• রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন
Headline
তিন চাপে পোশাক খাত পাঠ্যবইয়ের দর ফাঁসের ত্রিপক্ষীয় ফাঁদে আড়াইশো কোটি টাকার হরিলুট ক্ষমতার পালাবদল বনাম রাষ্ট্র পুনর্গঠন: জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের কঠিন পরীক্ষা এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম: সন্তান বিচ্ছেদের শূন্যতা—১০টি পরামর্শ পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি দেওয়ার প্রতিবাদে ১২ অক্টোবর অনশন দিল্লিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা জেন-জিদের দিল্লিতে লকডাউন: ধ্রুব রাঠি-দীপকের পর এবার আটক কেজরিওয়াল-মমতা ব্যানার্জি, যন্তর মন্তরে ব্যাপক ধরপাকড় ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন: গভর্নর ছয় মিনিটও সময় নেয়নি বিএনপি, জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে: আখতার হোসেন

ক্ষমতার পালাবদল বনাম রাষ্ট্র পুনর্গঠন: জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের কঠিন পরীক্ষা

Reporter Name / ০ Time View
Update : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশ আজ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে ক্ষমতার হাতবদলের চেয়েও বহুগুণ বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রযন্ত্র তার দীর্ঘদিনের জীর্ণ ও অকার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না| চব্বিশের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় পুনর্জাগরণের সূচনা হয়েছিল, তা সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এক নতুন সাংবিধানিক অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে| তবে একটি শাসনকালের পতন ঘটিয়ে নতুন সরকারের মসনদে বসা আর একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়| দেশের আমজনতা কেবল একটি নতুন মন্ত্রিসভা দেখতে চায়নি; তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের চিরচেনা নিপীড়ক সম্পর্কের মৌলিক রূপান্তর| এই গণ-আকাঙ্ক্ষার মূলে রয়েছে প্রশ্নাতীত প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা এবং দলমত-নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভের নিরপেক্ষতা| আন্তর্জাতিক সংকট-পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোও এই রূপান্তরকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রকৃত ও কঠিনতম পরীক্ষাটি আসলে এখনই শুরু হলো|

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটাধিকার প্রয়োগ নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, তবে এটিই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একমাত্র চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না| নির্বাচন যদি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সংসদের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে নির্ভয়ে কথা বলার সুযোগ না দেয়, তবে শীর্ষ নেতৃত্বের মুখ বদলালেও রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রের কোনো বদল ঘটে না| বাংলাদেশের অতীতে বারবার দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ রাষ্ট্রযন্ত্রের পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনকে কেবল ক্ষমতাসীনের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ারে পরিণত করেছে| ফলে নবনির্বাচিত শক্তির সামনে সবসময় এই সহজ প্রলোভন থাকে যে, পুরোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক আনুগত্যের লোক দিয়ে তা পরিচালনা করা| এমন পদক্ষেপ সাময়িক ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরকে অঙ্কুরেই গলা টিপে হত্যা করে| ‘বিজয়ী দলই সবকিছুর একক মালিক’—এই সর্বনাশা ও অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে এমন এক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মসনদে যে-ই আসুক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা যেন কোনো পরিস্থিতিতেই ক্ষুণ্ণ না হয়|

রাজনৈতিক বৈধতা শেষ পর্যন্ত কোনো তাত্ত্বিক ধারণায় বাঁচে না; তা টিকে থাকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বস্তির ওপর| বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির চরম শ্লথগতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপে বিপর্যস্ত| আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেশের মোট প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে জরুরি ও কঠোর সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে| লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজারে সাধারণ পরিবারগুলোর টিকে থাকা আজ এক নীরব সংগ্রামে পরিণত হয়েছে| সাধারণ নাগরিকের দাবি অত্যন্ত সহজ ও বাস্তবসম্মত—তারা সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার চায়, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চায়, টাকার অবমূল্যায়ন রোধ দেখতে চায় এবং ব্যাংকে তাদের কষ্টের জমার নিরাপত্তা চায়| রাজনৈতিক এই ক্ষমতার বদল যদি দ্রুত সাধারণ মানুষের পাতে স্বস্তি ও বাজারে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও মোহভঙ্গ নতুন সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরিত হতে খুব বেশি সময় নেবে না|

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সমীকরণও অত্যন্ত জটিল| ওয়াশিংটন, বেইজিং, নয়াদিল্লি, মস্কো কিংবা ব্রাসেলস—প্রত্যেক আন্তর্জাতিক শক্তিরই ঢাকাকে ঘিরে নিজস্ব ভূকৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে| কিন্তু বৈশ্বিক অংশীদারদের বুঝতে হবে যে, কোনো বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব দিয়ে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করা যায় না| বাংলাদেশকে স্থিতিশীল দেখতে চাইলে এমন টেকসই আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন, যা দেশের নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা ও স্বাধীন বিচারিক কাঠামোকে পেশাদারভাবে মজবুত করবে| একই সঙ্গে জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের পর ফ্যাসিবাদের অপকর্ম, বিচারহীনতা ও লুণ্ঠনের বিচার নিশ্চিত করা অবশ্যই জাতীয় অগ্রাধিকার| তবে সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি প্রতিশোধ বা আইনি প্রতিহিংসার পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তটিও পুরোনো অন্ধকূপেই পথ হারাবে|

বর্তমান সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো তারা কি রাষ্ট্রকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির সম্প্রসারণের হাতিয়ার হিসেবে দেখবে, নাকি এমন এক আত্মনিয়ন্ত্রিত ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করাবে যা অন্যায় করলে একদিন তাদের নিজেদের জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করাতেও দ্বিধা করবে না| এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে নিছক কোনো ক্ষমতার প্রাপ্তি নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত| প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণকে যদি সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়া না যায়, তবে মুক্তির এই পুরো অধ্যায়টি আবারও ব্যর্থতার ইতিহাসে পরিণত হবে| এর জন্য স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা, আর্থিক খাতের পচন দূর করা এবং লাখ লাখ কর্মহীন তরুণের জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই হতে হবে জাতীয় অগ্রাধিকার| জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান যে পরিবর্তনের স্বপ্ন সাধারণ মানুষের চোখের সামনে উন্মুক্ত করেছে, সেই অবিনাশী আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তিতে রূপান্তর করার ঐতিহাসিক দায় এখন বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কাঁধেই বর্তেছে|


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category