দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাম্প্রতিক চিত্র নিয়ে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বা এমএসএফের প্রকাশিত একটি নতুন প্রতিবেদন দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত অক্টোবর মাসে কেবল গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩২ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও চৌান্ন জন। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে গণপিটুনিতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল তেইশ জন, যার অর্থ দাঁড়ায় এক মাসের ব্যবধানে মব ভায়োলেন্সের ঘটনা প্রায় উনচল্লিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এবং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের মাধ্যমে যাচাই করে এই পরিসংখ্যান প্রস্তুত করেছে সংস্থাটি।
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরে গণপিটুনিতে নিহত ৩২ জনের মধ্যে কেবল চোর সন্দেহে বা চুরির অপবাদে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি ও মারামারির জেরে ৫ জন এবং চাঁদাবাজি, জমি সংক্রান্ত বিরোধ, পূর্ব শত্রুতা ও মাদক ব্যবসার মতো বিভিন্ন কারণে আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একের পর এক ঘটে চলা এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমএসএফ। সংস্থাটি অবিলম্বে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত পরিচালনা, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে আলোচ্য অক্টোবর মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ২৫টি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ১৪ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই রাজনৈতিক হানাহানির মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ৫ জন এবং অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের গুলিতে ৯ জন নিহত হয়েছেন। অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলে নিহতদের মধ্যে চারজন বিএনপি এবং একজন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক বা কর্মী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। অন্যদিকে অজ্ঞাতপরিচয় আক্রমণকারীদের গুলিতে নিহতদের মধ্যে সাতজন বিএনপি ও দুজন অন্য দলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমএসএফের এই বিস্তৃত প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে আরও বেশ কিছু মর্মান্তিক ঘটনার চিত্র উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন নদীর তীর, মহাসড়ক, রেললাইন ও কৃষিজমি থেকে অজ্ঞাতপরিচয় মোট ৭৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যা জনমনে এক গভীর রহস্য ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত এবং আরও তিনজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর এবং চুরির মোট ৩৫টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
প্রতিবেদনে পিরোজপুর জেলায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা ও দাফনকাজে বাধা দেওয়ার অত্যন্ত নিন্দনীয় ও কলঙ্কজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর মৃত্যুর পর সম্মানের সঙ্গে শেষ বিদায় জানাতে না দেওয়ার এই ঘটনা দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছে মানবাধিকার সংস্থাটি। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, জানমালের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সহিংসতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং একটি জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে অপর একটি স্বনামধন্য মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক এবং চলতি বছরের প্রথম আট মাসের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিন মাসে দেশে অন্তত ২২ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এই একই তিন মাসের সময়সীমায় বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৯০ জন ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে অধিকারের প্রতিবেদনে এক ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়েছে যে চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই সারা দেশে মোট ৪ হাজার ৬৫৪টি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ। তবে মানবাধিকার গবেষকদের আশঙ্কা হলো, সামাজিক লজ্জা ও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বহু ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে সাহস পায় না, ফলে প্রকৃত ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা প্রকাশিত মামলার পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।
অধিকারের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে চলতি বছরে জোরপূর্বক গুম বা নিখোঁজ হওয়ার দুটি গুরুতর ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুরে একটি ব্যাংকের এটিএম বুথের সামনে থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে শামিম খান নামের এক যুবদল নেতা ও ব্যবসায়ীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যাকে পরবর্তীতে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এছাড়া চলতি বছরের এপ্রিলে বাগেরহাটের মিরাজ শেখকেও কোস্টগার্ড পরিচয়ে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা এসব বিচারবহির্ভূত ঘটনা, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে অবিলম্বে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন যে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিই মূলত অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। অপরাধীরা যদি বুঝতে পারে যে আইনের হাত থেকে সহজে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব, তবে অপরাধের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষ করে মব ভায়োলেন্স বা বিচারবহির্ভূতভাবে জনতা কর্তৃক কাউকে পিটিয়ে হত্যার সংস্কৃতি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি জরুরি।
সর্বশেষ এই মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলো প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এখনো বহু দূর পথ পাড়ি দিতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সরকার এবং বিচার বিভাগকে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার পরিবেশ নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি দলীয় কোন্দল ও সহিংসতা বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোরও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আবশ্যক। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই ধরনের অস্থিতিশীলতা রোধ করা কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এই ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক বাস্তব আয়না। তাই এখনই সময় উদ্ভূত সংকটগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করে কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে শান্তিময় ও সমৃদ্ধশালী হতে পারে না। তাই প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের বিকল্প কিছু নেই।
তথ্যসূত্র: নিউএজ