• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন
Headline
উন্নয়নের মরীচিকা ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: প্রতিশ্রুতির আড়ালে একই খাদের কিনারে অর্থনীতি মোংলা বন্দর ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী আমি শোকর করি, কারণ… রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন, ৪০ রোগী আহত পিএইচপির ত্রুটি: ঝুঁকিতে লাখো ওয়েবসাইট, বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন, ঘণ্টায় গতিবেগ ২২৭ কিলোমিটার ৫৯২ কোটি টাকায় দুই কূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ‘বিপুল গ্যাস’ প্রধানমন্ত্রীর সফরে টোকিওতে থাকবেন না রাষ্ট্রদূত, সমন্বয়ে পররাষ্ট্রসচিব রূপগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত, আহত ৩ ৭ দল নিয়ে ‘সমমনা ইসলামী দল’ ঘোষণা, একসঙ্গে চলার অঙ্গীকার

ভাতের চেয়ে তালিকার খরচ বেশি: দরিদ্র খুঁজতে ২ হাজার কোটি

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা অভুক্ত ও অসহায় মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা প্রদান করা। কিন্তু বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষার সরকারি নথিপত্র ও বাজেট বরাদ্দের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এক চরম বৈপরীত্য ও আত্মঘাতী বাস্তবতা। যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষের ভাতের সংস্থানের চেয়ে তাদের নাম খুঁজে তালিকায় তোলার পেছনেই রাষ্ট্রের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ খরচ হয়ে যাচ্ছে। দরিদ্র মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চেয়ে তাদের শনাক্ত করার প্রশাসনিক ও প্রচারণামূলক প্রক্রিয়াতেই যেন ব্যয়ের মহোৎসব বসেছে। সরকারি নথির হিসাব কষে দেখা যায়, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় উপকারভোগীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত ও কার্ড তৈরির নামে সরকারের দুই মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পৃথক দুটি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ। যে বিপুল অর্থ দিয়ে দেশের অন্তত আট লাখ দরিদ্র পরিবারকে পুরো এক মাসের পারিবারিক কার্ডের সম্পূর্ণ নগদ সহায়তা দেওয়া সম্ভব হতো, সেই অর্থ খরচ হয়ে যাচ্ছে নিছক তালিকা প্রণয়ন, যন্ত্র কেনাকাটা এবং পরামর্শকদের টেবিলে।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেস তৈরির নামে বর্তমানে সরকারের দুটি পৃথক মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ সমান্তরালভাবে দুটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর একটি পরিচালনা করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অপরটি বাস্তবায়ন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উভয় প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও কার্যপরিধি প্রায় একই—দেশের দরিদ্র পরিবারের তালিকা প্রস্তুত এবং গতিশীল সামাজিক নিবন্ধন বা সোশ্যাল রেজিস্ট্রি তৈরি করা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় শুরুতে ছিল মাত্র ৯০৪ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে এর সঙ্গে বহুল আলোচিত ‘পারিবারিক কার্ড’ বা ফ্যামিলি কার্ড তৈরির কার্যক্রম যুক্ত করে প্রকল্পটির বাজেট অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। অর্থাৎ কেবল তালিকা তৈরি ও কার্ড বিতরণের নামেই অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে একই দরিদ্র মানুষকে খুঁজতে অর্থ বিভাগ সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ‘সামাজিক সুরক্ষা ডিজিটাল রূপান্তর’ শীর্ষক আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৬ কোটি টাকা। একই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করতে দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়, পৃথক সার্ভার ব্যবস্থা এবং আলাদা প্রশাসনিক বিল তৈরির এই দ্বৈততা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের এক নির্মম দৃষ্টান্ত।

প্রকল্প দুটির অভ্যন্তরীণ খাতওয়ারি ব্যয় বিশ্লেষণ করলে অর্থ বরাদ্দের চরম অসংগতি ও অপচয়ের চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহকারীদের পারিশ্রমিক বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮২১ কোটি টাকা। আর পারিবারিক কার্ড তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ যন্ত্রপাতির পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫০ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বড় চমক ও সমালোচনার বিষয় হলো পরামর্শক খাতে বিপুল বরাদ্দ। এই প্রকল্পে ১৮টি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে ফি বাবদ দেওয়া হচ্ছে ১৮৮ কোটি টাকা এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তি পরামর্শকদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে আরও ৪০ কোটি টাকা। এছাড়া কর্মীদের প্রশিক্ষণের নামে ৮০ কোটি টাকা, ভ্রমণ ভাতা খাতে ১০ কোটি টাকা এবং দরিদ্র মানুষ খোঁজার কার্যক্রমে ‘উৎসব’ শিরোনামের এক নজিরবিহীন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে অর্থ বিভাগের ২১৬ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যেও সিংহভাগ অর্থাৎ ৬৮ কোটি টাকাই চলে যাচ্ছে পরামর্শক খাতের পেটে। দরিদ্র মানুষের কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছানোর আগেই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরামর্শক ও আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতার পেছনে যেভাবে বরাদ্দ করা হয়েছে, তা নিয়ে স্বয়ং সরকারি পরিকল্পনা কমিশনও তীব্র আপত্তি ও প্রশ্ন তুলেছে।

এই বিলাসী ব্যয়ের চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক বিষয় হলো অর্থের উৎস। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকাই নেওয়া হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে চড়া সুদের বৈদেশিক ঋণ হিসেবে। একইভাবে অর্থ বিভাগের ২১৬ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ৯৭ কোটি টাকা সরাসরি বিদেশি ঋণ। ফলে তালিকা তৈরি ও পরামর্শকদের পেছনে অপচয় হওয়া এই বিপুল ঋণের আসল ও সুদের বোঝা আগামী বহু বছর ধরে সাধারণ করদাতাদেরই টানতে হবে। অথচ ঋণের এই কঠিন শর্তযুক্ত প্রকল্পে কোন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কীভাবে নির্বাচিত হচ্ছে এবং তারা রাষ্ট্রীয় নীতিতে কী ভূমিকা রাখছে, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব প্রকল্প দলিলে স্পষ্ট করা হয়নি। মাঠপর্যায়ের কাজের খরচের দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকার সারা দেশে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন গণনাকারী এবং তাঁদের কাজের তদারকির জন্য ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দিয়েছে। গত ১২ অক্টোবর থেকে তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিটি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের জন্য একজন গণনাকারী পাচ্ছেন ১৬৫ টাকা এবং সুপারভাইজার পাচ্ছেন ৩০ টাকা। সেই হিসেবে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৭৩৫ কোটি টাকার মতো। কিন্তু প্রকল্পের বাকি প্রায় এক হাজার কোটি টাকাই খরচ হয়ে যাচ্ছে ঢাকায় বসে যন্ত্রপাতি কেনা, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং উৎসব উদযাপনের পেছনে।

এই পর্বতসম ব্যয়ের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি ‘পারিবারিক কার্ড’। এই কার্ডের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আগামী চার বছরের মধ্যে সারা দেশের মোট ২ কোটি দরিদ্র পরিবারকে নিয়মিত সহায়তার আওতায় আনা হবে, যার পেছনে সরকারের মোট ব্যয় হবে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেই প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক নারীর ব্যাংক বা মোবাইল ওয়ালেটে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু প্রকল্পের পাইলট বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রমেই মারাত্মক ত্রুটি ও অনিয়ম ধরা পড়েছে। বগুড়ায় পরিচালিত পাইলট প্রকল্পে ১ লাখ ৯ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে ৭৭ হাজার পরিবারকে যোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে চূড়ান্ত যাচাইয়ে ধরা পড়ে যে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত অন্তত ছয় হাজার পরিবারেই সরকারি চাকরিজীবী কিংবা নিয়মিত পেনশনভোগী সদস্য রয়েছেন। অর্থাৎ প্রাথমিক তালিকাতেই ভুলের হার ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ, যা সামাজিক সুরক্ষার সঠিক লক্ষ্যভিত্তিক বাছাই প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

তালিকা তৈরির নামে এমন আর্থিক অপচয় ও অকার্যকারিতার ইতিহাস দেশে নতুন নয়। এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জাতীয় খানা ডেটাবেস’ তৈরির এক মেগা প্রকল্প শুরু করেছিল। দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যখন প্রকল্পটি শেষ হয়, তখন এর পেছনে সরকারের খরচ হয়েছিল ৬৪২ কোটি টাকা, যা অন্য এক হিসাবে ছিল ৭২৭ কোটি টাকা। সারা দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি পরিবারের বাড়ি বাড়ি ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা সত্ত্বেও সেই বিশালাকার ডেটাবেস আজও কোনো কার্যকর ব্যবহারে আসেনি। সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ বা আইএমইডি তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে তথ্য সংরক্ষণের উপযুক্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকা এবং দফায় দফায় ডেটা স্থানান্তরের কারণে সংগৃহীত তথ্যের একটি বড় অংশ পুরোপুরি বিকৃত ও ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। এমনকি ১৪টি জেলার তথ্য সংশোধনের দায়িত্ব পাওয়া ভারতীয় কোম্পানি জেরক্স ইন্ডিয়া ১১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে কাজ অসমাপ্ত রেখেই ৫০টি জেলার কাজ ফেলে চলে যায়। সেই ভুলের কোনো বিচার বা মূল্যায়ন না করেই ২০২৪ সালে বিবিএস আবারও শুধু দুটি জেলার জন্য ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প চায় এবং চলতি ২০২৬ সালে এসে একই কাজের জন্য দুটি মন্ত্রণালয় আবার মাঠে নেমেছে।

এখানে সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক এখতিয়ার নিয়ে। জাতীয় যেকোনো তথ্য ও পরিসংখ্যান সংগ্রহের মূল আইনি দায়িত্ব বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর। পরিসংখ্যান বিভাগ দাবি করেছে যে তাদের এই ধরনের জরিপ করার পূর্ণ কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সরকার সেই সংস্থাকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে জরিপ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে, যাদের মূল কাজ কেবল মাঠপর্যায়ে সরকারি ভাতা বিতরণ করা। যার কাজ পরিসংখ্যান তাকে বাইরে রেখে অদক্ষ সংস্থাকে দিয়ে জরিপ করানোর ফলে ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন নম্বর, ব্যক্তিগত আয়, জমির পরিমাণ এবং বসতবাড়ির জিপিএস লোকেশন ও লাইভ ছবির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এত বিশাল নাগরিক তথ্যভাণ্ডার কোথায় সংরক্ষিত থাকবে, এর সাইবার নিরাপত্তা কে দেবে এবং তথ্য ফাঁস হলে তার দায় কে নেবে—তার কোনো সুস্পষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থা প্রকল্প দলিলে রাখা হয়নি।

প্রকল্পের সুবিধাভোগী বাছাইয়ের নীতিতেও রয়েছে গভীর লিঙ্গবৈষম্যমূলক অসঙ্গতি। মুখে বলা হচ্ছে পরিবারের প্রধান নারীর নামে কার্ড ও নগদ টাকা দেওয়া হবে, যা আপাতদৃষ্টিতে নারীর ক্ষমতায়ন মনে হতে পারে। কিন্তু একজন নারী এই কার্ড পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নির্ধারণের মানদণ্ড রাখা হয়েছে তাঁর পরিবারের পুরুষ সদস্যদের চাকরি, পেনশন, আয়কর প্রদান কিংবা যানবাহনের মালিকানার ওপর। ফলে স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা অসহায় কোনো নারী যদি বাধ্য হয়ে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন এবং সেই বাড়িতে দূর সম্পর্কের কোনো সরকারি চাকরিজীবী থাকেন, তবে সেই নারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাবেন। ফলে নারীর মৌলিক অধিকারকে আবারও পরিবারের পুরুষের সম্পদের মাপকাঠিতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর ওপর তথ্য সংগ্রহের কাজ আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও গত ১০ অক্টোবর থেকেই মাঠপর্যায়ে কার্ড বিতরণ শুরু হয়ে গেছে। অর্থাৎ তথ্য যাচাই-বাছাই ও নির্ভুল তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কার্ড বিতরণ শুরু হয়ে যাওয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে।

দরিদ্র মানুষের সঠিক তালিকা তৈরিতে এই ব্যর্থতার চড়া মাশুল পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘অক্টোবর ২০২৬ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে দেশের সামাজিক সুরক্ষার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ২০২২ সালে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের প্রায় অর্ধেকই কোনো প্রকার সরকারি সামাজিক ভাতা বা সহায়তা পায়নি। অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত ৩৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো সরকারি ভাতা অবৈধভাবে ভোগ করেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাজেটে নতুন কোনো অর্থ বরাদ্দ না বাড়িয়ে কেবল প্রকৃত দরিদ্রদের সঠিকভাবে বাছাই করতে পারলে দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব, যার মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ চরম দরিদ্র মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে দারিদ্র্যসীমা থেকে মুক্তি পেতে পারে। অর্থাৎ সংকট অর্থের নয়, সংকট হলো সঠিক মানুষ নির্বাচনের সদিচ্ছার।

হিসাব অনুযায়ী, ১ কোটি ৩৫ লাখ দরিদ্র মানুষ খুঁজে বের করার জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, যা মাথাপিছু ব্যয় হিসেবে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩২৮ টাকা। অথচ এই এক হাজার ৩২৮ টাকা দিয়ে একজন অতিদরিদ্র মানুষ পারিবারিক কার্ডের পুরো ১৫ দিনের ভাতার সমপরিমাণ চাল ও খাদ্য সংগ্রহ করতে পারতেন। এর সাথে যোগ হয়েছে কার্ড থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের চরম ভৌগোলিক ও ব্যাংকিং জটিলতা। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের মানুষ, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল রয়েছে কিংবা যাদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নেই, তারা কীভাবে এই ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধার টাকা তুলবেন, তার কোনো সহজ সমাধান নেই। বিগত দিনে টিসিবির হাতে লেখা কার্ডে যেমন একই ব্যক্তি ঢাকা ও গ্রামে একাধিক কার্ড নিয়ে সুবিধা লুটেছে, তেমনি এবার সার্ভার জটিলতা ও ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে প্রকৃত গরিব মানুষই বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৬ সালে এসেও যখন প্রান্তিক মানুষের ভাতের নিশ্চয়তা না দিয়ে তাদের নাম খোঁজার নামে হাজার কোটি টাকার উৎসব ও পরামর্শক বিলের বাজেট অনায়াসে পাস হয়ে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সামাজিক নিরাপত্তা এখন গরিবের চেয়ে সুবিধাভোগী আমলা ও পরামর্শকদের পকেট ভারী করার বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category