ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরেই সমাপ্ত হতে চলায় দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে এই চুক্তি নবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে প্রতিবেশী রাজ্য বিহার। দীর্ঘকাল ধরে বিহারের রাজনৈতিক মহল ও রাজ্য সরকার দাবি করে আসছে যে বর্তমান চুক্তির কারণে তাদের নিজস্ব পানির চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদী জলনিরাপত্তা মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন জনতা দল ইউনাইটেড বা জেডিইউর শীর্ষস্থানীয় নেতারা চুক্তি নবায়নের পূর্বে রাজ্যটির জন্য পর্যাপ্ত পানির সুনির্দিষ্ট হিস্যা নিশ্চিত করার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছেন। এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও বিশেষজ্ঞদের ভিন্নধর্মী মতামতের জেরে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের পুরো বিষয়টি এখন এক জটিল ভূরাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছে।
আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে উজানের দেশ ভারত এবং ভাটির দেশ বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি সুষমভাবে ভাগাভাগি করার জন্য এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের মাসগুলোতে যখন গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, তখন এই চুক্তির ফর্মুলা অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন করা হয়ে থাকে। চুক্তি অনুযায়ী বছরের নির্দিষ্ট মাসগুলোতে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য পানির পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে যদি ফারাক্কায় পানির প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায়, তবে দুই দেশ সমান ভাগে পানি পাবে। আর প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে এবং বাকি অংশ পাবে ভারত।
চুক্তির শর্তে আরও উল্লেখ রয়েছে যে প্রবাহ যদি ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হয়, তবে ভারত অবধারিতভাবে ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার অধিকারী হবে এবং অবশিষ্ট সমস্ত পানি পাবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে এপ্রিল মাসের প্রথম ও শেষ দশ দিনে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট করে ৩৫ হাজার কিউসেক এবং মাঝের দশ দিনে ২৭ হাজার ৬৩৩ কিউসেক পানি দেওয়ার গ্যারান্টি রাখা হয়েছে। কখনো যদি টানা দশ দিন ধরে গঙ্গার প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায়, তবে জরুরি ভিত্তিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসে পরিস্থিতি অনুযায়ী পানি বণ্টনের উপায় বের করবেন। কিন্তু দীর্ঘ এই সময় ধরে চলা পানি বণ্টনের এই বন্দোবস্ত নিয়ে বিহারের শাসকগোষ্ঠী তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে এবং তাদের দাবি হলো এই চুক্তির কারণে রাজ্যটির পানিসম্পদ চরম সংকটের মুখে পড়ছে।
গত ৬ আগস্ট ভারতের রাজ্যসভায় দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে বিহারের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও জেডিইউ সংসদ সদস্য সঞ্জয় ঝা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন যে রাজ্যটির দীর্ঘমেয়াদী জলনিরাপত্তা, কৃষি সেচ, শিল্পায়ন এবং পানীয় জলের চাহিদা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে যদি চুক্তি নবায়ন করা হয়, তবে তা বিহারের মৌলিক স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী হবে। বিহার সরকারের পুরোনো যুক্তি অনুযায়ী, গঙ্গার সমগ্র অববাহিকার মাত্র ষোলো শতাংশ এই রাজ্যের সীমানার মধ্যে অবস্থিত হলেও শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারাজে প্রয়োজনীয় পানির অর্ধেক সরবরাহের গুরুভার এই রাজ্যের ওপর চেপে বসে। রাজ্যটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক ডজনেরও বেশি উপনদী গঙ্গায় মিলিত হয় এবং সেই প্রবাহ থেকেই ফারাক্কার চাহিদা মেটানো হয়।
ইতিপূর্বে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকারের আয়োজিত এক বিশেষ কর্মসূচিতে বিহারের তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী রাজীব রঞ্জন সিং দাবি করেছিলেন যে বক্সার জেলার চৌসা দিয়ে যখন গঙ্গা বিহারে প্রবেশ করে, তখন সেখানে পানির প্রবাহ থাকে মাত্র চৌদ্দ হাজার কিউসেকের কাছাকাছি। অথচ ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির শর্ত পূরণ করতে গিয়ে ফারাক্কায় ন্যূনতম বাহান্ন হাজার কিউসেকের বেশি পানি বজায় রাখার জাতীয় দায়িত্ব অদ্ভুতভাবে বিহারের কাঁধে এসে বর্তায়। এমনকি বিহার রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নথিপত্রে দেখা গেছে যে শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে বক্সারে গঙ্গার প্রবাহ কমে মাত্র চার শ কিউসেকে ঠেকে, যা কল্পনার বাইরে।
বিহারের এই দাবির বিপরীতে দেশের স্বাধীন নদী গবেষক ও জলবিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার নদী ও মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশিষ্ট গবেষক এবং স্যান্ড্রপের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্কার দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন যে ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে বিহারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে মর্মে রাজ্য সরকার যে দাবি করে আসছে, তার পক্ষে কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বা ভিত্তি নেই। তিনি মনে করিয়ে দেন যে বিহারের ভেতর গঙ্গার ওপর বড় কোনো বাঁধ বা জলাধার নেই যেখানে রাজ্য সরকার পানি আটকে রাখতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিহার গঙ্গার পানি আটকে রাখছে কিংবা তাদের কারণে প্রবাহ কমে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন অবান্তর বলে তিনি মনে করেন।
আইআইটি কানপুরের প্রখ্যাত ভূবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাজীব সিনহাও হিমাংশু ঠাক্কারের সুরেই সুর মিলিয়ে বলেছেন যে চুক্তির কারণেই কেবল বিহার তীব্র পানিসংকটে পড়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তাঁর মতে, বিহারের মূল এবং প্রধান সমস্যা হলো নদীগর্ভে অতিরিক্ত পলি জমে যাওয়ার ঘটনা। অতিরিক্ত পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পানি নদীর বুক ছেড়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পলি অপসারণের মাধ্যমে যদি নদীর গভীরতা ফিরিয়ে আনা যায়, তবে এই সমস্যার বড় অংশই সমাধান করা সম্ভব। তাছাড়া তিনি উল্লেখ করেন যে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের মূল লক্ষ্য কখনোই সেচ বা পানীয় জল সরবরাহ করা ছিল না, বরং কলকাতা বন্দরের নৌচলাচল সচল রাখাই ছিল এর একমাত্র উদ্দেশ্য।
তবে অন্য একজন গবেষক ও তিলকা মাঞ্জি ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সুনীল কুমার চৌধুরী বিহারের ক্ষোভের সঙ্গে কিছুটা একমত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন যে ফারাক্কা ব্যারাজের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বিহারের নদী অববাহিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, ব্যারাজ নির্মাণের ফলে উজানের স্বাভাবিক স্রোত প্রায় থমকে গেছে এবং এর ফলে গঙ্গার দুই তীরে বিপুল পরিমাণ পলি জমে নদীটি মারাত্মকভাবে অগভীর হয়ে পড়েছে। ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিহারের সাধারণ মানুষের জন্য ঠিক কত পরিমাণ গঙ্গার পানির প্রয়োজন হবে, তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা হওয়া জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
পলি জমার এই ভয়ংকর সমস্যা নিয়ে খোদ বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার আইআইটি কানপুরকে একটি বিস্তারিত গবেষণা করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অধ্যাপক রাজীব সিনহা বক্সার থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার প্রায় পাঁচ শ আশি কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ নিয়ে অত্যন্ত নিবিড় গবেষণা পরিচালনা করেন এবং ২০১৮ সালে বিহার সরকারের কাছে একটি চার খণ্ডের বিশদ প্রতিবেদন জমা দেন। সেই গবেষণার মূল সারসংক্ষেপে পরিষ্কার বলা হয়েছিল যে ফারাক্কা ব্যারাজ পরোক্ষভাবে বিহারের পরিবেশ ও নদীপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১৯৬১ সালে ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এর উজানে বিপুল পরিমাণ পলি জমতে শুরু করে এবং এর ফলে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে পনেরো কোটি টন পলি জমা হওয়ার অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এমতাবস্থায় চুক্তি নবায়নের এই জটিল পরিস্থিতিতে ভারতীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশ দাবি তুলছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে এই গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি আর নবায়ন না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নদী আইন এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এই ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। যেহেতু গঙ্গা একটি সম্পূর্ণ আন্তসীমান্ত নদী, তাই ভারত একাই সমস্ত পানি আটকে রাখতে পারে না। তাছাড়া প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন এমনিতেই নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন চুক্তি বাতিল করলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক করার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁদের পরামর্শ হলো, কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গঙ্গা অববাহিকার সমস্ত রাজ্য এবং অংশীজনদের এই চুক্তির কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে বিহারের মতো উপরিভাগের রাজ্যগুলোর দীর্ঘমেয়াদী পানির চাহিদা, কৃষির প্রয়োজনীয়তা এবং শিল্পায়নের বিষয়টি চুক্তির নতুন খসড়ায় যুক্ত করা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।
পাশাপাশি চুক্তিটিতে পলি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক ধারা যুক্ত করার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা না থাকলে কেবল পানি বণ্টন নিয়ে বড় কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। বিহারের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও রাজ্য সরকার যদি কেবল রাজনৈতিক বাহাস বাদ দিয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর পলি ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিত, তবে আজকের এই সংকটের মুখোমুখি হতে হতো না বলে অনেকে মনে করেন।
সব মিলিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে বিহারের এই আকস্মিক দাবিদাওয়া এবং রাজনৈতিক চাপ দুই দেশের কূটনৈতিক দরকষাকষিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর পানিসংকট ও পলি সংক্রান্ত ক্ষোভ প্রশমিত করা—দিল্লির নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই আঞ্চলিক দাবিগুলো কতটা গুরুত্ব পাবে এবং গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন কোনো সুষম রূপরেখা তৈরি হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: ঢাকাস্ট্রিম ও দ্যা স্ক্রল