সেন্টের বিশাল দর হাঁকায়। তবে এই প্যাকেজে ‘ভিটল এশিয়া’ ব্যারেলপ্রতি ১৬ ডলার ৬৮ সেন্ট দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা মনোনীত হয়। সবমিলিয়ে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদে মোট ৬ লাখ ৫ হাজার টন ডিজেল, ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং ১ লাখ টন ফার্নেস অয়েল কেনার জন্য দরপত্র ডাকা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে দর অনেক বেশি পড়ায় মন্ত্রিসভা কমিটি শেষ পর্যন্ত ডিজেল ও জেট ফুয়েল কেনার পুরো প্রস্তাবটিই বাতিল করে দিতে বাধ্য হয় এবং শুধুমাত্র একলাখ টন ফার্নেস অয়েল কেনার প্রাথমিক অনুমোদন প্রদান করে।
পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত সংকট সামাল দিতে প্রতি ব্যারেলে ১৪ ডলার ৮৫ সেন্টে ডিজেল এবং ১৬ ডলার ৪৯ সেন্টে জেট ফুয়েল কেনার সিদ্ধান্ত হয় জি-টু-জি চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহকারী তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ লাখ টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহ করার দায়িত্ব পায় ‘বিএসপি-ইন্দোনেশিয়া’ এবং ‘ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর’। এছাড়া ১ লাখ ৫৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ দেওয়ার চুক্তি হয় ‘পেট্রোচায়না’র সঙ্গে। এখানেও উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, বিএসপি এবং ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুরের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন ওই একই ব্যক্তি, ডা. এজাজ।
আমদানির পদ্ধতি নিয়ে সৃষ্ট এই জটিলতার মূলে রয়েছে সিআরএফ এবং এফওবি নামক দুটি বাণিজ্যিক পরিভাষা। পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বিপিসি দীর্ঘদিন ধরে সিআরএফ বা সিঅ্যান্ডএফ (কস্ট অ্যান্ড ফ্রেইট) পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে, যেখানে অপরিশোধিত জ্বালানি বা ক্রুড অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে তারা এফওবি (ফ্রি অন বোর্ড) পদ্ধতি ব্যবহার করে। সিআরএফ পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া করা, বিভিন্ন দেশের বন্দরে বার্থিং স্লট বা ভেড়ার জায়গা ঠিক করা এবং সমুদ্রপথে পরিবহনের যাবতীয় দুর্ঘটনা বিমার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হয়। বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চুক্তিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে তেলের গুণগত মান নিশ্চিত করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার প্রধান স্থাপনায় পৌঁছানো পর্যন্ত সব দায় পালন করে। বিনিময়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি তেলের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটস দরের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের প্রিমিয়াম বা বাড়তি অর্থ পেয়ে থাকে। পতেঙ্গায় তেল খালাস করার সময় যদি গুণগত মান ঠিক না পাওয়া যায়, তবে সরবরাহকারীকে সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে ও খরচে সেই তেল ফেরত নিয়ে যেতে হয়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মানুযায়ী এফওবি (ফ্রি অন বোর্ড) পদ্ধতিতে জ্বালানি পরিবহনের অর্থ হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই পদ্ধতিতে সরবরাহকারী বা বিক্রেতা কেবল তার নিজস্ব দেশের বন্দর বা টার্মিনালে থাকা জাহাজে পণ্য বা জ্বালানি তুলে দেওয়া পর্যন্ত যাবতীয় খরচ ও ঝুঁকি বহন করে থাকেন। এরপর বাকি পুরো সমুদ্রপথের পরিবহনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ও ঝুঁকি আমদানিকারক বা ক্রেতার ওপর বর্তায়। সহজ কথায়, জ্বালানি পণ্যটি যখন লোডিং পোর্টে জাহাজের রেলিং বা পাইপলাইন পার হয়ে ক্রেতার ভাড়াকৃত জাহাজে প্রবেশ করে, ঠিক সেই মুহূর্তেই পণ্যের যাবতীয় ঝুঁকি ও মালিকানা বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতার কাছে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এফওবি পদ্ধতিতে মূলত আমদানিকারক বা ক্রেতাকেই জাহাজ ভাড়া করতে হয়, বিমার ব্যবস্থা করতে হয় এবং গন্তব্য বন্দর পর্যন্ত পরিবহনের সমস্ত খরচ বহন করতে হয়।
আর ঠিক এখানেই বিএসসির দীর্ঘদিনের দাবির যৌক্তিকতা লুকিয়ে আছে। পরিশোধিত জ্বালানি তেল যদি সিআরএফ-এর বদলে এফওবি পদ্ধতিতে আমদানি করা হতো, তবে ‘ফ্ল্যাট প্রটেকশন অ্যাক্ট-২০১৯’ এর আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসারে এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহনের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কাজ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) খুব সহজেই পেয়ে যেতো। দেশীয় জাহাজকে এই কাজে লাগানোর জন্য এবং এফওবি পদ্ধতিতে জ্বালানি আমদানির জন্য ২০১৩ সাল থেকেই বিএসসির কর্মকর্তারা বিভিন্ন দপ্তরে অবিরাম দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। ওই বছরের ১৬ জুন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির এই প্রচলিত ও পুরোনো পদ্ধতিটি পরিবর্তনের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে অনুরোধ জানিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। পরের বছর ২০১৪ সালের ২৮ মে একই অনুরোধের পুনরাবৃত্তি করে পুনরায় আরেকটি চিঠি পাঠানো হয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে। এ বিষয়টি নিয়ে ২০১৭ সালের ২২ মার্চ তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
সেই উচ্চপর্যায়ের সভায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, জ্বালানি তেল পরিবহনের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে যদি নিজস্ব দেশি জাহাজ ব্যবহার করা হয়, তবে বিদেশি জাহাজের ওপর দেশের অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমে আসবে এবং এর ফলে সরকারের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা অধিকতর সুনিশ্চিত হবে। এফওবি পদ্ধতিতে জাহাজ ভাড়া করলে সেই প্রিমিয়াম বা ভাড়ার টাকা স্থানীয় মুদ্রায় বা টাকায় বিএসসিকে পরিশোধ করা যাবে, যার ফলে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে। এছাড়া যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা যুদ্ধকালীন আপৎকালীন সময়ে বিদেশিদের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব দেশি জাহাজে জ্বালানি তেল পরিবহন করা রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে অনেক বেশি নিরাপদ ও নিশ্চিন্তের একটি উপায় হবে। শুধু তাই নয়, কার্গো ভাড়া ও জাহাজের বিমা কভারেজ খাত থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা সাধারণ বীমা করপোরেশনও বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় করার সুযোগ পাবে।
ওই একই সভায় উপস্থিত থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (শুল্ক) মো. ফিরোজ শাহ আলম এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আরফিন আরা বেগম দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তি ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় করা হবে, তা একান্তভাবেই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ বিপিসির নিজস্ব ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তারা আরও জানান, সরকারের নিজস্ব আমদানি পলিসি (২০১৫-২০১৮) মোতাবেক যদি এফওবি পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খোলা হয়, তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তেল সাপ্লাই না দেওয়ার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ আছে বলে মনে করার অবকাশ নেই। বিপিসি যদি এফওবি এলসির মাধ্যমে এই তেল আমদানি করে, তবে প্রিমিয়াম বাবদ সরকারের বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি সরকারি জাহাজের শতভাগ বাণিজ্যিক নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পণ্য পরিবহনের ওপর সরকারের একটি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোও লাভবান হতে পারবে।
এসব যৌক্তিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে একটি অনলাইন সভা আয়োজিত হয়। সেই সভায় সিআরএফ পদ্ধতির পরিবর্তে এফওবি পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির পথে থাকা সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু এত বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত বিপিসি কিংবা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সেই কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং অ্যান্ড ট্র্যাম্পিং) ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান অত্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করে জানান যে, ফ্ল্যাট প্রটেকশন অ্যাক্ট-২০১৯ অনুযায়ী বিদেশ থেকে আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানির কমপক্ষে অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ বিএসসির নিজস্ব জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিপিসি যদি বর্তমান সিআরএফ পদ্ধতির পরিবর্তে এফওবি পদ্ধতিতে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করত, তবে বিএসসি তথা সমগ্র দেশ আর্থিকভাবে ব্যাপকভাবে লাভবান হতো। তিনি আরও বলেন, দেশি জাহাজে পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহনের ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতো, তেমনি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও সুদৃঢ় কাঠামোর ওপর দাঁড়াতো। বিদ্যমান সিআরএফ পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিএসসি বারবার বিনীত অনুরোধ করে আসলেও এখনও পর্যন্ত বিষয়টি সুরাহা না হওয়াটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
অন্যদিকে এফওবি পদ্ধতিতে আমদানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু ব্যবহারিক জটিলতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন বিপিসির সংশ্লিষ্ট একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বিপিসিতে সদ্য পদায়িত নতুন চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান যে, যেহেতু তিনি বিপিসিতে একেবারে নতুন যোগদান করেছেন, তাই তিনি পুরো বিষয়টি আগে গভীরভাবে অবগত হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, এমন একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেন।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ