• বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০১ অপরাহ্ন
Headline
আমাদের ১০টি কমন স্বভাব টাকা ছাপিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংককে ঋণ দেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাবিতে নেকাব পরা শিক্ষার্থীকে অপমান ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পশ্চিমবঙ্গ মাদরাসা সার্ভিস কমিশন বিলুপ্ত ঘোষণা করল বিজেপি সরকার মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর দীর্ঘ বৈঠক, তারেক রহমানের সফর নিয়ে আলোচনা প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈঠক ১২ ডিসেম্বরের আগেই নবায়ন হবে গঙ্গা চুক্তি: পানিসম্পদমন্ত্রী শিক্ষকদের দাবি পর্যায়ক্রমে মেনে নেবে সরকার: রিজভী ভিসা সহজীকরণ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি জোরদারে ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মাহ্দী আমিনের বৈঠক দুর্নীতি করে শিক্ষকদের ভাতা বন্ধ করেছিল ফ্যাসিবাদী সরকার: মাহদী আমিন

তেল আনতেই ফুরায় তেল

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

নগরায়ণের এক অদ্ভুত ও চরম বিশৃঙ্খল রূপ দেখছে রাজধানী ঢাকার পূর্ব প্রান্তের বাসিন্দারা| দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হওয়া পূর্বাচল তিনশ ফিট সড়ক ও এর আশপাশের বিশাল আবাসিক এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠেনি কোনো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো বা ফিলিং স্টেশন| ফলে নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ি বা গণপরিবহনের জন্য সামান্য জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে বাসিন্দাদের পাড়ি দিতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল অতিরিক্ত পথ| শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব যে, গাড়ির জন্য তেল আনতে গিয়েই পথের মাঝে ফুরিয়ে যাচ্ছে গাড়ির ট্যাংকিতে থাকা অবশিষ্ট তেল| বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া একটি হঠকারী ও একরোখা সিদ্ধান্তের কারণেই আজ এই বিশাল জনপদ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে| সে সময় বিশেষ আদেশের মাধ্যমে নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল| অথচ একই সময়ে এলপিজি স্টেশন স্থাপনের কার্যক্রম ঠিকই চালু রাখা হয়েছিল| তৎকালীন সরকারের এমন অবিবেচক ও দূরদর্শিতাহীন নীতির কারণে বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল এই আবাসিক এলাকাগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় ন্যূনতম জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামোও গড়ে উঠতে পারেনি| এর ফলে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার জ্বালানির যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও পরিবেশদূষণ|

রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে শুরু করে তিনশ ফিট সড়ক হয়ে পূর্বাচল মেগা প্রকল্পের আগ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নামিদামি আবাসন প্রকল্প| এর মধ্যে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি, নৌবাহিনী আবাসিক এলাকা, স্বদেশ স্বর্ণালী, স্বদেশ সানভ্যালি এবং ইউনাইটেড সিটির মতো বৃহৎ ও জনবহুল প্রকল্পগুলো অন্যতম| এসব এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের বসবাস বাড়ছে এবং সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনের সংখ্যা| কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই পুরো বিস্তীর্ণ এলাকায় একটিও পূর্ণাঙ্গ ফিলিং স্টেশন নেই| অথচ রাজধানীর গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোড থেকে শুরু করে সাতরাস্তার মোড় পর্যন্ত মাত্র দেড় কিলোমিটারের একটি ছোট্ট সড়কেই অন্তত সাতটি ফিলিং স্টেশন অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছে| এই বৈষম্যমূলক নগর পরিকল্পনার খেসারত দিচ্ছে পূর্বাচল সড়কের আশপাশের প্রায় পাঁচ লাখ সাধারণ মানুষ| তিনশ ফিট সড়ক সংলগ্ন একটি আবাসিক প্রকল্পের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুন তার দৈনন্দিন ভোগান্তির কথা তুলে ধরে জানান যে, নিজের গাড়ির জন্য তেল আনতে তাকে বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কুড়িল বা বিমানবন্দর সড়কের ফিলিং স্টেশনে যেতে হয়| মাত্র দুদিন আগে তিনি গাড়ির রিজার্ভে থাকা কয়েক লিটার তেল নিয়ে পাম্পের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, কিন্তু পাম্পে পৌঁছানোর আগেই রাস্তার যানজটে সেই তেল প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে যায়| কোনো কারণে সেদিন যদি তিনি সময়মতো তেল নিতে না পারতেন, তবে তাকে মাঝরাস্তায় গাড়ি ফেলে চরম বিপাকে পড়তে হতো| এই চিত্র শুধু মামুনের একার নয়, ওই এলাকার প্রতিটি গাড়ি মালিকের নিত্যদিনের দুঃস্বপ্ন|

স্থানীয়ভাবে কোনো ফিলিং স্টেশন না থাকায় এই বিশাল এলাকার যানবাহনগুলোকে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বাধ্য হয়ে কুড়িল, খিলক্ষেত কিংবা জলসিঁড়ি প্রকল্পের দিকে ছুটতে হচ্ছে| হিসাব করে দেখা গেছে, আবাসিক এলাকাগুলো থেকে তেল আনতে গিয়ে একেকটি গাড়িকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কুড়িল পর্যন্ত দশ কিলোমিটারের বেশি, খিলক্ষেত পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং জলসিঁড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত অতিরিক্ত পথ অযথাই পাড়ি দিতে হচ্ছে| এই অহেতুক যাতায়াতের কারণে একদিকে যেমন মানুষের মূল্যবান সময়ের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে কুড়িল ও খিলক্ষেতমুখী সড়কগুলোতে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে বিশাল যানজট| জ্বালানি নিতে গিয়ে শুধু যাতায়াতেই একটি গাড়ির প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পর্যন্ত বাড়তি সময় নষ্ট হচ্ছে| ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি গণপরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি এবং মোটরসাইকেলগুলোকেও একই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে| এই অপ্রয়োজনীয় যান চলাচলের কারণে আবাসিক এলাকাগুলোর ভেতরের রাস্তাতেও সারাক্ষণ যানবাহনের বাড়তি চাপ লেগে থাকছে| বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দিনগুলোতে মহাখালী বাস টার্মিনাল যদি পুরোপুরিভাবে এই অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়, তবে যানবাহনের এই চাপ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে, যা সামাল দেওয়া ট্রাফিক পুলিশের পক্ষেও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে|

এই অপরিকল্পিত ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানির অপচয় হচ্ছে, তার একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত পরিসংখ্যান রয়েছে| পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন যদি ওই এলাকার মাত্র ৫০ হাজার যানবাহন জ্বালানি সংগ্রহের জন্য গড়ে অতিরিক্ত সাত কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়, তবে সব মিলিয়ে দিনে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটার পথ শুধু তেল আনতেই অযথাই চলতে হয়| পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে একটি সাধারণ যানবাহনে গড়ে শূন্য দশমিক এক শূন্য থেকে শূন্য দশমিক এক দুই লিটার জ্বালানি খরচ হয়| সেই হিসাবে এই অতিরিক্ত চলাচলের কারণে প্রতিদিন শুধুমাত্র যাতায়াতেই প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার লিটার মূল্যবান জ্বালানি তেল সম্পূর্ণ বিনা প্রয়োজনে পুড়ে ছাই হচ্ছে| দীর্ঘমেয়াদে হিসাব করলে এই অপচয়কৃত জ্বালানির আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় হাজার হাজার কোটি টাকায়, যা দেশের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিরাট ক্ষতি| শুধু অর্থের অপচয়ই নয়, এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ার কারণে বাতাসে কার্বন নিঃসরণের মাত্রাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে| ফলে ওই এলাকার বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে|

সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় বাসিন্দা ও নগর বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু যৌক্তিক দাবি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন| বাসিন্দাদের মতে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এবং যানবাহনের বিপুল সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন| সেই সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে তিনশ ফিট সড়কের আশপাশের সুবিধাজনক ও উপযুক্ত স্থানে অন্তত দুই থেকে তিনটি সুপরিকল্পিত আধুনিক ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি| তবে যত্রতত্র পাম্প বসানোর বদলে স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, আধুনিক নগর পরিকল্পনা, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং পাম্পে প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রশস্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে| পাম্পের ভেতরে যাতে একসঙ্গে অনেক গাড়ি অপেক্ষা করতে পারে, সেই জায়গাটুকুও নিশ্চিত করা জরুরি| এই পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সিটি করপোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে একসঙ্গে বসে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে| ইউনাইটেড সিটি ও পুলিশ হাউজিংয়ের বাসিন্দারা মনে করেন, পরিকল্পিত ফিলিং স্টেশন গড়ে উঠলে অহেতুক যান চলাচল যেমন বন্ধ হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা ও অর্থের বিশাল সাশ্রয় হবে|

এদিকে ফিলিং স্টেশন স্থাপনের এই স্থবিরতা নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও মুখ খুলেছেন| নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের দিকে প্রণীত একটি নীতিমালার আওতায় বিগত সরকারের আমলে একটি বিশেষ অফিস আদেশের মাধ্যমে দেশব্যাপী নতুন পেট্রোল পাম্প অনুমোদনের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল| তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বিপিসির কাছে একটি যুগোপযোগী খসড়া নীতিমালা চাওয়া হয়েছে| এর আগে বিপিসির পক্ষ থেকে একটি খসড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও, সেটি অধিকতর যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের জন্য পুনরায় বিপিসির কাছে ফেরত পাঠানো হয়| বর্তমানে এই খসড়া নীতিমালাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও মতামত গ্রহণের কাজ চলছে| এটি এখন যাচাই-বাছাইয়ের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই এই নতুন নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে| এই নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলেই নতুন ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের জট খুলবে বলে বিপিসি আশাবাদী|

সার্বিক এই পরিস্থিতি নিয়ে দেশের প্রখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডক্টর আদিল মোহাম্মদ খান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন| তিনি বলেন, যেকোনো আধুনিক নগর পরিকল্পনার মূল ভিত্তিই হলো নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের বসবাস ও তাদের দৈনন্দিন চাহিদার ওপর ভিত্তি করে অবকাঠামো সাজানো| একটি এলাকার মাস্টারপ্ল্যান যদি সঠিক ও বাস্তবসম্মত না হয়, তবে যুগের পর যুগ সাধারণ বাসিন্দাদের তার চরম নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হয়| পূর্বাচল ও তিনশ ফিট এলাকার ক্ষেত্রেও অবিকল সেই একই ভুল করা হয়েছে| সেখানে হু হু করে মানুষের বসবাস ও বিশাল সব ইমারত বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে তাদের জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানি সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি| ফলে এই এলাকার দায় গিয়ে পড়ছে আশপাশের অন্যান্য এলাকার ওপর এবং পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থায় এক ধরনের চেইন রিঅ্যাকশন বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে| এখনই যদি এই অপরিকল্পিত নগরায়ণের লাগাম টেনে ধরে প্রয়োজনীয় জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই পুরো পূর্বাচল অঞ্চলটি একটি অচল ও অবরুদ্ধ জনপদে পরিণত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়|

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category