• সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন
Headline
খেলাপি ঋণের রেকর্ড ও শীর্ষ নির্বাহীদের গ্রেফতার: ব্যাংকের চাকরিতে মেধাবীদের অনাগ্রহ ক্যাম্পাসে র‍্যাগিংয়ের শিকার ৭৪% শিক্ষার্থী বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বে আর কোথাও নেই: রাষ্ট্রপতি সওজের ৪০০ স্থাপনায় বসছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল রুফটপ সোলারে অর্থায়নে ইডকল ও সরকারের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি জাল সনদ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চায় এপিইউবি ৩২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পেল ২৫৩ ইউনিয়ন পরিষদ বিএনপির মুখে হচ্ছে জুলাই সনদ আর অন্তরে আ. লীগ: হাসনাত ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলো গ্রামীণ কল্যাণ সেনাসদস্যদের ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন: সাভারে প্রধানমন্ত্রী

ক্যাম্পাসে র‍্যাগিংয়ের শিকার ৭৪% শিক্ষার্থী

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

উচ্চশিক্ষার আঙিনায় মুক্তচিন্তার বিকাশ, মানবিক মর্যাদা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণ-তরুণীরা প্রবেশ করেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তা প্রায়ই পদদলিত হচ্ছে এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতির যাঁতাকলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জুনিয়রদের প্রতি স্নেহের স্বাভাবিক সম্পর্কের বিপরীতে গড়ে উঠেছে তথাকথিত ‘ম্যানার’ বা আদবকায়দা শেখানোর অপসংস্কৃতি। নতুন পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ছলে কিংবা আনন্দ-উচ্ছ্বাসের নামে নবীন শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে রাতভর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালানো এখন এক সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দেশের একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ এই অন্ধকার চিত্রটিকে আবারও সমাজের সামনে উন্মোচিত করেছে। গত আটই অক্টোবর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি পিকনিকের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে প্রথম বর্ষের কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীকে একটি নির্জন কক্ষে ডেকে নেন তাদেরই জ্যেষ্ঠ ছাত্রীরা। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে নবীনদের ওপর অহেতুক ধমকাধমকি ও কঠোর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। জ্যেষ্ঠরা সেখানে নবাগত ছাত্রীদের বিভিন্ন চতুষ্পদ প্রাণীর মতো করে দশটি ভিন্ন ভিন্ন ডাক অনুকরণ করতে বাধ্য করেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে কীভাবে চলাচল করতে হবে, সহপাঠী তরুণদের সঙ্গে মেলামেশা করা যাবে কি না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাদের বন্ধু হওয়ার অনুরোধ পাঠানো যাবে—এসব ব্যক্তিগত বিষয়ে দীর্ঘ সময় জেরা করা হয়। মানসিক চাপের তীব্রতায় একপর্যায়ে এক নারী শিক্ষার্থী প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এর কিছুদিন আগেই চারই জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একদল শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যরাতে ডেকে গালাগাল করা, জোরপূর্বক কান ধরিয়ে রাখা এবং শারীরিক-মানসিক নিপীড়নের অভিযোগে বারো জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাত্যহিক বাস্তবতার এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি মাত্র।

শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান এই অসুস্থ মানসিকতা ও নিপীড়নের গভীরতা পরিমাপ করতে দেশ-বিদেশের একদল গবেষক সম্প্রতি এক বিশদ ও সমন্বিত অনুসন্ধান পরিচালনা করেছেন। গবেষণাটির ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। জরিপে অংশ নেওয়া উচ্চশিক্ষার প্রায় চুয়াত্তর শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে তারা নিজেদের শিক্ষাজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে র‍্যাগিং কিংবা বুলিংয়ের নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিং: মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সাফল্যের ওপর প্রভাব’ শীর্ষক এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি গত জুন মাসে বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশন’-এর চব্বিশতম খণ্ডের তৃতীয় সংখ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। এর আগে গত বছর সাময়িকীটির অনলাইন সংস্করণে গবেষণার প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সাতান্নটি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আঠারো থেকে পঁচিশ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ওপর দুই হাজার চব্বিশ সালের চব্বিশে মার্চ থেকে তেরোই জুলাই পর্যন্ত নিবিড়ভাবে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষকরা শুরুতে নয় হাজার পাঁচশত একাত্তর জন শিক্ষার্থীর উত্তর সংগ্রহ করেছিলেন। তবে অসম্পূর্ণ তথ্যসমৃদ্ধ সাতানব্বইটি উত্তর বাতিল করার পর অবশিষ্ট নয় হাজার চারশত চুয়াত্তর জনের তথ্য চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য সংরক্ষণ করা হয়। এদের মধ্য থেকে দুই হাজার চারশত তেষট্টি জন শিক্ষার্থী জানান যে তারা কখনো র‍্যাগিংয়ের শিকার হননি। বাকি সাত হাজার এগারো জন ভুক্তভোগীর তথ্য বিশদভাবে ব্যবচ্ছেদ করে গবেষক দল এই ভয়াবহ চিত্রটি নথিবদ্ধ করেছেন। গবেষণায় বুলিং শব্দটিকে সামগ্রিক অর্থে ব্যবহার করে এর আওতায় মৌখিক বিদ্রুপ, সামাজিকভাবে কোণঠাসা ও হেয়প্রতিপন্ন করা, সরাসরি শারীরিক নির্যাতন, ডিজিটাল মাধ্যমে সাইবার হেনস্তা এবং যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গবেষণার প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে লিঙ্গভেদে বুলিংয়ের তীব্রতায় বেশ লক্ষণীয় পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী সাত হাজার এগারো জন ভুক্তভোগীর মধ্যে চার হাজার নয়শত পঁচাশি জন ছিলেন পুরুষ শিক্ষার্থী, যা মোট সংখ্যার একাত্তর দশমিক এক শতাংশ। অন্যদিকে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ছাব্বিশ জন বা আটাশ দশমিক নয় শতাংশ। সামগ্রিক তীব্রতার মানদণ্ডে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের নয় দশমিক সাত শতাংশ অত্যন্ত সামান্য মাত্রার এবং তেত্রিশ শতাংশ মৃদু মাত্রার বুলিংয়ের কথা জানিয়েছেন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ পঁয়তাল্লিশ দশমিক চার শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে তারা মাঝারি মাত্রার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর এগারো দশমিক নয় শতাংশ শিক্ষার্থী শিকার হয়েছেন মারাত্মক বা গুরুতর মাত্রার র‍্যাগিংয়ের। পুরুষ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বায়ান্ন দশমিক এক শতাংশ মাঝারি মাত্রার এবং সাত দশমিক দুই শতাংশ গুরুতর মাত্রার নিপীড়নের কথা উল্লেখ করেছেন। নারীদের মধ্যে সাঁইত্রিশ দশমিক এক শতাংশ মৃদু মাত্রার হয়রানির কথা জানালেও অত্যন্ত ভয়াবহ তথ্য হলো, নারীদের ক্ষেত্রে গুরুতর পর্যায়ের বুলিংয়ের হার প্রায় তেইশ দশমিক তিন শতাংশ। অর্থাৎ পুরুষদের তুলনায় নারী শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে তিন গুণেরও বেশি হারে চরম ও প্রাণঘাতী নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

উচ্চশিক্ষার ধরন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অভিজ্ঞতার ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছয় হাজার ছয়শত সাতাশি জন বা পঁচানব্বই দশমিক চার শতাংশই ছিলেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন মাত্র তিনশত চব্বিশ জন বা চার দশমিক ছয় শতাংশ। প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরদাতাদের মধ্যে বারো দশমিক তিন শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের ওপর পরিচালিত বুলিংকে চরম বা গুরুতর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর বিপরীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র দুই দশমিক আট শতাংশ। অবশ্য গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন যে, এই গবেষণায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নমুনা সংখ্যার মধ্যে বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। ফলে এই প্রাথমিক ফলাফল দিয়ে এখনই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সার্বিক তুলনামূলক পরিস্থিতি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না। তবে সার্বিকভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিক হলের পরিবেশ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে র‍্যাগিংয়ের প্রবণতা যে অনেক বেশি স্থায়ী ও তীব্র, তা সহজেই অনুমেয়।

শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত বুলিংয়ের ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী শিকার হন মৌখিক লাঞ্ছনা ও বিদ্রুপের। প্রায় পঁচাশি দশমিক ছয় শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সিনিয়র বা সহপাঠীদের কটূক্তি ও টিজিং তাদের আত্মসম্মানবোধকে ধূলিসাৎ করেছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগে হেয় করা বা সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখার মতো নিপীড়নের শিকার হয়েছেন আটান্ন দশমিক নয় শতাংশ তরুণ। বর্বরোচিত শারীরিক প্রহার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বত্রিশ দশমিক ছয় শতাংশ শিক্ষার্থী। প্রযুক্তিগত বিকাশের যুগে অনলাইন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন ত্রিশ দশমিক পাঁচ শতাংশ। সব ছাপিয়ে চরম লজ্জাজনক বিষয় হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চার দশমিক চার-তিন শতাংশ শিক্ষার্থী সরাসরি যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। একজন উত্তরদাতা একাধিক ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে পারায় এই হিসাবগুলোর সম্মিলন শতভাগ ছাড়িয়ে গেছে।

কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এই ধরনের অমানবিক আচরণ টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, তার মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধানে নেমে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন গবেষকরা। উত্তরদাতাদের পঁচাত্তর দশমিক নয় শতাংশই একবাক্যে জানিয়েছেন যে, জুনিয়রদের ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই র‍্যাগিংয়ের প্রধান উদ্দেশ্য। এর বাইরে চৌষট্টি দশমিক সাত শতাংশ বিষয়টিকে কেবল নিছক মজা বা উপহাস হিসেবে দেখেন। সাতান্ন দশমিক ছয় শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সিনিয়রদের নিজেদের জীবনের অতীতে ঘটা অপমানের ক্ষোভ ও প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা থেকেই নতুনদের ওপর এই আক্রোশ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। উনিশ দশমিক ছয় শতাংশ শিক্ষার্থী গায়ের রঙ, শারীরিক গঠন বা পোশাকের কারণে লাঞ্ছনার শিকার হন। মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে পনেরো দশমিক নয় শতাংশ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা জাতিগত পরিচয়ের কারণে যথাক্রমে পাঁচ দশমিক নয় ও এক দশমিক সাত শতাংশ শিক্ষার্থী বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। র‍্যাগিংয়ের এই মানসিক ক্ষত সাময়িক নয়। গবেষকরা দেখেছেন, তেত্রিশ দশমিক দুই শতাংশ শিক্ষার্থী একটানা ছয় মাস ধরে এবং একত্রিশ দশমিক চার শতাংশ শিক্ষার্থী পুরো এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

এই দীর্ঘমেয়াদি লাঞ্ছনার প্রভাব শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা বিধ্বংসী হতে পারে, তা পরিমাপ করা হয়েছে দুটি সর্বজনীন চিকিৎসা মানদণ্ডের সাহায্যে। উদ্বেগের উপসর্গ মূল্যায়নে ‘জিএডি-সেভেন’ এবং বিষণ্নতার গভীরতা পরিমাপে ‘পিএইচকিউ-নাইন’ স্কেল ব্যবহার করেন গবেষকরা। তথ্যে দেখা যায়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের চুয়াল্লিশ দশমিক দুই শতাংশ মৃদু এবং চল্লিশ দশমিক নয় শতাংশ মাঝারি মাত্রার সার্বক্ষণিক উদ্বেগে ভুগছেন। দশ দশমিক ছয় শতাংশ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে উদ্বেগের মাত্রা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বা গুরুতর। একইভাবে বিষণ্নতার স্কেলে দেখা গেছে, বিয়াল্লিশ দশমিক এক শতাংশ মাঝারি, চব্বিশ দশমিক এক শতাংশ মৃদু এবং বাইশ দশমিক আট শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতায় নিমজ্জিত রয়েছেন। চরম বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া গেছে নয় দশমিক দুই শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে। এই সমীক্ষা নিশ্চিত করেছে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‍্যাগিংয়ের শিকার হওয়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতার সরাসরি গভীর সংযোগ রয়েছে।

মানসিক বিপর্যয়ের সেই প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ফলাফলেও। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চৌষট্টি দশমিক আট শতাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের শিক্ষাগত অর্জনকে সাধারণ বা গড়পড়তা বলে উল্লেখ করেছেন। তবে বুলিংয়ের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষায় খারাপ ফলের হার কীভাবে নাটকীয়ভাবে বাড়ে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে উপাত্তে। গুরুতর মাত্রার র‍্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের প্রায় সাতচল্লিশ দশমিক পাঁচ শতাংশই জানিয়েছেন যে তাদের অ্যাকাডেমিক ফলাফল চরমভাবে খারাপ হয়েছে। অথচ মৃদু মাত্রার বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে খারাপ ফলের হার ছিল মাত্র ছয় দশমিক তিন শতাংশ এবং মাঝারি ক্ষেত্রে তা চব্বিশ দশমিক এক শতাংশ। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারকে র‍্যাগিং নামক বিষবাষ্প কতটা নিঃশেষ করে দিতে পারে, এই পরিসংখ্যান তার স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয়।

এত বড় মানবিক বিপর্যয় সত্ত্বেও দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে চরম শূন্যতা। গবেষণার একটি অন্যতম পীড়াদায়ক তথ্য হলো, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের প্রায় تہাত্তর দশমিক আট-এক শতাংশই জানিয়েছেন যে তারা নির্যাতনের শিকার হয়েও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ জমা দেননি। মাত্র ছাব্বিশ দশমিক এক-নয় শতাংশ শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার সাহস দেখিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে শিক্ষাঙ্গনে অভিযোগ বাক্স বা প্রতিকারের যেসব ব্যবস্থা রয়েছে, তার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থার মারাত্মক সংকট রয়েছে। অভিযোগ করলে উল্টো প্রতিশোধমূলক হামলার ভয়, প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রতা এবং শিক্ষকদের নিষ্ক্রিয়তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে নীরবে সবকিছু সহ্য করতে বাধ্য করে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। প্রায় একাশি দশমিক দুই শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, র‍্যাগিংয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের মতো আপসহীন ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। উনসত্তর দশমিক আট শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া ক্যাম্পাসের উন্মুক্ত সাধারণ জায়গাগুলো সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে রাখা এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত হস্তক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছেন যথাক্রমে সাতান্ন দশমিক এক ও তিপ্পান্ন দশমিক দুই শতাংশ উত্তরদাতা। অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ভুক্তভোগীদের মনোসামাজিক ও আইনি সহায়তার ওপর জোর দিয়েছেন। একত্রিশ দশমিক চার শতাংশ অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা এবং তেইশ দশমিক নয় শতাংশ ক্ষেত্রবিশেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপের সুপারিশ করেছেন।

উচ্চশিক্ষাঙ্গনে আলোড়ন তোলা এই গবেষণাকর্মটির সার্বিক নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির বিশিষ্ট শিক্ষক ডক্টর শাফায়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে আন্তর্জাতিক এই যৌথ গবেষণা প্রকল্পে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন রিফাত রায়হান রাফি, নাকিব ইসতিয়াক লাবিব, ফারহিন ইসলাম, রাজিযা সুলতানা, মাহদি হাসান, অর্পা সিকদার ইতি, নাইমাতুন জান্নাত, কাওসার মাহমুদ নাবিন, আল আমিন, রেদোয়ান আহমেদ, তানজিম ইসলাম এবং চীনের চাংঝু ইউনিভার্সিটির তরুণ গবেষক মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান। ডক্টর শাফায়াত হোসেন এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কেবল শাস্তি দিয়ে এই অন্ধত্ব দূর করা যাবে না, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমন্বিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা করতে হবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট ও কঠোর জাতীয় নীতিমালা তৈরি করে তাতে মৌখিক উপহাস থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি পর্যন্ত প্রতিটি আচরণকে র‍্যাগিংয়ের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করতে হবে এবং প্রতিটি অভিযোগকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মেধা বিকাশের পীঠস্থান না হয়ে নিপীড়ক তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category