• মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪১ অপরাহ্ন
Headline
হামের উপসর্গে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে: আইনমন্ত্রী তিনি একদম ঠিক আছেন: ইউনূস সেন্টার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৯ জনের মৃত্যু ইরানি নেতাদের হত্যা করার ক্ষেত্রে আমরা হয়তো অনেকদূর চলে গেছি: ট্রাম্প জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে: এলজিআরডি মন্ত্রী রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা: আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তদন্ত করছে সৌদি আরব প্লাস্টিক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই : পরিবেশমন্ত্রী জাতীয় তথ্যচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৯০ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তে গুরুত্বারোপ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে : অর্থমন্ত্রী

জমি জটে গ্যাস অনুসন্ধান

Reporter Name / ০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের জোরালো তাগিদ থাকলেও মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও দূরদর্শিতার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে পেট্রোবাংলার অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি অনুসন্ধান প্রকল্প| সিলেটের জৈন্তাপুর ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান কূপ খননের মাধ্যমে আগামী এক দশকে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ৫৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) নতুন গ্যাস যুক্ত করার যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, নির্ধারিত দুই বছর মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও সেখানে মূল খননের ন্যূনতম কাজও শুরু করা যায়নি| সিলেটের জৈন্তাপুরের ‘ডুপিটিলা-১’ এবং গোলাপগঞ্জের ‘কৈলাসটিলা-৯’ নামের এই দুটি অনুসন্ধান কূপ খননে মূল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে জমি অধিগ্রহণ ও রাস্তা নির্মাণ নিয়ে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা| নির্ধারিত মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ার পর এখন কাগজে-কলমে সামান্য অগ্রগতির দাবি করে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফএল)|

জ্বালানি বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর চাপ কমাতে এবং দেশীয় উত্তোলন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে দুই বছর মেয়াদি এই অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়| তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অগ্রাধিকার বিবেচনায় এই প্রকল্পের নীতিগত সমর্থন বজায় ছিল| কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত দুই বছরের সময়সীমা গত সেপ্টেম্বর মাসেই শেষ হয়ে গেছে| এই দীর্ঘ চব্বিশ মাসের মধ্যে যেখানে ভূগর্ভের হাজার হাজার মিটার গভীরে ড্রিলিং রিগ বসিয়ে গ্যাস অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফল পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে বাস্তবে কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের আইনি জটিলতাই এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো|

সরকারি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ তথা আইএমইডির সাম্প্রতিক সরেজমিন পরিদর্শনে এই প্রকল্পের করুণ ও হতাশাজনক চিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে| আইএমইডির হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত আর্থিক ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ| অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা এসজিএফএল কাগজে-কলমে বাস্তব অগ্রগতি ১৬ শতাংশ বলে দাবি করলেও মাঠের চিত্রে কোনো দৃশ্যমান সাফল্য নেই| প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৬ সালের আগস্টে শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে গিয়েও আইএমইডি দেখতে পায় যে, দুটি কূপের কোনোটির জন্যই খনন কাজের উপযোগী জমি আইনগতভাবে বুঝে নেওয়া সম্ভব হয়নি|

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতেই জমি সংগ্রহের ক্ষেত্রে এক মারাত্মক নীতিগত ভুলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল| এসজিএফএল প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষকদের ফসলি জমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়ে কিনে নেওয়ার বা অধিগ্রহণ করার বদলে সরকারি ক্ষমতাবলে সাময়িকভাবে ‘হুকুম দখল’ বা রিকুইজিশন করার পথ বেছে নেয়| কিন্তু নিজেদের পৈতৃক ও আবাদি জমিতে এমন একতরফা হুকুম দখলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানান সিলেটের স্থানীয় জমির মালিক ও কৃষকরা| জমির ন্যায্যমূল্য এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় স্থানীয়রা খনন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলেন| ফলে প্রকল্পের শুরু থেকেই বিরোধ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় পুরো সময়টিই স্থানীয়দের বাধা ও ক্ষোভ সামাল দিতে অপচয় হয়ে যায়| পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভায় হুকুম দখলের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয় এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিধিমোতাবেক স্থায়ী জমি অধিগ্রহণের নতুন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়| কিন্তু ততদিনে প্রকল্পের প্রায় দেড় বছর সময় কোনো কাজ ছাড়াই পার হয়ে গেছে|

আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের কাজের ধারা ও নিয়মভঙ্গ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে| সরকারি ক্রয় ও অবকাঠামো নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে বৈধভাবে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে কূপ এলাকায় পূর্তকাজ বা সিভিল কনস্ট্রাকশন শুরু করায় কড়া আপত্তি জানিয়েছে তদারকি সংস্থাটি| প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জমির মালিকানা নিশ্চিত না করে কাজ শুরু করায় আইনি জটিলতা আরও ঘনীভূত হয়েছে| এছাড়া খনন রিগ ও ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহন করার জন্য ডুপিটিলা-১ কূপের যে ৭৮৩ মিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক নির্মাণের কথা ছিল, দুই বছরে তার মাত্র ২৩২ মিটারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি ছোট সেতু| অবশিষ্ট ৫৫১ মিটার সড়কে কালভার্ট ও বড় সেতুর কাজ এখনো অসমাপ্ত পড়ে রয়েছে| অন্যদিকে কৈলাসটিলা-৯ কূপের অবস্থা আরও শোচনীয়; সেখানে ভূমি উন্নয়ন বা সাইট প্রিপারেশনের কোনো কাজই শুরু হতে পারেনি|

প্রকল্পের কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের জন্য এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ ছিল| ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার কথা প্রায় ৪১৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং বাকি ২৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা এসজিএফএলের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে| ভূপ্রকৃতিগতভাবে ডুপিটিলা কাঠামোয় ভূগর্ভের প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ মিটার এবং কৈলাসটিলায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত অত্যাধুনিক খননযন্ত্রের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালানোর নকশা চূড়ান্ত করা হয়| ভূতাত্ত্বিক জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কূপ দুটিতে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস পাওয়া গেলে উৎপাদনের প্রথম পাঁচ বছর প্রতিদিন গড়ে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে প্রতিদিন গড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে| অর্থাৎ ১০ বছরের জীবদ্দশায় এই দুই কূপ থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫৬ বিসিএফ গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি রয়েছে|

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূগর্ভ থেকে গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সার্বিক নিরাপত্তা প্রাচীর এবং স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা ছিল| কিন্তু একটি কূপ খনন শুরু করার মৌলিক পূর্বশর্ত হলো সুরক্ষিত জমি ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ পরিকাঠামো| সেই প্রাথমিক কাজগুলোই দুই বছরে প্রস্তুত না হওয়ায় কবে নাগাদ ভারী ড্রিলিং রিগ এনে মূল খনন শুরু করা যাবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে পেট্রোবাংলার ভেতরেই| প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হুকুম দখলের মতো অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তা মেটাতেই প্রকল্পের আয়ু শেষ হয়ে গেছে| এখন জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণ এবং নকশায় নতুন পরিবর্তন এনে পুরো প্রকল্পটিকে আবার নতুন করে সাজাতে হচ্ছে|

এই অচলাবস্থার মুখে প্রকল্পটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে এবং অতিরিক্ত দুই বছর সময় চেয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে একটি সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি পাঠিয়েছে এসজিএফএল| নানা দিক যাচাই-বাছাই শেষে আজ পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি বা পিইসির বিশেষ সভায় এই প্রস্তাবটি উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে|

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের তৈল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ উইংয়ের যুগ্ম প্রধান মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এসজিএফএলের পক্ষ থেকে নতুন ডিপিপি জমা পড়ার পর পিইসি বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে| তিনি বলেন, বৈঠকে মূলত খতিয়ে দেখা হবে প্রকল্পের প্রাথমিক নকশায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, কূপের খনন গভীরতা বা প্রযুক্তিতে কোনো রদবদল হয়েছে কি না এবং কেন নির্ধারিত দুই বছরে কোনো বাস্তব অগ্রগতি আনা সম্ভব হয়নি| অগ্রগতি যেহেতু অত্যন্ত সীমিত এবং নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে, তাই প্রকল্পটির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়তো অনিবার্য হয়ে পড়বে| তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সময় বাড়ানোর পাশাপাশি যদি নির্মাণ ও অধিগ্রহণ বাবদ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ও বেড়ে যায়, তবে এটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকের সভায় পাঠাতে হবে|

অন্যদিকে পেট্রোবাংলার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও জমি সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা যায়নি| তবে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার কোনো বিকল্প নেই| বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্ববাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনে যেখানে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে, সেখানে নিজেদের মাটির নিচের নিশ্চিত গ্যাস অনুসন্ধানে এমন চরম অপেশাদারিত্ব ও ধীরগতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না| স্থানীয়দের সঙ্গে স্বচ্ছ আলোচনা ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিয়ে অবিলম্বে জমি সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করলে এই দুই বছর বাড়ানোর মেয়াদও কেবল নথিপত্রের দেনা-পাওনাতেই হারিয়ে যাবে|

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category