তীব্র মূল্যস্ফীতি আর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়ের চাপে পিষ্ট হয়ে অবশেষে রাজপথে নেমে এসেছেন দেশের তৈরি পোশাক খাতের হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ| ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধি, বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে টানা কয়েকদিন ধরে যে শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে, তা দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী এই শিল্পের স্থিতিশীলতা নিয়ে এক গভীর ও বহুমুখী উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে| একদিকে শ্রমিক অধিকার কর্মীরা মনে করছেন যে, দ্রুত একটি স্বাধীন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়াই এই অস্থিরতা নিরসনের একমাত্র পথ| অন্যদিকে, কারখানা মালিকদের অভিযোগ হলো, সরকার ও মালিকপক্ষ ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্তে একমত হওয়ার পরও একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল সাধারণ শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে তাদের উসকে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে|
এই শ্রমিক অসন্তোষের সবচেয়ে বড় চিত্রটি দেখা গেছে রাজধানীর উত্তরা এলাকায়| সেখানে পোশাক শ্রমিকরা টানা চারদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন| তাদের প্রধান দাবি হলো, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে| এর পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বকেয়া বেতন অবিলম্বে পরিশোধ করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন| এই বিক্ষোভ কেবল উত্তরায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে গাজীপুরের মতো অন্যান্য বৃহৎ শিল্পাঞ্চলেও| শ্রীপুরে সি-স্টেজ (বিডি) লিমিটেডের এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন| তাদের অভিযোগ, কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে, অথচ তাদের সেপ্টেম্বর মাসের বেতন এখনো পরিশোধ করা হয়নি| পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বৃহস্পতিবার উত্তরায় মহাসড়ক অবরোধকারী শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে লাঠিচার্জ এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে দেখা গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে|
শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের মতে, এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভগুলো মূলত শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অপর্যাপ্ত মজুরি, বকেয়া পাওনা এবং চাকরির নিরাপত্তাহীনতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ মাত্র| এই ক্রমবর্ধমান শ্রমিক অসন্তোষের মুখে শ্রম অধিদপ্তর নড়েচড়ে বসেছে| গত বৃহস্পতিবার তারা বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনকে (বিইএফ) নিম্নতম মজুরি বোর্ডে নিয়োগের জন্য মালিকদের পক্ষ থেকে তিনজন উপযুক্ত প্রার্থীর নাম দ্রুত প্রস্তাব করার নির্দেশ দিয়েছে| এটি মূলত পোশাক শিল্পের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে বোর্ড পুনর্গঠনের একটি আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ| শ্রম অধিদপ্তরের পাঠানো ওই চিঠিতে ফেডারেশনকে প্রার্থীদের নাম, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জীবনবৃত্তান্তসহ অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে জমা দিতে বলা হয়েছে| এর আগে গত ১৪ অক্টোবর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর (২০২৬ সালে সংশোধিত) ১৩৮(২) এবং ১৩৮(৪) ধারার অধীনে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক পরিপত্র জারি করেছিল| নিয়ম অনুযায়ী, সরকার এই বোর্ডে একজন স্বাধীন সদস্য, মালিকদের একজন প্রতিনিধি এবং শ্রমিকদের একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করবে|
শ্রমিক নেতারা সরকারের এই মজুরি বোর্ড গঠনের প্রাথমিক উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তারা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তটি আরও অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল| অন্যদিকে কারখানা মালিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, পোশাক খাত ইতিমধ্যে নানামুখী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে, এর মধ্যে এমন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পুরো খাতটিকে পঙ্গু করে দিতে পারে| শ্রমিক নেতারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পুলিশি শক্তি প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে হয়তো শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু এতে তাদের মূল ক্ষোভ ও অভিযোগগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান হবে না, বরং তা ভবিষ্যতে আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে| উল্লেখ্য, পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড| দেশের প্রায় চার হাজার নিবন্ধিত কারখানায় ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন, যাদের সিংহভাগই নারী| সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় তিন হাজার আটশ সত্তর কোটি টাকার তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি করেছে|
এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষই, অর্থাৎ কারখানা মালিক ও শ্রমিক নেতারা একমত যে, মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে চলমান এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা পোশাক খাতকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে এবং এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র জাতীয় অর্থনীতির ওপর| এই সংকট সমাধানে আগামী ২৭ অক্টোবর পোশাক খাতের ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক কমিটির (টিসিসি) একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে| সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছেন মূলত পেটের দায়ে| বকেয়া পাওনা না দিয়েই অনেক কারখানা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমান শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের মজুরি সংশোধনের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে| তিনি জোর দিয়ে বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, তা না হলে তাদের মধ্যে যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা তৈরি হবে, তা চরম উত্তেজনার জন্ম দেবে| রতন আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ঘোষণার পর পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিটি যৌক্তিকতা পেয়েছে|
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন স্বপনও অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছেন| তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে| তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলো শ্রমিকদের সত্যিকারের প্রতিনিধিদের বদলে নিজেদের পছন্দমতো অনুগত লোকদের বোর্ডে বসিয়েছিল| স্বপন জানান, আইবিসি-সহ মোট ছয়টি শ্রমিক প্ল্যাটফর্ম আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি অভিন্ন ও সর্বসম্মত ন্যূনতম মজুরি দাবির খসড়া তৈরি করবে এবং সেটি সরকারের কাছে জমা দেবে| তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমানে যে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির কথা শোনা যাচ্ছে, তা এখনো এই ছয়টি প্ল্যাটফর্মের যৌথ দাবি হিসেবে চূড়ান্ত হয়নি|
বাংলাদেশ শ্রম আইনের সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী, পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে| বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি হলো ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারণ করা হয়েছিল| সেই হিসাবে আগামী ডিসেম্বরে এই মজুরির মেয়াদ তিন বছর পূর্ণ হবে| শ্রমিক নেতারা বলছেন, বোর্ড গঠন, আলোচনা, সুপারিশ জমা দেওয়া এবং চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়, তাই এখনই বোর্ড গঠন করা অত্যন্ত জরুরি| বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) বর্তমান সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, পোশাক শিল্পের মালিকরাও একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠনকে স্বাগত জানান| তবে তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের এতসব উদ্যোগের পরও কিছু লোক ইচ্ছাকৃতভাবে শিল্পের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছে| তিনি আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিকদের দাবি যদি সত্যিই মজুরি বৃদ্ধি হয়, তবে সরকারের ঘোষণার পর এই অস্থিরতা দ্রুত প্রশমিত হওয়া উচিত|